স্বচ্ছল জীবন অর্জনের চেষ্টা করিতে হইবে

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৭:৩০

আজ ‘আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস’। এই দিবসে এই বার যাহা বলা হইতেছে, তাহার মর্মার্থ হইল—যথাযোগ্য ভালো কাজ এবং সামাজিক সুরক্ষার ভিতর দিয়া সকলের মধ্যে মর্যাদাবোধ জাগ্রত করা। আসলে গরিব মানুষের মেরুদণ্ড সোজা রাখিবার মতো সংগতি থাকে না। সেই কারণে দরিদ্র মানুষের মর্যাদাবোধও কম থাকে। কিন্তু সকলেই তো একই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। সকল মানুষেরই মাতৃজঠরে জন্ম হইয়াছে এবং সকলেরই মৃত্যুর স্বাদ লইতে হইবে। এই জন্য বড়ু চণ্ডীদাস বলিয়াছেন—সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘দারিদ্র্য’কে মহান করিয়া একটি অপূর্ব কবিতা রচনা করিয়াছিলেন। তিনি নিজে অত্যন্ত দারিদ্র্যপীড়িত পরিবেশে বড় হইয়াছেন। ছোটবেলায় তাহাকে ডাকা হইত দুখুমিয়া নামে। বিরল প্রতিভাধর এই কবি ‘দারিদ্র্য’কে এতটাই মহিমান্বিত করিয়াছেন যে, তিনি স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন—দারিদ্র্য তাহাকে যিশু খ্রিষ্টের সম্মান দান করিয়াছে। কেবল তাহাই নহে, দারিদ্র্য তাহাকে দিয়াছে ‘অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস’। এই অবধি শুনিতে বেশ ভালো লাগে। কিন্তু তাহার পর কী হইল? কী বলিলেন তিনি? এই কবিতায় এক জায়গায় নজরুল বলিয়াছেন—‘টলটল ধরণীর মত করুণায়!/ তুমি রবি, তব তাপে শুকাইয়া যায়/ করুণা-নীহার-বিন্দু! ম্লান হয়ে উঠি/ ধরণীর ছায়াঞ্চলে! স্বপ্ন যায় টুটি।’ অর্থনৈতিক দুরবস্থায় তৃতীয় বিশ্বের মানুষগুলির স্বপ্নও তেমনি টুটিয়া যাইতেছে।

বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য ১৯৮৭ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত হইয়াছিল বিশেষ একটি সমাবেশ। সেইখানে জড়ো হইয়াছিল লক্ষাধিক মানুষ। ইহার উদ্যোক্তা জোসেফ রেসিনস্কির মৃত্যুর পর ১৯৯২ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭ অক্টোবরকে দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে মনোনীত করে। ১৭ অক্টোবরের স্মারক ফলক—যাহা ফাদার জোসেফ ১৯৮৭ সালে ট্রোকাডেরো প্লাজায় উন্মোচন করিয়াছিলেন—তাহা আজ বিশ্বব্যাপী মানবতার প্রতীক হিসাবে স্বীকৃত। সেই ফলকে বলা হইয়াছে—‘যেইখানেই নারী-পুরুষের চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে, সেইখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়।’ কাজী নজরুল ইসলাম যেমন লিখিয়াছেন—‘পারি নাই বাছা মোর, হে প্রিয় আমার,/ দুই বিন্দু দুগ্ধ দিতে!—মোর অধিকার/ আনন্দের নাহি নাহি! দারিদ্র্য অসহ/ পুত্র হয়ে জায়া হয়ে কাঁদে অহরহ।’ দারিদ্র্যের ব্যাপারে বিখ্যাত কবি জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি বলিয়াছিলেন—‘আমি অনেক গরিব মানুষ দেখিয়াছি, যাহাদের শরীরে কোনো পোশাক নাই; আমি অনেক পোশাক দেখিয়াছি, যাহার ভিতরে কোনো মানুষ নাই।’

গরিবি দশা হইতে নিজেকে মুক্ত করিবার উপর জোর দেওয়া হইয়াছে ইসলাম ধর্মে। মহান আল্লাহতায়ালা কাউকে করিয়াছেন সম্পত্শালী, আবার কাউকে করিয়াছেন সম্পদহীন, দরিদ্র। ধনী-গরিবের এমন শ্রেণিভাগ একান্তই আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাধীন। ধনী-গরিবের এই তারতম্যের পেছনে আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্য হইল তাহার বান্দাদের পরীক্ষা করা। আল্লাহতায়ালা বলিয়াছেন, ‘জানিয়া রাখিও, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সন্তানসন্ততি তোমাদের জন্য এক পরীক্ষা। আর মহা পুরস্কার রহিয়াছে আল্লাহরই নিকট।’ (সুরা আনফাল-২৮)। তবে আল্লাহতায়ালা কর্তৃক ধনী-গরিব শ্রেণির প্রভেদের অর্থ এই নহে যে, মানুষ অকর্মণ্য হইয়া ইচ্ছাকৃত দারিদ্র্য গ্রহণ করিবে! বরং প্রতিটি গরিব মানুষকে বৈধ সীমারেখার ভিতরে জীবনের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য অর্জনের চেষ্টা করিতে হইবে। কারণ, হাদিসে বর্ণিত হইয়াছে—‘দারিদ্র্য কখনো কখনো কুফরিতে নিমজ্জিত করে।’ (শুআবুল ইমান)। সুতরাং প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব রহিয়াছে নিজের আর্থিক উন্নতির জন্য জমিনে ছড়াইয়া থাকা আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক অনুসন্ধান করা। শারীরিক সক্ষমতা কাজে লাগাইয়া দারিদ্র্যমুক্ত জীবন অর্জনের চেষ্টা করা।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন