গত কয়েক মাস ধরিয়া রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নৃশংসভাবে হত্যা করিবার প্রবণতা বাড়িয়া গিয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়। প্রতিপক্ষের হামলার পাশাপাশি অন্তঃকলহ ও দ্বন্দ্বেও বাড়িতেছে খুনখারাবি। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র, যুব, শ্রমিক, স্বেচ্ছাসেবক ইত্যাদি সংগঠনের মধ্যে যেইভাবে হানাহানি বাড়িতেছে তাহাও উদ্বেগজনক। সম্প্রতি চাঁদাবাজির ১০ লক্ষ টাকার নিয়ন্ত্রণ লইয়া ও ঢাকার মিরপুর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করিয়া অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে কোপাইয়া হত্যা করা হইয়াছে যুবলীগের সদস্য শাহ আলমকে। এই ঘটনার রেশ না কাটিতেই ঝিনাইদহের শৈলকুপায় আওয়ামী লীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিপন, রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে শ্রমিক লীগ নেতা আজিজ মহাজন ও যশোরের মনিরামপুরে যুবলীগ নেতা উদয় শংকর বিশ্বাসকে হত্যা করা হইয়াছে নির্মমভাবে। বেসরকারি একটি সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী চলতি বত্সরের জানুয়ারি হইতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে দেশে ৩৮৭টি ঘটনায় রাজনৈতিক ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের শিকার হইয়াছেন ৫৮ জন, আহত হইয়াছে ৫ হাজার ৪০০ জন।
রাজনীতি এক মহান বিষয়। নীতির রাজ তথা শ্রেষ্ঠ নীতিকে বলা হয় রাজনীতি। কিন্তু রাজনীতিতে যখন অন্যায়, অনিয়ম, অবিচার ও দুর্বৃত্তপনার অনুপ্রবেশ ঘটে, তখন সেই নীতিকে কতটা শ্রেষ্ঠ নীতি বলা যায়? বিশেষত উন্নয়নশীল বিশ্বের স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে দুর্নীতি ও কলুষতা এমন পর্যায়ে উপনীত হইয়াছে, অনেক সাধারণ মানুষ রাজনীতির নামও উচ্চারণ করিতে চাহেন না। স্থানীয় পর্যায়ে নেতা, পাতিনেতারা চরম সীমা লঙ্ঘন করিয়া চলিয়াছেন। কিন্তু তাহার কোনো প্রতিকার নাই বলিলেই চলে। যাহারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি রহিয়াছেন বা বিভিন্ন দলের নেতৃত্ব দিতেছেন, তাহাদের নিকট আগে নির্ভয়ে ও নিঃসংকোচে যাওয়া যাইত। বিভিন্ন সমস্যা তুলিয়া ধরা যাইত। এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে একশ্রেণির রাজনীতিবিদের বেলায় কোনো কাজের জন্য গেলে ‘উপরি’ ছাড়া কথাই বলা যায় না। তাহাদের নিকট ন্যায়বিচার পাওয়াটা কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। তাহারা কীভাবে নির্বাচিত, অথবা সম্মুখে আসিয়াছেন তাহা সকলেরই জানা। জনগণের সেবা করিবার মুখ্য উপায় হিসাবে রাজনীতি করাটা খুব ভালো বিষয় হইলেও কেহ কেহ যেনতেন উপায়ে পদ-পদবি পাইতে ও তাহা ধরিয়া রাখিতে চাহেন। ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর তাহারা জনগণের জন্য কতটা কী করেন তাহাও অজানা নহে। এই সকল কারণেও মানুষের মধ্যে একটা হতাশাবোধের সৃষ্টি হইয়াছে। একই কারণে একই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশা থাকাটা স্বাভাবিক।
সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার যত খর্ব হইবে, ততই দেখা দিবে অরাজকতা ও অস্থিরতা। এই ন্যায়বিচার না পাওয়া এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম ঢুকিয়া পড়িবার কারণে সাধারণ মানুষ আজ অসহায় হইয়া পড়িয়াছে। ইহা হইতে সৃষ্ট হতাশা যাহাতে আগামী দিনগুলিতে আরো না বাড়ে, এই জন্য আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হইবে। বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখা মোটেও উচিত নহে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হইতে পারে যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক। বিশেষ করিয়া, গত কয়েক বত্সর ধরিয়া বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটে নাই। বিচ্ছিন্নভাবে দুই-এক জায়গায় খুনখারাবি কিংবা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, আর্থিক ইত্যাদি কারণে সামাজিক অস্থিরতা বাড়িলেও তাহা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই রহিয়াছে। তবে এখন হইতে এই সকল বিচ্ছিন্ন ঘটনার ব্যাপারেও সতর্ক হইতে হইবে। বিশেষত, তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামে-গঞ্জে ও জেলা-উপজেলায় যাহারা চেয়ারম্যান, মেম্বার বা মেয়র কাউন্সিলর রহিয়াছেন, তাহাদের কেহ কেহ নৈরাজ্য ও অরাজকতার আশ্রয় লইতেছেন। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চলিতেছে তাহাদের কথামতো। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয়, সেইখানে দেশের প্রধান নির্বাহীর শাসন কায়েম নাই, আছে স্থানীয় ব্যক্তির শাসন। সুতরাং রাজনৈতিক খুনখারাবি এবং সামাজিক অস্থিরতা দূর করিতে হইলে স্থানীয় পর্যায়ের দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্য আগে বন্ধ করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রদর্শন করিতে হইবে নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের চরম পরাকাষ্ঠা।
