দেশের ব্যাংকিং সেক্টর নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে অনেক দিন ধরেই। বিদ্যমান ব্যাংকিং কোম্পানি আইনের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই অনেক দিন ধরেই স্থানীয় অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংক সংশ্লিষ্টগণ ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন এবং হালনাগাদকরণের জন্য পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ)-এর কাছ থেকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণের অনুমোদন পেয়েছে। সেই ঋণ ছাড়করণের জন্য বেশকিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য শর্ত হচ্ছে ব্যাংকিং সেক্টরের ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সৃষ্টির প্রবণতা যৌক্তিকভাবে কমিয়ে আনা এবং অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিতকরণ।
আইএমএফের শর্ত মোতাবেক সম্প্রতি ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইন যেভাবে সংস্কার করা হয়েছে তা যথেষ্ট নয়। আইনটি আরো ভালোভাবে সংশোধনপূর্বক যুগোপযোগী করার সুযোগ ছিল। দেশে ব্যাংকের সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি এই সেক্টরে জটিলতা এবং সমস্যাও বেড়েছে। সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন দ্বারা এই সেক্টরের বিদ্যমান সমস্যা কাটিয়ে উঠা সম্ভব নাও হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন আইন ্বাস্তবায়নের চেষ্টা করলেও তাদের পক্ষে সব সময় তা করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ খুবই কম। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর যেভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়োগ এবং অপসারণের ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়োগ ও অপসারণের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারে। ব্যাংকিং সেক্টরে বিদ্যমান এই দ্বৈত কর্তৃত্ব ভালো ফল দিচ্ছে না।
টার্মস অব রেফারেন্স থাকলেও এর মধ্যে অনেক রকম ফাঁক-ফোকর রয়েছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা রয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টরে গভর্নেন্স ভালোভাবে করা যাচ্ছে না। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকে যারা স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে থাকেন তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কিন্তু এমন সব লোককে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় যারা মূল উদ্যোক্তাদের আত্মীয়স্বজন অথবা বন্ধুবান্ধব। ফলে তারা স্বাধীনভাবে ভূমিকা পালন না করে মালিক পক্ষের স্বার্থেই কথা বলেন। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও আছে। যদি উপযুক্ততার ভিত্তিতে সঠিক লোককে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেত তাহলে আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষিত হতো। স্বতন্ত্র পরিচালকগণ যদি কোনো ব্যাপারে তাদের অভিমত ব্যক্ত করেন তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে থাকে। আমি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলাম তখন ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকে আগে একই পরিবার থেকে একযোগে দুই জন পরিচালক নিযুক্ত হতে পারতেন। তারা অব্যাহতভাবে দুই টার্ম (প্রতি টার্ম তিন বছর করে) দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। কয়েক বছর আগে এই আইনের সংশোধন করে একই পরিবার থেকে একযোগে চার জন পরিচালক নিয়োগের বিধান করা হয়। তারা অব্যাহতভাবে তিন টার্ম অর্থাত্ ৯ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। আইএমএফের শর্ত মোতাবেক ব্যাংকিং আইন সংশোধন করা হয়েছে। এই সংশোধিত আইনে একই পরিবার থেকে একযোগে তিন জন পরিচালক নিয়োগের বিধান করা হয়েছে। আগের আইনটি ছিল আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু এখন আইনি সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকের ওপর পারিবারিক প্রাধান্য বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। পরিচালকদের কার্যকালের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। বর্তমানে আইনি সুযোগ নিয়ে পরিবারের অনেকেই ব্যাংকের পরিচালক হয়ে যান। এখানে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
আশির দশকের পর আমাদের দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়। দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীনে অনেকগুলো ব্যাংক স্থাপিত হয়েছে। এগুলো ভালোভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। তবে কিছু সমস্যায় জর্জরিত হয়ে রয়েছে। সেগুলোকে বিভিন্নভাবে সাপোর্ট দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক মূলধন সংকটে রয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টরে যে দ্বৈত কর্তৃত্ব রয়েছে তা এই সেক্টরের জন্য মঙ্গলজনক নয়। কোনো সেক্টরের ওপর একক কর্তৃত্ব না থাকলে সেই সেক্টর সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে না। তাই এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
ব্যাংকিং সেক্টরে সবচেয়ে জটিল সমস্যা হচ্ছে পর্বত প্রমাণ খেলাপি ঋণের উপস্থিতি। খেলাপি ঋণের পরিমাণ কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না। নানা ধরনের আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখানো হচ্ছে কিন্তু এটা খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করে থাকে তার চেয়ে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি। আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকাকালে কোনো ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলিকরণ করতে হলে প্রথম বার মোট বকেয়া পাওনা ঋণের ৩০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে ব্যাংকে জমা দিতে হতো। দ্বিতীয়বার পুনঃতপশিলিকরণের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ এবং তৃতীয় বারের জন্য পুনঃতপশিলিকরণ করতে হলে ১০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে জমা দিতে হতো। কোনো ঋণ হিসাব সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য পুনঃতপশিলিকরণ করা যেত। কিছুদিন আগে আইনের এই বিধান সংশোধন করে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে জমা দিয়ে এক বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ হিসাব ১০ বছরের জন্য পুনঃতপশিলিকরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটা না করে বরং ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলিকরণের আইন আরো কঠিন করা প্রয়োজন ছিল। আগে কোনো ঋণ হিসাব অবলোপন করতে হলে সংশ্লিষ্ট ঋণ হিসাব মন্দ মানে শ্রেণিকৃত হওয়ার পর পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলে উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়েরপূর্বক শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করে অবলোপন করা যেত। কিন্তু এখন কোনো ঋণ হিসাব মন্দমানে শ্রেণিকৃত হওয়ার পর তিন বছর অতিক্রান্ত হলেই তা অবলোপন করা যাচ্ছে। এজন্য শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ৫ লাখ টাকার কম স্থিতিযুক্ত ঋণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়ের কোনো শর্ত রাখা হয়নি। ফলে ঋণ হিসাব অবলোপন করা এখন আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানোর পরিবর্তে বরং কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নির্মোহভাবে খেলাপি ঋণের কিস্তি আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি তাদের এমন একটি বার্তা দিতে হবে যে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করা ব্যতীত কোনো গত্যন্তর নেই। খেলাপি ঋণের কিস্তি আদায় না করে কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখানোর মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। ঋণখেলাপিদের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ দেওয়ার কারণে যারা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন তারা হতোদ্যম হচ্ছেন। তারা ঋণের কিস্তি পরিশোধের বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। তারা দেখছেন, ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে তা ফেরত না দিলেও কোনো অসুবিধা হয় না। যারা ঋণখেলাপি তারা গৃহীত ঋণের অর্থ অন্য খাতে প্রবাহিত করছেন। এতে সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। যারা ঋণের কিস্তি নিয়মিত ফেরত দিচ্ছেন তারা ঋণখেলাপিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। কোনো কোনো ঋণখেলাপি গৃহীত ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করছেন বলেও অনেকে অভিযোগ করেন। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা যেতে পারে।
১৯৯১ সালে যে ব্যাংক কোম্পানি আইন প্রণয়ন করা হয় তাতে বিভিন্ন ধরনের স্ববিরোধিতা আছে। এসব স্ববিরোধিতার কারণে আইনের সঠিক প্রয়োগ অনেক সময় সম্ভব হতো না। উচিত ছিল একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে দেশের বিদ্যমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্যাংক কোম্পানি আইনকে হালনাগাদ করে ব্যাপকভিত্তিক সংস্কারের মাধ্যমে অধিকতর কার্যকর আইনে পরিণত করা। ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়া প্রণয়নের পর তা পর্যালোচনার জন্য জনমক্ষে উপস্থাপন করা প্রয়োজন ছিল। তারপর জাতীয় সংসদে আইনটি পাশের জন্য পেশ করা যেত। কিন্তু তা করা হয়নি। জাতীয় সংসদের স্ট্যান্ডিং কমিটিতে প্রস্তাবিত আইন আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ে বেশি কার্যকর হতো যদি দেশের বরেণ্য ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে তার মাধ্যমে আইনটি প্রণয়ন ও পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা হতো। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে কয়েক বছর আগে লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত করা হয়েছে। যদিও এসব ব্যাংকের সব শেয়ারই সরকার ক্রয় করে রেখেছে। এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর শেয়ার পর্যায়ক্রমে বাজারে ছেড়ে দেওয়ার। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব রয়েছে। যে কারণে তারা প্রত্যাশিত অবদান রাখতে পারছে না।
লেখক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
অনুলিখন: এম এ খালেক
