আধুনিক জীবন মানসিক চাপে জরাজীর্ণ। বিশ্বময় এত অশান্তি এত যুদ্ধবিগ্রহ, ঘরে-বাহিরে, পথে-পথে, পদে-পদে এত সমস্যা যে, মনে হইতে পারে—এই সময়ের মানুষ ইহকালেই যেন নরকের রিহার্সেল করিতেছে। এই ক্ষেত্রে নিভৃতে নিরিবিলি আয়নার সামনে দাঁড়াইয়া নিজেকে এই প্রশ্ন করা যাইতে পারে—এত স্ট্রেস বা মানসিক চাপ লইয়া বাঁচা যায় কী করিয়া? সমস্যার তো শেষ নাই। অবস্থা এমন যে, যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ; কিন্তু তাহার পরও কথা আছে।
কথাটি হইল—অনেক জ্ঞানী-গুণীর মতে, আধুনিক জীবনে স্ট্রেস বা মানসিক চাপ হইল আমাদের কর্মের চালিকাশক্তি। অর্থাত্ মানসিক চাপ হইল ঘানি। আর সেই ঘানি আমাদের ভিতর হইতে নিংড়াইয়া কর্মরস বাহির করে। এই ঘানি বা চাপ আমাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা নহে। এই জন্য আধুনিক জীবনটা যেন অনেকটা প্রেশার কুকারের মতো—যাহাতে অল্প খরচে ও স্বল্প সময়ে কার্য হাসিল করা হয়; কিন্তু সেই প্রেশার কখনো-সখনো ভয়ংকর বিপদও ডাকিয়া আনে। আমরা দেখিতেছি, পৃথিবীর দিকে দিকে যুদ্ধ যেন প্রতিদিন অস্থিরতার নূতন ইতিহাস রচনা করিয়া চলিতেছে। সেই সুনামি আর অস্থিরতায় বিশ্বের সকল দেশেরই সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যেই অল্পবিস্তর মানসিক সমস্যা দেখা দিয়াছে। বাংলাদেশও উহার বাহিরে নহে। তরুণরা যেই হেতু স্বপ্নের কারিগর হয়, তাহাদের সম্মুখে পড়িয়া থাকে দীর্ঘ জীবন। সেই কারণে জীবনের নিয়মে তাহাদের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠাও অধিক থাকে। এই জন্য কিছুদিন পূর্বে একটি জরিপে দেখা গিয়াছে, তরুণ শিক্ষার্থীদের এক-তৃতীয়াংশ অতিরিক্ত ভয় ও উদ্বেগে জর্জরিত। পাশাপাশি দৈনন্দিন আচার-আচরণ ও ব্যবহারে পরিবর্তনও আসিয়াছে শিক্ষার্থীদের জীবনে। ৮০ শতাংশের কাছাকাছি শিক্ষার্থী জানাইয়াছেন, তাহাদের মন খারাপ হওয়া, হঠাত্ ক্লান্তিসহ নানা জটিলতা বাড়িয়াছে। তিন-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থীই চাকুরির ক্ষেত্রে ভবিষ্যত্ ক্যারিয়ার লইয়া দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এই অনিশ্চয়তার কারণেও মানসিক চাপ বাড়িতেছে তাহাদের।
জগতে বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের সংকটাপন্ন অবস্থা তৈরি হইয়াছে। এমনকি বিখ্যাত মনীষীরাও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রবল মানসিক চাপে পিষ্ট হইয়াছেন। এই অবস্থায় সবচাইতে জরুরি বিষয় হইল—সকলের পূর্বে নিজেকে জানা। প্রকৃত আত্মোপলব্ধি থাকিলে প্রবল মানসিক চাপের একটি ‘সেফটি ভালব’ তৈরি হইয়া যায়, প্রেশার কুকারের মতো। তাহাতে ভয়ংকর বিপদ হইতে বাঁচা যায়। উদ্বেগের ক্ষেত্রে উইনস্টন চার্চিল বলিয়াছেন, ‘যখন আমি আমার সমস্ত উদ্বেগের দিকে ফিরিয়া তাকাই, তখন আমার সেই বৃদ্ধের গল্পটি মনে পড়ে যে—তাহার মৃত্যুশয্যায় বলিয়াছিলেন—তাহার জীবন দুশ্চিন্তাজনিত কষ্টে জর্জরিত ছিল, যেই সকল দুশ্চিন্তার প্রায় কোনোটাই কখনো ঘটে নাই।’ খলিল জিবরান মনে করিতেন, ‘আমাদের উদ্বেগ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করিয়া আসে না, বরং আসে ইহাকে নিয়ন্ত্রণ করিবার প্রচেষ্টা হিসাবে।’ এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ উক্তিটি করিয়াছেন হ্যারি পটারের স্রষ্টা জে কে রাউলিং। তিনি স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন, ‘কোনো কিছুতে ব্যর্থ না হইয়া বাঁচিয়া থাকা অসম্ভব।’
সুতরাং ব্যর্থতা জীবনেরই অপরিহার্য অংশ। ইহারও মূল্য রহিয়াছে। যখন মনে হয়, টানেলের শেষ প্রান্তেও কোনো আলো নাই—তখন অবশ্যই জানিতে হইবে যে, ইহা শতভাগ বিভ্রান্তিমূলক ভাবনা। কারণ, আমরা কখনোই আমাদের ‘ভবিষ্যত্’ জানি না। আমরা যাহা যেইভাবে ভাবি, কখনই তাহা সেইভাবে হয় না। অতীতেও হয় নাই, ভবিষ্যতেও হইবে না। সুতরাং টানেলের শেষপ্রান্তে অবশ্যই আলো রহিয়াছে। শুধু প্রশ্নটা হইল, টানেলটা কতখানি লম্বা এবং আপনি সেই লম্বা টানেল পাড়ি দিতে ক্লান্ত হইয়া পড়িতেছেন কি না, কিংবা ভয় পাইতেছেন কি না। এই ক্ষেত্রে সবচাইতে সহজ ভাবনা হইল—টানেলের পথ লইয়া ভাবিয়া দেখিবার দরকার নাই, কখনো না কখনো আলো তো আসিয়া পড়িবেই—এই বিশ্বাস রাখিয়া আগাইয়া যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হইয়া বুদ্ধিমানের কাজ না করিয়া হতাশ হওয়া সবচাইতে বড় নির্বুদ্ধিতা। অতএব, নিজের উপর বিশ্বাস রাখিতে হইবে। আলোর দেখা মিলিবেই। জয় আমাদের সুনিশ্চিত।
