নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে জনগণের মনে অস্থিরতার মাত্রা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতির ভাগ্যাকাশে আজ শুধু দুশ্চিন্তার ঘনঘটা। অর্থনীতি বলি আর সমাজনীতি বলি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এর মধ্যে জনসাধারণের শেয়ার বাজার নিয়ে চিন্তা বা দুশ্চিন্তা করার ফুরসত কোথায়? খুব স্বল্পসংখ্যক পণ্ডিত ঘরানার মানুষ যারা এটা নিয়ে ভাবেন, তাদের মধ্যে আবার চিন্তার চেয়ে দুশ্চিন্তাই বেশি। এরা হাবভাবে বিনিয়োগকারী হলেও এক বিরলপ্রজ। কারণ এ প্রজাতির মানুষের চিন্তা করার সময় নেই। তাই দুশ্চিন্তাই তাদের একমাত্র ভরসা। ২৪ সেপ্টেম্বর শেয়ার বাজারে হঠাত্ করে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বড় পতন হয়। কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, এটি নাকি বিনিয়োগকারীদের ভিসা-নীতি নিয়ে দুশ্চিন্তার নেতিবাচক প্রভাব। বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ফ্লোর প্রাইসে আটকে থাকা কোম্পানি বাদে হাতবদল হওয়া ৯২ শতাংশ শেয়ারের দাম কমেছে। আর প্রধান সূচক ২৯ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৮১ পয়েন্টে। আগের দিনের চেয়ে লেনদেন কমেছে ২৩৫ কোটি টাকা বা ৩২ শতাংশ। শুধু ঐ দিনই নয়, এর ধারাবাহিকতায় পুরো সপ্তাহ জুড়ে বিনিয়োগকারীরা ছিলেন দুশ্চিন্তায়। তাই সপ্তাহ শেষে সবকটি মূল্যসূচক কমেছে। পাশাপাশি দৈনিক গড় লেনদেন নেমে আসে ৫০০ কোটি টাকার নিচে। বাজার মূলধনও কমেছে। মাসব্যাপী সূচক পর্যালোচনা করলে ৩ সেপ্টেম্বর সূচক ছিল সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৩১৬ পয়েন্ট এবং সর্বনিম্ন ২৪ সেপ্টেম্বর ৬ হাজার ২৮০ পয়েন্ট। অর্থাত্ মাসব্যাপী সূচকটি মাত্র ৩৬ পয়েন্টের মধ্যে ঘুরপাক খায়। গত এক বছরে সূচক সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ওঠানামায় ব্যবধান ছিল মাত্র ৩০১ পয়েন্ট। লেনদেনের কথা বললে, বছরের শুরুতে এটি ছিল ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার মধ্যে। বছর জুড়ে ছিল কমবেশি ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি। আর কাঙ্ক্ষিত হাজার কোটি টাকা লেনদেন—সেটি হয় এ বছরে মাত্র ১২ কার্যদিবস। লেনদেনের খরা চলছে বহু আগ থেকেই। সামনে নির্বাচন। তাই নির্বাচন ঘিরে বাজারে অস্থিতিশীলতা স্বাভাবিক।
নীতিনির্ধারণী মহল যত চেষ্টাই করুক, এই মুহূর্তে স্থিতিশীল বাজার আশা করা এক আকাঙ্ক্ষার দুঃসাহস বই আর কিছু নয়। বলা হয়, আমাদের বাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীনির্ভর। যাদের আচরণের ওপর বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। ব্যাপারটি আংশিক সত্য। পুরোপুুরি সত্য হলো, আমাদের শেয়ার বাজারের ইতিহাস সবসময়ই এক অদৃশ্য হাতের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত। এখানে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা দাবা খেলার ঘুঁটিমাত্র। সূচকের আসল কলকাঠি নাড়ানো হয় পেছন থেকে কারসাজির মাধ্যমে। এই চক্র যখন বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে বাজারে সক্রিয় হয়, তখন বাজারে উত্থানপ্রবণতা দেখা যায়। আর তাদের নিষ্ক্রিয়তাই বাজারের পতন। তবে এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই, যে কোনো নিষেধাজ্ঞাই দুশ্চিন্তার বিষয়। অন্যদিকে ভিসা-নীতি ব্যবসা-বাণিজ্যে তেমন প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি। তাই শেয়ার বাজারে এর প্রভাবের যৌক্তিকতা কতটুকু আছে? তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে। যেখানে এমনিতেই শেয়ারদর সর্বনিম্ন মূল্যস্তর দিয়ে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। না হলে পরিস্থিতি কোথায় যেত! তা যে আমাদের অজানা, তা নয়। বিনিয়োগকারীদের নিশ্চয়ই মনে আছে—২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনা মহামারির বিপর্যয়ে শেয়ার দরের মহাবিপর্যয়ের কথা। তিন শতাধিক তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৯২টি কোম্পানির শেয়ারদর অভিহিত মূল্যের চেয়ে কমে বিক্রি হয়েছে। অবস্থা এত বেগতিক ছিল যে ১৯ মার্চ শেয়ার বাজারে প্রথম ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থা চালু করা হয়। ফলে সূচক একটি জায়গায় আটকে যায় ঠিকই; কিন্তু লেনদেন নেমে আসে ৫০ কোটি টাকার নিচে। কিছুতেই যখন কিছু হচ্ছিল না। তখন বাধ্য হয়ে ২৮ মার্চ থেকে শেয়ার বাজার বন্ধ রাখা হয়। টানা ৬৬ দিন শেয়ার বাজার বন্ধ থাকে। ভাবা যায়, উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নেতৃত্বদানকারী একটি দেশে শেয়ার বাজার বন্ধ! যা দেউলিয়া হয়ে যাওয়া শ্রীলঙ্কা বা যুদ্ধ চলমান রাশিয়া-ইউক্রেনেও ঘটেনি। এটি ছিল বিশ্বে বিরলতম ঘটনা। আবার আজকে যারা ফ্লোর প্রাইসের সমালোচনা করছে, তাদের আরেকটু শেয়ার বাজারের পেছনের ইতিহাস থেকে মনে করিয়ে দিতে হয়—আমাদের শেয়ার বাজারে করোনার আগেও এককাপ চায়ের দরে শেয়ার পাওয়া যেত। আমরা জানি, একসময় ভালো মৌলভিত্তি খাত ছিল ব্যাংক। এর মাত্র দুটি কোম্পানির শেয়ারদর বাদে সব শেয়ারের দরই ছিল প্রায় ৩০ টাকার কম। লজ্জাজনকভাবে আটটির দাম ছিল ১০ টাকারও নিচে এবং তখন এই খাতের গড় পিই ছিল মাত্র সাত। এভাবে প্রতিটি খাতই ছিল অবমূল্যায়িত।
ভাবনার বিষয় হলো—২০১৩ সালে ২৮ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ডিএসইএক্স সূচক চালু করা হয়। দিন শেষে সূচক ছিল ৪ হাজার ৯০ পয়েন্ট। ঐ বছরই ৩০ এপ্রিল বাজার টানা পতনের কারণে সূচক নেমে আসে ৩ হাজার ৪৩৮ পয়েন্টে। এভাবে সূচকটি চালু হওয়ার পর থেকে এই ১০ বছরে প্রতি বছরই গড়ে ২৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ ওঠানামা করেছে। সর্বশেষ দ্বিতীয় বার ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে সূচক এই ৬ হাজারের ওপরে ধরে রাখা হয়েছে। তবে প্রায় ৮০ শতাংশ শেয়ার ফ্লোর প্রাইস বা তার সামান্য ওপরে কেনাবেচা হচ্ছে। বাদ বাকি শেয়ারও যে কোনো সময় ফ্লোর টাচ করার অপেক্ষায়। এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শেয়ার বাজারের ইতিহাস একই বৃত্তে আবর্তিত হচ্ছে। ভলতেয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তিটি আমাদের মনে রাখা দরকার, ‘ইতিহাস কখনো নিজেকে পুনরাবৃত্ত করে না; মানুষই সবসময় ইতিহাস পুনরাবৃত্ত করে।’ শেয়ার বাজারে এই যে দুর্গতি এর জন্য সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী মহল থেকে সর্ব স্তরের বিনিয়োগকারী কেউ দায় এড়াতে পারে না। নীতিনির্ধারণীমহল যেমন কারসাজি চক্রের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে ব্যর্থ, তেমনি সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও হুজুগে-গুজবে তাদের পেছনে দৌড়ায়। লোভের আবেগে অতিমাত্রায় বিহ্বল হয়ে কাণ্ডাকাণ্ড, ভালোমন্দ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। নিজেদের পতন ডেকে আনে। অন্ধের মতো কিছু না বুঝে, না শুনে, ভেড়ার পালের মতো লোভে পড়ে, গুজবের মোহে ছোটে। কেউ মনে রাখে না—গুজব রটনাকারী গুজব সফল করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক, পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সত্যের কাছাকাছি থেকেই অতিরঞ্জন কিছু মিশেল দেয়। এক পর্যায়ে প্রকৃত সত্য কিছুটা চাপা পড়ে যায়। আর গুজবের নৌকা পাহাড় ডিঙায়। আবার এসব ভালো করেই যাদের জানা, তারাও কিন্তু গুজবে কান দেয় এবং হুজুগে মেতে ওঠে। এক পর্যায়ে এসে ঝাঁকুনি খায়। সম্বিত ফিরে পায়; কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যায়।
অন্যদিকে উচ্চ হারের মূল্যস্ফীতি, বহিঃখাতের ওপর চাপ, ডলারের অস্থিরতা, আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া, প্রবাসী আয় কমে আসা, ব্যক্তি খাতের ঋণ গ্রহণ কমে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ঋণ বেড়ে চলা। এ সমস্যা কি সমস্যা নয়? আর এ সমস্যা তো এক দিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা, দুর্বলতা ও অনাচারের কারণে অর্থনীতিতে আজ এই সংকট তৈরি হয়েছে। আর তা কাটিয়ে ওঠারও কোনো আভাস আপাতত নেই। তবে করোনার আগে অর্থনীতিতে যখন সুখের নহর বয়েছিল তখনো শেয়ার বাজার দুঃখের সাগরে হাবুুডুবু খেয়েছে। যা এখনো অব্যাহত আছে—এ দুর্দশা যেন অন্তহীন। তা আমাদের নিজেদের অজান্তেই ক্রমান্বয়ে শেয়ার বাজারের স্থিতিশীলতার অনিশ্চয়তা আরো ঘনীভূত করছে। আমাদের জীবনের কোনো ভুল আচরণ, সিদ্ধান্ত বা অস্থির জীবনযাপন আমাদের বাচ্চাদের জীবনকেও প্রভাবিত করে। অর্থনীতিবিদরা দেখেছেন যে, একজন মানুষের জীবনকালের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তগুলো তার নিজস্ব প্রজন্মের অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রবলভাবে সম্পৃক্ত—বিশেষ করে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রথম দিকের অভিজ্ঞতাগুলো। যে প্রজন্ম শেয়ার বাজারের এই দুর্বলতম সময়ের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠছে। তারা ভবিষ্যতে শেয়ার বাজারে কম বিনিয়োগ করবে। ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি বহন করার ক্ষমতা বা ইচ্ছা ব্যক্তিগত ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে। এখানে বুদ্ধি কিংবা শিক্ষা খুব কমই কাজ করে। তাই শেয়ার বাজারসংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সাবধান হতে হবে। দেশ উন্নয়নে অর্থসংস্থানের এই মৌলিক জায়গাটি উপেক্ষা করার পরিণতি যে ভালো নয়, তা সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বাড়বাড়ন্ত দেখেই বোঝা যায়। তাই দুশ্চিন্তার ভারে জ্ঞানশূন্য না হয়ে, কার্যের সম্ভাবনা-অসম্ভাবনার কথা অগ্রে বিবেচনা করে, পরে সিদ্ধান্ত নিলে তা থেকে সুফল পাওয়া যায়। মনে রাখতে হবে, নিজের বুঝব্যবস্থা বা বিশ্লেষণী জ্ঞানকে অন্যের প্ররোচনায় নষ্ট করে অহেতুক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়া কখনোই মঙ্গলজনক নয়। এটি নিঃসন্দেহে বিভ্রম, নির্বুদ্ধিতা ও পতনের কারণ।
লেখক:পুঁজিবাজার বিশ্লেষক
