অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে— দুর্গাপূজা কেন করা হয়? এর সার্থকতা কোথায়? আরো প্রশ্ন জাগে, এই পূজা বৈদিক না তান্ত্রিক? দেবীভাগবতে (৭।৩৯।৩) আছে: ‘দ্বিবিধা মম পূজা স্যাদ্বাহ্যা চাভ্যন্তরাপি চ।/বাহ্যাপি দ্বিবিধা প্রোক্তা বৈদিকী তান্ত্রিকী তথা ’ দেবী বলছেন—আমার পূজা দুরকম—বাহ্য ও আভ্যন্তর। বাহ্যপূজা আবার দ্বিবিধ—বৈদিক ও তান্ত্রিক। পূর্বেই বলা হয়েছে পূজার ধারণাটি তন্ত্রের অবদান তাই অন্যান্য পূজার মতো দুর্গাপূজা তান্ত্রিক। আবার দেবী দুর্গা ও তাঁর পূজা পুরাণে বর্ণিত এবং পুরাণ বেদানুসারী, সেইদিক দিয়ে এই পূজাকে বৈদিকপূজাও বলা চলে।
তবে এককথায় এ-পূজার কোনো শ্রেণিকরণ করতে গেলে বলতে হয়—এ হলো ‘মহাপূজা’। মহাস্নান, পূজা, হোম ও বলিদান—এই চারটির সমন্বয়ে যে-পূজা সম্পন্ন হয় তা হলো মহাপূজা। দেবীপুরাণে (২২।২৩) দুর্গাপূজাকে ‘অশ্বমেধ’ যজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ভক্তিসহকারে পূজা করলে অশ্বমেধযজ্ঞের সমান ফলপ্রাপ্তি ঘটে বলে একে ‘কলির অশ্বমেধ’ও বলা হয়। আবার প্রাচীন বেদান্তে স্বরূপ উপাসনা, সম্পদ উপাসনা ও প্রতীকোপাসনা—এই যে ত্রিবিধ উপাসনার কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে দুর্গার মূর্তিপূজা বা প্রতিমাপূজা ঠিক প্রতীকের পর্যায়ে পড়ে না। জনৈক সমালোচকের ভাষায়, ‘মায়ের পূজা সম্পদে প্রতীকে মিশ্রিত। দুর্গা বিশ্ব-মাতা, ‘জগতাং ধাত্রী’। দুর্গার মূর্তি ভাবময়ী মূর্তি, পূজাও ভাবের পূজা ‘দুর্গোত্সব ভাবের অশ্বমেধ, রসের রাজসূয়’।
তবু প্রশ্ন জাগে কেন এই পূজা? সাধারণভাবে এ-পূজার সার্থকতাই বা কী? এর উত্তরে মহানামব্রত ব্রহ্মচারীর ‘চণ্ডীচিন্তা’র আলোকে বলা যায় পূজার দুটো দিক—একটি বাইরের দিক, সেটি বিজ্ঞানধর্মী, অপরটি অন্তরের দিক, সেটি আত্মধর্মী। বাইরের দিক থেকে পূজা একটি বিজ্ঞানসম্মত পন্থাবিশেষ। অন্তরের দিক থেকে পূজা একটি আত্মধর্মী প্রেমপূর্ণ সমর্পণবিশেষ। প্রথমটির উদ্দেশ্য মহাশক্তির সঙ্গে ব্যক্তিসত্তার সম্বন্ধ স্থাপন আর দ্বিতীয়টি যেন মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে-চিরসম্বন্ধ তারই পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দেবীর অনুগ্রহে রামচন্দ্র রাবণকে বধ করে মহাবিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন এবং সীতারূপী মহাসম্পদ লাভ করেছিলেন। এর সাপেক্ষে বলা যেতে পারে—যিনি পূজক তিনি শ্রীরামের ভূমিকায়। সংসারাশ্রমী সাধারণ নর-নারীর দারিদ্র্যই মহাবিপদ, ঐশ্বর্যই মহাসম্পদ, জীবনযাত্রাই যুদ্ধ। এই যুদ্ধে জয়লাভ করে মহাবিপদের হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে মহাসম্পদ লাভ মায়ের অনুগ্রহেই হয়ে থাকে।
যাঁরা জ্ঞানমার্গের সাধক অজ্ঞানতাই তাঁদের মহাবিপদ, ব্রহ্মজ্ঞানই পরমধন। মহাদেবীর অর্চনায় সাধনযুদ্ধে তাঁরা জয়লাভ করেন, কারণ জগজ্জননী নিজেই মূর্ত ব্রহ্মজ্ঞানস্বরূপিণী। যাঁরা ভক্তিপথের উপাসক, তাঁদের ভক্তিরূপিণী সীতাদেবীকে চুরি করে নিয়ে গেছে অপরাধরূপী রাবণ—এই বেদনা তাঁদেরকে বেদনাতুর করে। যোগমায়া কাত্যায়নীর আরাধনায় মহাপরাধরূপী দশাননের বধ হয় মহাষ্টমীতে, প্রেমভক্তিরূপিণী সীতার উদ্ধার হয় মহানবমীতে। দশমীতে এই পরম সত্যানুভূতিকে হূদয়ের গভীর তলদেশে চিত্তদর্পণে নিরঞ্জন করে ভক্ত সাধক বিশ্বমানবকে ভাই বলে আলিঙ্গন করেন।
দুর্গাপূজার সার্থকতা তাই কেবল পূজারূপে নয়, পূজাকে কেন্দ্র করে যে-উৎসব তার কেন্দ্রবিন্দুরূপে।
কুমারী পূজা: দুর্গাপূজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য কুমারীপূজা। দেবীপুরাণে এই পূজার সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে—‘পূজয়েত্ ব্রাহ্মণাঞ্ছক্র কন্যাং বালাং তথৈব চ’—দেবীপূজার অঙ্গ হিসেবে ব্রাহ্মণ ও কুমারীগণের কুমারীপূজার মাহাত্ম্যকীর্তনে তন্ত্র পঞ্চমুখ। সেখানে বলা হয়েছে, কুমারীপূজা ছাড়া হোম প্রভৃতি কর্ম পরিপূর্ণ ফল প্রদান করে না, কুমারীকে পুষপদানে সুমেরু পরিমাণ ফল লাভ হয়, কুমারীকে ভোজন করালে ত্রিলোকবাসীকে ভোজন করানো হয় ইত্যাদি। দুর্গাপূজার সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিথির তিনদিন বা কোনো একদিন ষোলো বছরের কমবয়স্কা কোনো কুমারীকে দেবীজ্ঞানে পূজা করার রীতি আছে। বিভিন্ন বয়সের কন্যাকে বিভিন্ন নামে পূজা করা হয়। এক বছরের কন্যা সন্ধ্যা, দু বছরের সরস্বতী, তিন বছরের ত্রিধামূর্তি, চার বছরের কালিকা, পাঁচ বছরের সুভগা, ছয় বছরের উমা, সাত বছরের মালিনী, আট বছরের কুঞ্জিকা, নয় বছরের কালসন্দর্ভা, দশ বছরের অপরাজিতা, এগারো বছরের রুদ্রাণী, বারো বছরের ভৈরবী, তেরো বছরের মহালক্ষ্মী, চোদ্দো বছরের পীঠনায়িকা, পনেরো বছরের ক্ষেত্রজ্ঞা ও ষোলো বছরের কুমারী অম্বিকা নামে পূজিতা হন। দেবীর কুমারী রূপ ও নাম বেদ-পুরাণের যুগ থেকে প্রচলিত। তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দেবীকে কুমারী নামে অভিহিত করা হয়েছে। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদেও সেই পরমাত্মাকে স্ত্রী, পুরুষ, কুমার বা কুমারী বলা হয়েছে।
বৃহদ্ধর্মপুরাণে আছে দেবী অম্বিকা কুমারী কন্যারূপে ব্রহ্মাদি দেবতাদের সামনে আবির্ভূতা হয়ে দেবীর বোধন করতে নির্দেশ দেন। এককথায় এ-পূজার সহজ সরল ব্যাখ্যা হলো সকল নারীকে ভগবতী বুদ্ধিতে দেখা; শুদ্ধাত্মা কুমারীতে যেহেতু ভাগবতী সত্তার বেশি প্রকাশ তাই কুমারীপূজা।
পূজাস্থলে দেবীর আগমন ঘটে এবং পূজ্য-পূজকের মিলনে সেটি হয়ে ওঠে একটি পুণ্যক্ষেত্র।
দেবীর আগমন ও গমন: দুর্গাপূজার একটি কৌতূহলের বিষয় হলো দেবীর আগমন ও গমন। দেবী দুর্গা স্বর্গ থেকে মর্ত্যে আসেন বিশেষ কোনো একটি যানে ও ফিরে যান আর একটি বাহনে। এই প্রত্যেকটি বাহনে যাত্রার ফল বা পরিণাম জ্যোতিষগণনায় নির্ধারিত আছে এভাবে: নৌকায় আগমন গমন—ফল শস্যবৃদ্ধি বা জলবৃদ্ধি। দোলায় আগমন ও গমন—ফল মড়ক। গজে আগমন ও গমন—ফল শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা। ঘোটকে আগমন ও গমন—ফল ছত্রভঙ্গ।
সপ্তমী বা দশমী যদি রবিবার এবং সোমবার হয়, তাহলে দুর্গার আগমন ও গমন হবে গজে অর্থাত্ হাতিতে। এর ফল—‘গজে চ জলদা দেবী শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা’। পৌরাণিক কাল থেকে দেব-দেবী, রাজা-মহারাজাদের কাছে গজ অর্থাত্ হাতি রাজকীয় মর্যাদা পেয়েছে। বিদ্বত্জনেরা মনে করেন, সেই কারণে দেবী দুর্গার গজে আগমন ও গমনকে কেন্দ্র করে বসুন্ধরা শস্যপূর্ণ হয়ে মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কল্পনা করা হয়েছে।
একইভাবে শনিবার বা মঙ্গলবারে সপ্তমী বা দশমী পড়লে দেবীর আগমন ও গমন হবে, ঘোটকে অর্থাত্ ঘোড়ায়। এর ফল— ‘ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে’। ঘোটক বা ঘোড়া যেমন ছটফটে তেমনই ঘোটকে আগমন ও গমনে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও সাংসারিক ক্ষেত্রেও অস্থিরতা, দুর্ঘটনা, অপমৃত্যু প্রকাশ পাবে।
সপ্তমী বা দশমী যদি বৃহস্পতি ও শুক্রবারে হয় তাহলে দেবীর আগমন ও গমন হবে দোলায়। এর ফল—‘দোলায়াং মরকং ভবেত্’। দোলায় আগমন ও গমন সবচেয়ে অশুভ। দোলা যেন চরাচর দুলিয়ে দিয়ে যাবে। মহামারি, ভূমিকম্প, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, খরা ইত্যাদির প্রভাবে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হবে। যদি বুধবারে সপ্তমী বা দশমী হয় তবে দেবী দুর্গার যান হবে নৌকা। অর্থাত্ আগমন ও গমন হবে নৌকায়। এর ফল— ‘শস্যবৃদ্ধিস্তুথাজলম’। এক্ষেত্রে প্রবল বন্যা, ঝড়, অতিবৃষ্টি ইত্যাদির ফলে একদিকে প্লাবন ও ক্ষয়ক্ষতি অন্যদিকে দ্বিগুণ শস্যবৃদ্ধি। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, একমাত্র গজ ছাড়া দেবী দুর্গার অন্য তিন বাহনের ফলই ধ্বংসাত্মক। পঞ্জিকামতে, এবার সপ্তমী শনিবার তাই দেবীর আগমন ঘোটকে এবং দশমী মঙ্গলবার তাই গমনও ঘোটকে। বিশ্ব জুড়ে যেই অশান্তি যুদ্ধবিগ্রহ চলছে, তাতে দেবী দুর্গা আর কবে গজেতে করে মর্ত্যে আসবেন, আমরা জানি না।
লেখক: সাংবাদিক, গবেষক
