সমস্যাবিহীন জীবন হইল পাঠছাড়া স্কুলের ন্যায়। অর্থাৎ, চলার পথে সমস্যা থাকিবেই। মুশকিল হইল, উদ্ভূত সমস্যার সমাধান না করিয়া তাহা এড়াইয়া চলিবার চেষ্টা মহাসর্বনাশ ডাকিয়া আনে সর্বদাই। উপরন্তু, জুতসই সমাধান টানিতে না পারিলে নূতন নূতন সমস্যা হাজির হইয়া পরিস্থিতিকে অধিক জটিল ও কঠিন করিয়া তোলে। আজিকার বিশ্বের চিত্র কী? চর্তুদিক হইতে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরিয়া ধরিয়াছে নানাবিধ সমস্যা-সংকট। ইউক্রেন যুদ্ধ দুই বত্সরের গণ্ডি অতিক্রম করিতে যাইতেছে, তথাপি সংঘাত বন্ধের তথা সমাধানের কার্যকর রাস্তার সন্ধান পাওয়া যাইতেছে না। ইহার মধ্যে আবার নূতন সমস্যার উদয় ঘটিয়াছে হামাস-ইসরাইল সংঘাতের পিঠে চড়িয়া। অন্যান্য অঞ্চলও বিবিধ সমস্যায় জর্জরিত। চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে ঘনীভূত এই সকল সংঘাত বিশ্বের জন্য যে কী ধরনের বিপদ ডাকিয়া আনিতে পারে, তাহাই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বিষয়। কাহার কারণে বা কোন পক্ষের দোষে সংঘাত বাধিতেছে, তাহা বড় প্রশ্ন নহে; পৃথিবী ক্রমাগত সংকটের চোরাবালিতে নিমজ্জিত হইতেছে এবং তাহা হইতে উত্তরণের পথও অজানা—কঠিন বাস্তবতা ইহাই। গভীরভাবে লক্ষণীয়, একটি করিয়া সংকট ঘাড়ে চাপিতেছে এবং তাহা হইতে নিষ্কৃতি না পাইতেই নূতন প্রতিকূলতার মুখে পড়িতেছে বিশ্ব! ইহার ফলে জ্বালাইয়া মারিতে থাকা পূর্বের সমস্যা অধিক বন্ধুর, বিপৎসংকুল হইয়া উঠিতেছে নূতন সমস্যার আড়ালে ঢাকা পড়িয়া। সংঘাত-সংঘর্ষের গহ্বরে পরিণত হইয়া বিশ্ব যেন হইয়া উঠিতেছে জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। ইহা তো মহাবিপদের পদধ্বনি!
মনে রাখিতে হইবে, ইউক্রেন সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী মন্দাভাব পরিলক্ষিত হইতেছে দীর্ঘ সময় ধরিয়া। খাদ্যাভাব তীব্রতর হইয়া উঠিতেছে ক্রমবর্ধমান হারে। এইরূপ পরিস্থিতির মধ্যে আবারও ইউক্রেনের শস্যভান্ডারে হামলা চালাইয়াছে রুশ সেনারা। ইউক্রেনের খাদ্যশস্য অবরুদ্ধ হইয়া যাইবার কারণে বিশ্ব এমনিতেই অবর্ণনীয় খাদ্যসংকটের সম্মুখীন বিধায় ইহা বৃহত্ সংকটের পূর্বাভাস হইয়া প্রতিঘাত করিতেছে সর্বময়। তাহা ছাড়া সংকট বাড়িলে জ্বালানির সংকট বাড়িবে অনিবার্যভাবে। এই যে সংকট, ইহা তো এক দিনে সৃষ্টি হয় নাই—যাহার নিরুপায় সাক্ষী গোটা বিশ্ব। এবং অসহায় বিশ্ববাসী ইহাও স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছে, নূতন সংকটের উদয়ে অনেক বড় সংকট ঢাকা পড়িয়া যাইবার সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে! ইহার ফলে কী ঘটিবে? বিশ্বকে ক্রমাগত আচ্ছাদিত করিবে সংকটের বেড়াজাল। অনিশ্চয়তার প্রহরে প্রলাপ গুনিবে ভুক্তভোগী বিশ্ব। পরিতাপের বিষয়, এই আশঙ্কাকে আমলে লইতেছি না আমরা, হাঁটিতেছি না সমাধানের পথে।
কোনো সমস্যার সমাধান করিতে হইলে সেই সমস্যার শাখা-প্রশাখায় বিচরণ না করিয়া বরং মাটি খুঁড়িয়া উহার একদম গভীরে, শিকড়ে প্রবেশ করিতে হয়—ইহা গুণীজনের হিতোপদেশ। আমরা সমস্যা ঠিকই অনুধাবন করিতেছি, সমস্যায় জর্জরিত হইয়া অস্তিত্বের জ্বালামুখে রহিয়াছি; কিন্তু সংকটের রাস্তা খুঁজিয়া পাইতেছি না কিংবা সংকট উত্তরণে জোর চেষ্টা চালাইতেছি না! তাহা হইলে হিসাব কী দাঁড়াইতেছে? সমস্যা-সংকট কী জিয়াইয়া রাখিতে চাহিতেছি কোনো না কোনোভাবে? অথচ সংকট কাটাইতে না পারিলে উহা সকলকেই গলাধঃকরণ করিয়া ফেলিবে।
বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে দেশে দেশে সমস্যা, সংকট বাড়িতেছে। উন্নয়নশীল বিশ্ব পড়িয়াছে মহাবিপদে। এইখানে সমস্যার অন্ত নাই। জাতীয় জীবনকে অস্থিতিশীল করিয়া তুলিতেছে নানামুখী সমস্যা। ব্যক্তিগত জীবনও বিপর্যস্ত হইতেছে নানাভাবে। এইভাবে চলিতে থাকিলে সভ্যতার সংকট শুরু হইবে—যাহার বীজ মাটি ফুঁড়িয়া বের ইইবার উপক্রম! সুতরাং সহজ হিসাব হইল, সংকট যত বাড়িবে, বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা বাড়িবে তত অধিক। ইহার ফলে রক্ত ঝরিবে, সম্পদের অপচয় ঘটিবে এবং বিশেষ করিয়া বিশ্ব পড়িবে বুভুক্ষু পরিস্থিতির মুখে। অর্থাত্, আমরা যে মহাসংকটের পেটে চলিয়া যাইতেছি, তাহা হইতে মুক্তির রাস্তা একটাই—হানাহানির রাস্তা পরিহার করিয়া বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করা, মানবতার পথে হাঁটা। সমস্যা আড়াল করিলে কিংবা সমাধানের পথ এড়াইবার চেষ্টা করিলে তাহা কেবল সমাধানের সঙ্গে দূরত্বই বাড়াইবে।
