ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ শেষ না হইতেই মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হইয়াছে। ইহা যে কোনো সময় সর্বাত্মক যুদ্ধের রূপ লইতে পারে এবং ইহাতে জড়াইয়া পড়িতে পারে আরো এক বা একাধিক দেশ। ইতিমধ্যে এই যুদ্ধে উভয় পক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যাইতেছে। তাহার চাইতেও বড় কথা হইল, এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলিবে, তাহা গভীর চিন্তার বিষয়। ফিলিস্তিন যুদ্ধের কারণে বিশ্বে তৈলের মূল্য বাড়িতে শুরু করিয়াছে। ইতিমধ্যেই মূল্য বাড়িয়াছে ব্যারেল প্রতি পাঁচ ডলার, যাহা গত ১০ মাসে সর্বোচ্চ। ইহাতে সমগ্র বিশ্বেই অর্থনৈতিক চাপ আরো বাড়িবে। এই যুদ্ধে কে কাহাকে ধ্বংস করিয়া দিবে তাহা আমরা জানি না; কিন্তু ইহার কারণে বিশ্ববাসীর বিশেষ করিয়া অর্থনৈতিক ভোগান্তি যে নূতন করিয়া বাড়িবে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।
ফিলিস্তিন মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি আব্রাহামিক—এই তিন ধর্মের নিকট পবিত্র ভূমি হিসাবে পরিচিত। এখানকার মরু সাগরের পানি বাষ্পায়ন করিয়া ৫ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের ধাতুচূর্ণ পাওয়া যাইবে। আমেরিকার মজুত পেট্রোলিয়াম অপেক্ষা ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে পাওয়া যাইবে ২০ গুণ অধিক পেট্রোলিয়াম। তবে শুধু ধর্মীয় বা অর্থনৈতিক কারণে নহে, ফিলিস্তিনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ইহারও চাইতে অধিক। ফিলিস্তিন মধ্যপ্রাচ্যের দক্ষিণাংশের একটি ভূখণ্ড। ইহা ভূমধ্যসাগর ও জর্ডান নদীর মধ্যে অবস্থিত। লোহিতসাগর ইহার খুব সন্নিকটে। ইহার চারিপাশে রহিয়াছে মিশর, তুরস্ক, জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন ও সাইপ্রাস। ইহার উত্তরে ইউরোপ, দক্ষিণে আফ্রিকা ও পূর্বে এশিয়া মহাদেশ। পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ এই তিন মহাদেশের সন্নিহিত বা সংযোগস্থল ফিলিস্তিন অঞ্চল। ইহার পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর থাকায় বিশ্বকে সামরিক ও বাণিজ্যিকভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অপরিহার্য এই অঞ্চল। ইহা খনিজ তৈলসমৃদ্ধ সুয়েজ উপসাগরের সহিত সংযুক্ত। ভারত মহাসাগর হইতে লোহিতসাগর হইয়া বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজগুলি সুয়েজ উপসাগরের মাধ্যমেই সুয়েজখাল হইয়া প্রবেশ করে ভূমধ্যসাগরে। ফলে এই উপসাগরটি সুয়েজখালের সহিত লোহিতসাগরে প্রবেশের একমাত্র পথ। ইউরোপের সহিত ভারতবর্ষের নৌযোগাযোগের পথও ইহাই।
গত কয়েক বত্সর ধরিয়া মধ্যপ্রাচ্যে সবচাইতে আলোচিত ভূরাজনৈতিক ইস্যু ছিল আরব-ইসরাইল কূটনৈতিক সম্পর্ক। সৌদি আরব ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদানসহ বেশ কয়েকটি দেশ ইসরাইলের সহিত স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। সৌদি-ইসরাইল কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র; কিন্তু ইহারই মধ্যে নূতন করিয়া ফিলিস্তিন-ইসরাইল অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি এই সমীকরণকে কি পিছাইয়া দিল? রোমান সাম্রাজ্য হইতে অটোমান সাম্রাজ্য সকল সাম্রাজ্যের ভিশন ছিল জেরুজালেম। ব্রিটিশদের মতো বর্তমানে আমেরিকান নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের ভিশনও একই।
অন্যদিকে ইউক্রেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট মস্কোপন্থি ভিক্তর ইয়ানুকভিচকে পশ্চিমাদের তৈরি বিপ্লবের মাধ্যমে ২০১৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত করা হইলে তাহার প্রতিক্রিয়ায় ঐ বত্সরই রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করিয়া লয়। ইহার পর ২০১৯ সালে জেলেনস্কি ক্ষমতায় আসেন যিনি নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্য হইতে আগ্রহী। ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হইলে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে রাশিয়ার বর্তমান আধিপত্য খর্ব হইবে। ইতিমধ্যেই বাল্টিক সাগরে ন্যাটোর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। ভৌগোলিকভাবে কৃষ্ণসাগর ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। পৃথিবীর প্রায় ২২ শতাংশ খাদ্যশস্য ও ৩০ শতাংশ গম রপ্তানি হয় এই বাণিজ্যিক রুট দিয়া। কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের বন্দর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাহার খেয়ালখুশিমতো ইহা বন্ধ ও খোলা রাখিবার কারণে বিশ্বে যেমন খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়িয়াছে, তেমনি ফিলিস্তিন সংকটের কারণেও বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হইবে মারাত্মকভাবে। ইহার অভিঘাতে উন্নয়নশীল দেশগুলি সবচাইতে ক্ষতির সম্মুখীন হইবে। এই সকল দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হইয়া পড়িবে। অতএব, বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক মুক্তির খাতিরেই ইউক্রেন ও ফিলিস্তিন যুদ্ধ বন্ধ হওয়া দরকার।
