রূপের নদী যাদুকাটার অস্থিত্ব সংকট, তীর কাটার মহোৎসব

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৩, ২২:১৯

রূপের নদী যাদুকাটা দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে এখন অস্থিত্ব সংকটে। উচ্চ আদালতে নদী একটি ‘জীবন্ত-সত্ত্বা’ স্বীকৃত হলেও এখানে চলছে নদীর তীর কাটার মহোৎসব। বেআইনিভাবে নদীর তীর কেটে বালি ও পাথর আহরণে যাদুকাটা তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট ও রূপ-লাবণ্য হারাতে যাচ্ছে। একদিকে নদী তীরবর্তী ঘাগটিয়াসহ কয়েকটি গ্রাম বিলীন হওয়ার পথে। 

অন্যদিকে নদী তীর ধসিয়ে বালু ও পাথর লুঠে নেওয়ায় পরিবেশ বিপন্ন হতে চলছে। প্রায় সময় নদীর তীর দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, খুন খারাবির ঘটনা ঘটছে। এতে এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্ষায় ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের ছুয়া পেলেই এলাকায় ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করে এলাকাবাসী বলেন, ‘রাত-দিন চলছে যেন লুন্ঠন। তবুও প্রশাসন যেন নীরব।’

প্রকৃতির অপার দান মেঘালয়ের পাদদেশে অবস্থিত সুনামগঞ্জ জেলার নয়নকাড়া তাহিরপর উপজেলা। এখানের প্রসিদ্ধ যাদুকাটা নদীটি নেমে এসেছে মেঘালয়ের পাহাড় থেকে। বর্ষায় নদীটি অসম্ভব খরস্রোতা হয়ে উঠে। তখন নদী দিয়ে নেমে আসে বালি, পাথর কয়লা, বিভিন্ন প্রজাতির পাহাড়ি মাছ। ভেসে আসা বালি-পাথর জমা হয় নদীর বিভিন্ন অংশে। আবহমান কাল থেকে কোদাল, বেলচা, টুকরি দিয়ে এই বালি পাথর আহরণ করে এখানকার শ্রমিকরা জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু কয়েক বছর আগে বালি পাথর আহরণে পরিবেশধ্বংসী বোমা মেশিনের ব্যবহার ব্যবহার বেড়ে গেলে, উচ্চ আদালত ঐ মেশিন দিয়ে বালি-পাথর আহরণ বন্ধ করে দেয়। এতে শ্রমিকরা কিছুটা বেকায়দায় পড়েছেন বটে। এরপরও কোনো কোনো স্থানে সরকারি রাজস্ব আয়ের স্বার্থে শর্ত-সাপেক্ষে বালু মহালগুলো ইজারা দেন সংশ্লিষ্ঠ প্রশাসন।  

সূত্র জানায়, গত ১ লা বৈশাখ থেকে এক বছর মেয়াদে যাদুকাটা নদীর ১ অংশ ২০ কোটি ৬০ লাখ টাকায় সোহাগ এন্টার প্রাইজকে এবং দ্বিতীয় অংশ ৩৪ কোটি ৩২ লাখ টাকায় মেসার্স আর, এফ ট্রেডার্সকে ইজারা দেওয়া হয় বালি-পাথর সংগ্রহের জন্য। 

 

এলাকাবাসীর অভিযোগ 

ইজারাদারদের লোকজন ইজারা বহির্ভূত এলাকায় যাদুকাটার তীর ধসিয়ে বেআইনিভাবে বালি-পাথর আহরণ করছে। এতে ঐসব এলাকায় ধ্বংসলীলা শুরু হয়েছে।  

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, হাইকোর্টের আদেশে যাদুকাটা নদী ইজারা প্রদান বন্ধ ছিল। পরবর্তীতে নদীর তীর না কাটা ও ড্রেজার এবং বোমা মেশিন ব্যবহার না করার শর্তে ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু  শর্ত ভঙ্গ করে যাদুকাটার ইজারাদারে লোকজন নদী তীর ধসিয়ে বালি-পাথর বিক্রয় করছে। 

তিনি বলেন, শর্ত ভঙ্গের কারণে ইজারা বাতিল করা হোক।  এ বিষয়ে ইজারা গ্রহিতা সোহাগ এন্টার প্রাইজের স্বত্বাধিকারী রতন মিয়া ইজারাভুক্ত এলাকা থেকে বালি-পাথর সংগ্রহ করার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, এই বেআইনী কাজে কারা জড়িত তা তার জানা নেই। 

 

ভিটে মাঠি রক্ষার আবেদন 

এদিকে নিজেদের ভীটে মাটি রক্ষায় গত ১৬ অক্টোবর জেলা প্রশাসক সুনামগঞ্জ বরাবরে আবেদন করেছেন এলাকাবাসী। এর অনুলিপি প্রদান করা হয় সচিব, মন্ত্রী পরিষদ, বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি সিলেট রেঞ্জ, বিজিবির সেক্টর কমান্ডার, পুলিশ সুপারসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও দপ্তরে। শতাধিক লোকের স্বাক্ষর করা আবেদনে বলা হয়, লিজ বহিভূত এলাকায় লিজের শর্তভঙ্গ করে নদীর তীর কেটে বালি পাথর উত্তোলন করা  হচ্ছে। এতে  কয়েকটি গ্রাম হুমকির সম্মুখীন। সেই সঙ্গে পরিবেশের ও মারাত্বক বিপর্যয় নেমে এসেছে।

 

ইকোট্যুরিজম গড়ে তুলার প্রচেষ্টা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা

ঘন সবুজে আচ্ছাদিত মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা যাদুকাটা নদীর তীরে বারেক টিলা আরেক রূপের পাহাড়। এখানকার পর্যটন সম্ভাবনাকে ঘিরে ইতিমধ্যে পর্যটন কেন্দ্রিক ব্যবসা গড়ে উঠছে। যাদুকাটার কাছে প্রসিদ্ধ টাঙ্গুয়ার হাওর, শিমুল বাগান, শহীদ সিরাজ লেক, নিলাদ্রীসহ অসংখ্য পর্যটন রয়েছে। বারেক টিলাসহ আশাপাশ এলাকায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ইকোট্যুরিজম গড়ে তুলার প্রচেষ্টা চলছে। পর্যটন কর্পোরেশন সেই লক্ষ্যে বারেক টিলার জমি অধিগ্রহণ করে রেখেছে কয়েক বছর আগেই। কিন্তু বালু-পাথর খেকুরা সব ধংস করে ফায়দা লুটছে। ‘এর পেছনে রয়েছে একটি প্রভাবশালী মহল’-বলেন, এলাকাবাসী।  

 

সংঘর্ষ, খুনোখুনি অব্যাহত

বালি-পাথরখেকো চক্রটির অপকর্ম নিয়ে প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধন এবং বালুখেকোদের বিরুদ্ধে  একাধিক মামলা রয়েছে। তারপরও তারা বেপরোয়া। তীর কাটা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও খুনখারাবির মতো ঘটনা ঘটেছে। তাদের অপকর্মের প্রতিবেদন করতে গেলে দৈনিক সংবাদের তাহিরপুর প্রতিনিধি কামাল হোসেনকে গাছের সঙ্গে বেঁধে বালুখেকো চক্র নির্যাতন করে। এর ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।  

গত ১৩ অক্টোবর নদী তীর দখলকে কেন্দ্র করে কিশোর শহীদ নূর খুন হয়। এ খুনের ঘটনার  মামলায় আদালতে স্বাক্ষী দিতে গেলে, আসামিরা বাড়িতে ঢুকে অতর্কিত হামলা চালিয়ে স্বাক্ষী সাবিনুরসহ অন্তত ১০ জনকে আহত করে। এ ঘটনায় নাসির উদ্দিন বাদী হয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য মোশাহিদ হোসেন ওরফে রানুসহ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে তাহিরপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এর জেরে গত ১৭ অক্টোবর দুপক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ৭ জন আহত হন। পরে পুলিশ ৬ জনকে আটক করে। গত আগস্ট মাসেও স্থানীয় ঐ ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে, অবৈধভাবে নদী তীর কেটে বালু-পাথর উত্তোলন করতে গ্রামবাসীর সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় একজন নারী শ্রমিক আহত হন। ইউপি সদস্য মোশাহিদ হোসেনকে প্রধান আসামি করে ঐ নারী মামলা দায়ের করলে, মোশাহিদকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে জামিনে বেরিয়ে মুশাহিদ ও তার লোকজন আবারো নদী কাটায় লিপ্ত হন। 

তাহিরপুর থানার ওসি মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, আমি এ থানায় নতুন এসেছি। তবে নদীর তীর কেটে বালি পাথর উত্তোলন বন্ধসহ এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।

ইত্তেফাক/পিও