দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৩, ০২:১৬

আধুনিক সমাজের জন্য অত্যাবশ্যক যে স্তম্ভগুলোকে উপেক্ষা করলে সমাজ গুরুতরভাবে পেছনে পড়ে থাকে আর অর্থনৈতিক উন্নতির গতি অত্যন্ত মন্থর হয়ে আসে, বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত গবেষণা সে তালিকার শীর্ষে পড়ে। বিশেষ করে আমাদের মতো বিশাল জনসংখ্যা আর প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় জর্জরিত একটি দেশের জন্য গবেষণালব্ধ মৌলিক সমাধান আরো গুরুত্বপূর্ণ। সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি গবেষণানীতি বাস্তবায়নের  মাধ্যমে কীভাবে আমরাও অতিদ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক স্থিতি অর্জন করতে পারব, কীভাবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হতে পারব, বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দিয়ে তা তুলে ধরা হলো।

আমাদের দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি প্রধানত তিনটি শ্রেণির পেশাজীবীদের কঠোর পরিশ্রমের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তারা হলেন গার্মেন্টসের শ্রমিকরা— যাদের অধিকাংশই নারী যারা আর্থিক এবং শিক্ষাগত সুযোগ থেকে বঞ্চিত। দ্বিতীয় দলে আছেন নানা দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী শ্রমিকরা। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বছরগুলো তারা  অধিকারহীন অভিবাসী হিসেবে পরিজনবিবর্জিত পরিবেশে অনাদর আর অবহেলায় শেষ করেন।  তাদের পরিশ্রমের বিনিময়ে আজ আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার ভরে উঠেছে। সব শেষের দলটি এই দেশের কৃষক,  রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে যাদের বিরামহীন খাটুনির বিনিময়ে আমাদের জাতি খাদ্যের নিশ্চয়তা পাচ্ছে। এই তিনটি গোষ্ঠীই দেশের অগ্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে গত কয়েক দশক ধরে। তিনটি অর্থনৈতিক খাত হলো একটি গাড়ির তিনটি চাকার মতো। গাড়িটি গতিশীল হতে হলে একটি চতুর্থ চাকার ভূমিকা অত্যস্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জ্ঞান বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে বলীয়ান তরুণ প্রজন্মকে চতুর্থ চাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন যে নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তির অগ্রগতি কাজে লাগিয়ে দেশকে আরো সামনের দিকে নিয়ে যাবে।

ওপরের এই গাড়ির উপমাটাকে আরেকটু প্রসারিত করা যাক। আজকের তিনটি অর্থনৈতিক খাতের যে তিনটি চাকা আমাদের দেশে আছে, তার সঙ্গে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চতুর্থ চাকা জুড়ে দিয়ে গাড়ি নির্মাণ করতে হলে একজন দক্ষ পরিকল্পকের দরকার হবে। একটি যুগোপযোগী গাড়ি নির্মাণ করে পরিকল্পক দেশকে উন্নতির অগ্রযাত্রায় দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। এই উপমার চালক বা আধুনিক পরিকল্পনাকার কে? সে হলো সমবেতভাবে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিবিষয়ক সুস্পষ্ট জাতীয় নীতিমালা; গবেষণার জন্য অনুপ্রেরণা এবং তহবিল; বহির্বিশ্বের সঙ্গে প্রযুক্তিগত ঘনিষ্ঠতা; প্রযুক্তিভিত্তিক এন্ট্রাপ্রেনিওরশিপের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ এবং উদার অনুদান। আমাদের দেশে এই ধরনের একজন চালকের আবির্ভাব এখনো হয়নি। সে কারণে অর্থনৈতিক উন্নতির গতি তিন চাকার মালবাহী গাড়ির চেয়ে বেশি গতিতে এগুতে পারেনি। অথচ সারা পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশ এ সময়ে এগিয়েছে দ্রুতগতিময় গাড়ির বেগে। এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, আমাদের গাড়িটিকে আমরা যত বেশি দ্রুতগতিসম্পন্ন করতে চাইব তত বেশি সুনিপুণ নির্মাতা এবং দক্ষ চালকের দরকার হবে।

গবেষকদের মধ্যে একটা সর্বজনস্বীকৃত তথ্য হলো—পৃথিবীর ইতিহাসে যত বিজ্ঞানীর জন্ম হয়েছে তাদের অধিকাংশই আমাদের মধ্যে বর্তমান সময়ে জীবিত আছেন । কথাটি বর্তমান জগতে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির গভীর ভূমিকাকে এবং জাতিসমূহের মধ্যে গবেষণায় ব্যাপকভাবে ব্যাপৃত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষের বিশাল সংখ্যাকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এই বিপুল গবেষক গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য উন্নত এবং দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলো জিডিপির শতকরা ১ থেকে ৩ শতাংশ এবং ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশি ব্যয় করে থাকে। কেন এসব দেশ গবেষণার জন্য এত অর্থ বরাদ্দ করছে? কারণ দুটো। প্রথমত, একবিংশ শতকের সমাজ এবং জীবনের জটিল সমস্যাগুলোর জন্য গবেষণানির্ভর সমাধানের বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, গবেষণায় বিনিয়োগের সুফল শত শত, এমনকি হাজার গুণে বর্ধিত হয়ে সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে এবং আগামী দিনের অনিশ্চয়তা থেকে জাতিকে রক্ষা করে।

গবেষণার ভূমিকাকে একটি গাছের বড় হওয়ার বিভিন্ন পর্যায় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। একটা জামগাছের উদাহরণ দেওয়া যাক এখানে। জাম ক্যানসারসহ অনেক রোগের জন্য বিশেষভাবে উপকারী বলে বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন। কোনো ধরনের যত্ন আর পরিচর্যা ছাড়া কাকতালীয়ভাবে গ্রামের বনে বাদাড়ে বেড়ে উঠা একটি জামগাছ যত উত্পাদনক্ষম হবে, সামান্য পরিচর্যা, সময়মতো পানি, সার, কীটনাশক আর আগাছা দূরীকরণের মাধ্যমে সেটাকে কয়েক গুণ ফলদায়ক করা সম্ভব। আবার গবেষণা আর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেই জামগাছের বীজ অথবা গাছটিকে বিজ্ঞানীরা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে কয়েক গুণ বেশি ফলনশীল, ফলগুলোকে আকারে অনেক বড়, রসালো, তুলনামূলকভাবে বেশি মুখরোচক, খরা এবং রোগপ্রতিরোধী করে অর্থনৈতিকভাবে বেশ লাভজনক গাছে পরিণত করতে পারেন।

অধিকন্তু, ফল সংগ্রহ করার দ্রুত পদ্ধতি, জামের  রস (জুস) সংরক্ষণ করা, এর প্যাকেজিং, এর খাদ্যতালিকাগত সম্পূরক উপাদান হিসেবে ব্যবহার, বহির্বিশ্বের বাজারে অনুপ্রবেশ, বিজ্ঞাপন এবং বাজার সৃষ্টি, এই ফলের ক্লিনিকাল ট্রায়াল ইত্যাদির ওপর সুসম্বদ্ধ গবেষণা হতে পারে। এসবই  অত্যন্ত ব্যয়বহুল পদক্ষেপ এবং এগুলোর জন্য দরকার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। ব্যক্তিগত বা বেসরকারি উদ্যোগে এ ধরনের গবেষণার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু গবেষণার এই বিনিয়োগর কয়েক গুণ, এমনকি কয়েক শত গুণ সুফল আমরা ফিরে পাব কর্মসংস্থান, রাজস্ব এবং অর্জিত বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধমে। জামের ওপর কৃত গবেষণা যদি বিশাল মুনাফা নাও আনে, অর্জিত অভিজ্ঞতা অনুরূপ কোনো খাতের জন্য নিশ্চিতভাবে কাজে লাগবেই। আর বাস্তবতার আলোকেই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

n লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কো. লি.

ইত্তেফাক/এমএএম