দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষা বিস্তারে বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক আকারে ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। এর ফলে বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে তথ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার কোর্স কারিকুলাম দেখে বাংলাদেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আসছে। বর্তমানে ২৬টির বেশি দেশের শিক্ষার্থী বাংলাদেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ, যেমন—আমেরিকা, কানাডা, চীন ও জাপান থেকেও শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে আসছেন। এতে একদিকে যেমন বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দেশে এর আগে উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে আসন স্বল্পতার কারণে শিক্ষার্থীদের লাখ লাখ টাকা খরচ করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি ছিল। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও পর্যাপ্ত ছিল না। অর্থাত্ দেশে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ১১টি (জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সহ)। যতদূর জানা যায় যে, অধ্যাপক ড. এম আলিমউল্লা মিয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটি পরিদর্শনকালে বাংলাদেশের জন্য প্রথম ‘নন-গভর্মেন্ট ইউনিভার্সিটি মুভমেন্ট’ নামে একটি কার্যপত্র প্রণয়ন করেন। সেখানে তিনি প্রায় অর্ধশত শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকের সঙ্গে এ বিষয়ে মতবিনিময় করেন। ফলে ক্যানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন পর্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা হলে ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে একটি ‘লেটার অব ইনটেন্ট টু পার্টিসিপেট’ ইস্যু করেন। যার ফলে ১৯৮৯ সালের ২৭ জুলাই অধ্যাপক ড. এম আলিমউল্লা মিয়া দেশের বিদ্যমান উচ্চশিক্ষার বিস্তারে শিক্ষা কার্যক্রম আরো প্রসারের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব করেন।
এর আলোকে সরকারি উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও গবেষকের পরামর্শে যাচাই-বাছাইপূর্বক ১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক সরকার ১৯৯২ অ্যাক্ট অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিধান চালু করেন। এ অ্যাক্টের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯২ সাল থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া শুরু হয়। উল্লেখ্য, পাশের দেশ ভারতে তিনটি পদ্ধতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়ে থাকে, যেমন—ক. বিদ্যমান সোসাইটি অ্যাক্টের আওতায়, খ. বিদ্যমান ট্রাস্টি আইনের আওতায় এবং গ. কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন আইনের আওতায়; অর্থাত্ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও কোম্পানি ও সংস্থার আওতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালিত হচ্ছে। একমাত্র বাংলাদেশেই ট্রাস্টি বোর্ড গঠন ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কেন? কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন বা সংস্থার মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার বিষয়টি অ্যাক্টে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে যে, ‘কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন বা সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত হলে উদ্যোক্তাদের আর্থিক অনিয়ম বা স্বেচ্ছাচারিতা বাড়বে।’ যদিও আইনের মধ্যেই উদ্যোক্তাদের নিয়মমাফিক আর্থিক সুবিধা বা সম্মানি গ্রহণের ব্যবস্থা থাকে। এক্ষেত্রে অনিয়মের প্রশ্নই উঠবে না। তার পরও যদি অনিয়ম করে, সেক্ষেত্রে প্রচলিত আইনের ব্যবস্থা গ্রহণের নিশ্চয়ই সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে দেশে মোট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১২টি। এর মধ্যে ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সমস্যার কারণে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না, অর্থাত্ বর্তমানে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে, এমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০২টি। এর মধ্যে ৩৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই আর ৭২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য নেই। এমনকি ৩২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোষাধ্যক্ষ নেই। উল্লেখ্য, উক্ত উচ্চপদে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদের মনোনীত ব্যক্তিকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে রুটিনমাফিক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, যা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। লক্ষণীয় যে, ইউজিসি বা সরকার একসময় দূরশিক্ষণ বা অনলাইন শিক্ষাকে কোনোভাবেই সমর্থন করত না। সেখানে আমাদের দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সংশোধনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গন তো দূরে থাক, দেশের অভ্যন্তরেই শিক্ষাব্যবস্থাকে সংকীর্ণ রূপদানের পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান পরিস্থিতি তদারক করা এবং চাহিদার বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা হওয়া বিশেষ প্রয়োজন। নইলে এমন এক সময় আসবে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘বোঝা হয়ে দাঁড়াবে’। যার লক্ষণ এখনই দেখা যাচ্ছে। এর কারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা না থাকলে গুণগত শিক্ষার মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। আর শিক্ষার গুণমান নিশ্চিত করা ছাড়া দেশের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন আছে কি? এক্ষেত্রে দক্ষ উপাচার্য না হলে সেটা মোটেও সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, এখন এমনিতেই অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেছে। কিন্তু শিক্ষার গুণমানের তেমন কোনো নজর নেই। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার গুণমানের বিষয়টি মোটেই গণ্যই করা হয় না। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল বলেন, ‘আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ব্যাঙের ছাতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বাড়ছে। তাই রাষ্ট্র যেখানে প্রতিটি জেলায় একটি করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সেখানে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দ্বিগুণের চেয়েও বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন আছে কি? অথচ অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থী পাচ্ছে না।
এছাড়াও অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক গ্রন্থাগার ও ল্যাব স্থাপনে কর্তৃপক্ষ তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না।’ উল্লেখ্য, বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারগুলো ছোট পরিসরে একটি কক্ষে বিনা পদমর্যাদায় গ্রন্থাগারকর্মী দিয়ে পরিচালনা করছে। যা শিক্ষাব্যবস্থার বড় বাধা বলা চলে। তথাপি গ্রন্থাগার-সেবা উন্নত না হলে শিক্ষাব্যবস্থার যেমন উন্নত হবে না। তেমনি শিক্ষাব্যস্থার উন্নতি না হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মান উন্নত হবে না। আর বর্তমানে অভিভাবকরা সচেতন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হয়ে তাদের ছেলেমেয়েদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করান। এ বিষয়টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের চিন্তা করা উচিত। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও নেই। আশির দশকে মালয়েশিয়া থেকে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করার জন্য বাংলাদেশে নিয়মিত আসত। কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীলদের এ বিষয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত। সত্যিকার অর্থে কোনো একটি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া আইনি শাসন বেশি দিন টিকিয়ে রাখা যায় না। সুতরাং নতুন করে একতরফা আইন করে চাপিয়ে না দিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে শিক্ষার উন্নয়ন ও জাতির কল্যাণে আইনের খসড়া প্রণয়ন অতীব জরুরি।
লেখক: গ্রন্থাগার বিভাগের প্রধান, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম
