সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা আর কবে পাইব?

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:১০

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বয়স ৫৩ বত্সর হইতে চলিল। একটি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও অন্যান্য বিষয়ে স্থিতিশীলতা লাভ ও উন্নয়নের জন্য অর্ধশতাব্দীকাল কম সময় নহে; কিন্তু আমরা এত বত্সর পরও একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা তৈরি করিতে পারি নাই। ইহার চাইতে দুঃখের বিষয় আর কী হইতে পারে? নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করিতে না পারায় এই দেশে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর যেন সুদূর পরাহত হইয়া উঠিয়াছে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হইতে শুরু করিয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত—কোন নির্বাচনটি আমরা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করিতে পারিয়াছি—তাহা লইয়া প্রশ্ন উঠাটা অসংগত ও অস্বাভাবিক নহে। স্থানীয় সরকারের যে নির্বাচনে সর্বোচ্চ ২ লক্ষ টাকা খরচ করা যাইবে, সেইখানে প্রার্থীরা প্রকাশ্যে ব্যয় করিতেছেন কোটি কোটি টাকা। অবৈধ অর্থের নিকট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে অন্য কিছু বিভাগের একশ্রেণির লোক বিক্রয় হইয়া যাইতেছেন দুঃখজনকভাবে!

উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জেলা-উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত ছড়াইয়া ছিটাইয়া রহিয়াছেন। অথচ তাহাদের নাকের ডগায় ঘটিতেছে নির্বাচনি অনিয়ম ও দুর্নীতি। দক্ষিণাঞ্চলের একটি পৌরসভা নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্রের সিসিটিভি ক্যামেরার তার বিচ্ছিন্ন করা হইল। ম্যাজিস্ট্রেট দুর্বৃত্তদের পাকড়াও করিলেন; কিন্তু তাহার পর আর কিছুই হইল না। এই ক্ষেত্রে ক্ষমতা থাকিবার পরও নির্বাচন কমিশনকে অসহায় মনে হইয়াছে এবং তাহার ভূমিকা লইয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে। নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থার কারণ তো ইহাতেই নিহিত। একজন প্রার্থী যখন প্রকাশ্যে গর্ব করিয়া বলেন যে, তিনি নির্বাচনে ৩০ কোটি টাকা খরচ করিয়াছেন, তখন তাহাকে ধরা হয় না কেন? সেল্ফ কনফেশন বা আত্মস্বীকারোক্তির পরও অপরাধীর বিরুদ্ধে যদি পদক্ষেপ লওয়া না যায়, তাহা হইলে এমন পদে থাকিবারই-বা কী দরকার? এই দেশে পদে পদে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে; কিন্তু নির্বাচন কমিশন যখন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারে না, তখন তাহাকে ঠুঁটো জগন্নাথ বলা হইবে না তো কী বলা হইবে? এই নির্বাচন কমিশন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কীভাবে আয়োজন করিবে—তাহা লইয়া সংশয় থাকিয়া যায়।

এই দেশে যখন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তখন তাহা ৩০০ আসনে একযোগে ও একই সময় অনুষ্ঠিত হয়। যেইখানে একটি ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা পৌরসভার নির্বাচন ঠিকমতো সামলানো যায় না, সেইখানে এতগুলি আসনে ও দেশের ক্ষমতার ভাগ্যনির্ধারণী নির্বাচনে কীভাবে দক্ষতা ও সক্ষমতার পরিচয় দেওয়া যাইবে? নির্বাচনি পর্যবেক্ষক দল ও সেনা সদস্যরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজধানীসহ জেলা-উপজেলার কেন্দ্রমূলে অবস্থান করেন। গ্রাম-গঞ্জের ভোটকেন্দ্রগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রে থাকে অরক্ষিত। সেইখানকার মাসলম্যান বা ক্যাডার বাহিনীকে কীভাবে মোকাবিলা করা হইবে? সংসদীয় আসনের সীমান্ত পরিবর্তনের বেলায় আমরা ইসির যে লুকোচুরি খেলা দেখিয়াছি এবং প্রক্রিয়াগত ত্রুটি লক্ষ করিয়াছি তাহা নজিরবিহীন। সীমানা নির্ধারণের প্রাথমিক প্রস্তাবনায় কোনো পরিবর্তন না থাকায় আপত্তি দেওয়ার সুযোগ হয় নাই। পুরা প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় ন্যায়বিচার ভূলুণ্ঠিত হইয়াছে।

এই যখন পরিস্থিতি, তখন সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা আমরা কীভাবে করিতে পারি? তাহা হইলে কি নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া হানাহানিই আমাদের ললাটের লিখনে পরিণত হইয়াছে? ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩০ লক্ষ বাঙালি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হস্তে অকাতরে প্রাণ দিয়াছেন। তবে ইহার পর গত অর্ধশতকে রাজনৈতিক হানাহানিতে আরো কত সহস্র মানুষ প্রাণ হারাইয়াছেন তাহার হিসাব কি আমরা রাখিয়াছি? যদি নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা দায়িত্বশীল হইতেন, তাহা হইলে চেয়ারে বসিবার পর প্রকৃত পরিস্থিতি, পরিবেশ ও বাস্তবতা দেখিয়া তাহারা জাতির নিকট ক্ষমাপ্রার্থনাপূর্বক পদত্যাগ করিয়া বলিতেন যে, এমন অবস্থায় তাহাদের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা আদৌ সম্ভব নহে!

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন