বেশ কিছুদিন আগে বলিউড অভিনেত্রী আলিয়া ভাট বলেছিলেন, স্বামী রণবীর কাপুরের নাকি গাঢ় লিপস্টিক পরা অপছন্দ। তাই তিনি লিপকালার লিপস্টিক পরেন! তবে জানেন কি, এই লিপস্টিক কিন্তু শুরু থেকে মেয়েদের সাজসজ্জার বস্তু ছিল না। বরং একটা সময় পুরুষরাই ব্যবহার করত এই প্রসাধন সামগ্রী। তবে পুরুষদের ব্যবহার করার পেছনে কারণ ছিল ঐতিহ্য। প্রাচীনকালে এই লিপস্টিকই ছিল আভিজাত্যের প্রতীক!
খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ সালে প্রথম প্রাচীন মিশরীয়দের থেকেই লিপস্টিক ব্যবহার শুরু হয়। প্রথম শতাব্দীতে রোমান পুরুষদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে আঠারো শতাব্দীতে ফরাসি রাজকীয় পুরুষদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা পায়। মেসোপটেমীয় সভ্যতায় উচ্চ শ্রেণির পুরুষেরা তাদের অলংকারগুলো দিয়ে ঠোঁটকে চূর্ণবিচূর্ণ করত। মিশরীয়রা তাদের ঠোঁটের জন্য ফুস-অ্যালগিন, আয়োডিন এবং ব্রোমিন ম্যান্নাইটের সংমিশ্রণে লাল রং তৈরি করত। ফারাও রানি ক্লিওপেট্রা নাকি তার ঠোঁট লাল রং করার জন্য আচ্ছাদিত কারমিন বিটল এবং পিঁপড়া দিয়ে একটি মিশ্রণ ব্যবহার করতেন। কিছু শ্রেণির মানুষ ঠোঁটে লাগানোর জন্য ব্যবহার করত রত্নচূড় ও মৃত ফসিলের অংশ। আরব প্রসাধনীর প্রাচীন ইতিহাসবিদেরা ‘আবু আল কাসিম আল-জাহরহীকে’ প্রথম দৃঢ় লিপস্টিক আবিষ্কারের জন্য কৃতিত্ব দেন, যা তিনি তার পুস্তকে বিবৃতির মাধ্যমে উপস্থাপন করেছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, তখন লিপস্টিককে মানুষ প্রসাধন নয় বরং ঔষধি হিসেবে ব্যবহার করত।
প্রাচীন সভ্যতার মানুষেরা গাছের ছালবাকল, সিসা, মেহেদি, জামের রস, ফুলের রস, পানপাতা, মাটি থেকে রং তৈরি করে ঠোঁটে লাগাত। এই রংগুলো ঠোঁটে আটকানোর জন্য আঠা ব্যবহার করত। ১৮৮০ সালে প্রথম লিপস্টিক নামে নামকরণ করা হয় ঠোঁট রঙিন করার এই প্রসাধনীকে। ১৮৮৪ সালে প্রথম বাণিজ্যিক লিপস্টিক তৈরি করে প্যারিসের একটি সুগন্ধি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। তবে আজকের দিনের মতো ঝকঝকে মোড়ক বা টিউব কিছুই ব্যবহার হতো না তখন। ১৯১৫ ধাতব দণ্ডে লিপস্টিকের আবির্ভাব ঘটে ‘মরিস লেভির’ হাত ধরে। আধুনিক কালের এই লিপস্টিক তার হাত ধরেই অগ্রসর হয়। প্রথম টিউব আকারে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আসে ১৯৩০ সালে। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রসাধন সামগ্রীর প্রতি নারীদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে আমরা যে লিপস্টিক চিনি, তার নাম ‘সুইভেল আপ’। রানি প্রথম এলিজাবেথের সময়ে লিপস্টিক ব্যবহার বেশ বেড়ে যায়। রানি ঠোঁটে রং লাগানো খুবই পছন্দ করতেন। তারই ফলে, সাধারণ নারীরাও ধর্মীয় নির্দেশ অমান্য করে এই প্রসাধনী ব্যবহারে আগ্রহী হয়। কারণ খ্রিষ্টান ও জু-জাতির তরফ থেকে লিপস্টিকের ব্যবহারে বাধা ছিল। ঠোঁটে শুধু গোলাপি লিপস্টিক ব্যবহারের অনুমতি ছিল। ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের সময়ে নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই ব্যাপকভাবে লিপস্টিক ব্যবহারের নতুন করে প্রচলন ফিরে এসেছিল। এমনকি তখনকার দাড়ি-গোঁফওয়ালা পুরুষেরাও তাদের গোঁফে আবৃত ঠোঁটের নিচে লিপস্টিক পরতে দ্বিধা করতেন না। যার প্রধান হেতুই থিয়েটারের আবির্ভাব। ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের সময়েও পুরুষদের মধ্যে লিপস্টিকের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। লিপস্টিকের জনপ্রিয়তার সত্ত্বেও ধর্মীয় দিক থেকে এটি কঠিনভাবে নিষিদ্ধ ছিল। ভাবা হতো জাদুবিদ্যার প্রসার, শয়তানের কাজ, যৌনকর্মীদের প্রসারের প্রতীক হলো লিপস্টিক।
রানি ভিক্টোরিয়ার সময়ে নারীবাদীদের আন্দোলনের ফলে একসময় লিপস্টিক ব্যবহারের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। শোনা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটন নাকি লিপস্টিক পরতেন। যে কোনো বড় আয়োজনে তিনি মেকআপ করতেন এবং পরচুলও পরতেন। লিপস্টিক পরাকে তিনি কখনো খাটো করে দেখতেন না।
অন্যদিকে গ্রিস ও জাপানে নারীরা মোম ও আলকাতরা ব্যবহার শুরু করে লিপস্টিকের নতুন মাত্রা যুক্ত করেন। এসব ধারণাকে পেছনে ফেলে লিপস্টিককে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায় এক জন আরব বিজ্ঞানী আবুল কাসিস। তিনি শরীরে মাখার জন্য একটি সুগন্ধি উপাদান আবিষ্কার করেন, যা পরে ছাঁচে ফেলা যায়। পরবর্তী সময়ে তিনি এর সঙ্গে রং দিয়ে একই পদ্ধতিতে চেষ্টা করে সলিড লিপস্টিক আবিষ্কার করেছিলেন এবং সেখান থেকেই শুরু হয় সলিড লিপস্টিকের সূচনা লগ্ন।
এভাবেই বহু ধাপ পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে আমরা ব্যবহার করছি উচ্চমানের আধুনিক কেমিক্যাল ফর্মুলার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লিপস্টিক। লরিয়েল, এস্টি লডার, ম্যাক, কালার পপ, ওয়েট এন ওয়াইল্ড ইত্যাদি ব্র্যান্ডের মতো দামি দামি লিপস্টিকসহ এখন চীন আর জার্মানিও বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করছে ফোকালিউর কিংবা ইমাজিকের মতো খুবই সুলভ মূল্যের ব্র্যান্ডেড লিপস্টিক। তবে উচ্চ মূল্যের ব্রিটিশ কিংবা আমেরিকান ব্র্যান্ডের চেয়ে আমাদের দেশে সাধারণ স্তরে চায়না ব্র্যান্ডই এখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে।
লেখক: সংস্কৃতিকর্মী
