হে সভ্যতা, তোমার লজ্জা পাওয়া উচিত

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৩, ০৫:০০

দুজনের এক জনেরও নাম এখন আর মনে নেই। কিন্তু তাদের কথা স্পষ্টভাবে মনে আছে। সেই ১৯৯৩-১৯৯৪ সালের কথা। তখন কেবল কানাডাতে এসেছি। নতুন কানাডিয়ান হিসেবে ফরাসি ভাষা শেখার জন্য বিনামূল্যের স্কুলে যেতাম। যেহেতু তখন মন্ট্রিয়েলে থাকতাম, ফ্রেন্স ভাষা শেখাটা বেশ জরুরি ছিল। সেই স্কুলেই ওদের দুজনকে পেয়েছিলাম। ফুটফুটে সুন্দরী মেয়েটি ফিলিস্তিনি এবং তার স্বামী ইসরাইলি। ওরা দুজন দুজনকে ভালোবাসত। কিন্তু মুখ খুলতে পারেনি গাজাতে অবস্থানকালে। গোপনে চলে এসেছিল কানাডাতে। সেখানে এসে প্রকাশ করেছিল তাদের প্রেমের কথা। তারপর বিয়েও করে নিয়েছিল কানাডিয়ান আইনানুসারে। গল্পের ছলে জেনেছিলাম, কেন ওরা পালিয়ে এলো। শিউরে উঠেছিলাম ওদের কথা শুনে। ওদের প্রেমের বিষয় জানাজানি হলে নিশ্চিত মৃত্যুবরণ করত ইসরাইল অথবা ফিলিস্তিনে। তাই তারা নিশ্চিত মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে কানাডায় আশ্রয় নিয়েছিল। ওদের মুখেই মাতৃভূমির লোমহর্ষক মারাত্মক সব ঘটনা শুনেছিলাম ভাষার ক্লাস চলার ফাঁকে ফাঁকে। আমাদের যৌবনের সময় আরো অনেক অশান্ত পৃথিবীর গল্প শুনতাম। পৃথিবীতে অশান্তির ঘটনার অভাব ছিল না তখন। কারো কাছে ছিল তা মুক্তিযুদ্ধ, কারো কাছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। তারও আগে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধের বিনিময়ে বাংলাদেশ পেয়েছিলাম। চলেছে সে সময়ে আফ্রিকায় পর্তুগিজ উপনিবেশের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ, মোজাম্বিক আর অ্যাঙ্গোলায় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবিদ্বেষী শ্বেতাঙ্গ শাসনের বিরুদ্ধে কালো মানুষের অসহযোগ আন্দোলন; চলেছে বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রোমাঞ্চকর ভিয়েতনামের গেরিলা যুদ্ধ। এখনো মনের মণিকোঠায় ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য—সাইগনে মার্কিন দূতাবেসের গেট ভেঙে ভিয়েতনামের গেরিলারা ভেতরে ঢুকছে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইহুদিদের ওপর নািসবর্বরতার বিচারসভা বসেছিল ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল নামে। এই ট্রাইব্যুনাল নতুন করে ছড়িয়ে দিল ইহুদিদের ওপর নািসদের বর্বরতার ইতিহাস। তখন পাপ স্খলনের উপায় হিসেবে ইউরোপ দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসনাধীন ফিলিস্তিনে ইউরোপের ইহুদিদের উপনিবেশ গড়ার ছাড়পত্র। গড়ে উঠল এক নতুন বসতি—ইসরাইল। সেই চাপ সামলাতে ১৯৪৮ সালে শত বছরের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ফিলিস্তিনিরা নিকটবর্তী জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, মিশরসহ আরব দেশগুলোর উদ্বাস্তু ক্যাম্পে। এতে সমস্যার সমাধান হলো না; বরং পৃথিবীর অস্থিরতা আরো বাড়তেই থাকল। প্রতিবাদ, আন্দোলন শুরু হলো ফিলিস্তিনিদের মধ্যে। আরব দুনিয়ার স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন পেল তারা। ফিলিস্তিনের পক্ষ নিয়ে মিশর এবং সিরিয়া ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামল। দুই দশক ধরে চলল সেই যুদ্ধ। আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়নের ঠান্ডা লড়াইয়ের সঙ্গে জুড়ে গেল সেই যুদ্ধ। এক সময় যে পৃথিবী নািসদের দ্বারা ইহুদি নিধন আর উদ্বাস্তু ইহুদিদের জন্য হাহাকার করছিল, সেই পৃথিবীর অনেকেই আবার ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের অত্যাচারের বিরোধিতা করল। এরই মধ্যে ১৯৬৭ সালে অতর্কিত আক্রমণে ইসরাইলের বায়ু সেনা মিশরের প্রায় সব কটি সামরিক বিমানকে তাদের ছাউনিতে থাকা অবস্থাতেই ধ্বংস করে দিল। এর ছয় দিনের মধ্যে ইসরাইল মিশরের জর্ডন নদীর পশ্চিম তীর, সিরিয়ার গোলান পাহাড় আর গাজাসহ মিশরের সাইনাই উপদ্বীপ দখল করে নিল। ১৯৭৩ সালে প্রতি-আক্রমণে মিশরের সেনাবাহিনী ইসরাইলকে পর্যুদস্ত করে। ১৯৭৮ সালে রচিত হয় শান্তিচুক্তি। শান্তিচুক্তিতে গাজা বাদে সাইনাই উপদ্বীপ মিশরের হাতে পুনরায় ফেরত আসে। কিন্তু জেরুজালেম, জর্ডনের পশ্চিম তীর এবং গাজা ইসরাইলের কব্জায়ই থেকে যায়। 

ফিলিস্তিন জাতির রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রধান সংগঠন হিসেবে গড়ে ওঠে ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন ‘প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন’ বা ‘পিএলও’। পিএলও-র প্রতিরোধ শান্তিপূর্ণ ছিল না, সুযোগও ছিল না। কেননা, ইসরাইল ফিলিস্তিনে অর্থাত্ জর্ডানের পশ্চিম তীরে ও গাজায় কোনো বিরোধী সমাবেশ কিংবা বিক্ষোভ করতে দিত না। গোপন সংগঠনের মাধ্যমে অস্ত্র সংগ্রহ করে ইসরাইলের সেনা ও প্রশাসনের ওপর আঘাত হানাই ছিল পিএলও-র প্রধান কর্মসূচি। ইসরাইলের জেলে বন্দি পিএলও সহযোদ্ধাদের মুক্ত করার উপায় হিসেবে বিমান হাইজ্যাক করার পন্থা প্রথম আবিষ্কার করেছিল পিএলও-র জঙ্গিবাহিনী ‘ফাতাহ্’। নানাবিধ প্রকাশ্য এবং গোপন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকৃত হয়। বিনিময়ে পিএলও ইসরাইলকে বৈধ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ব্যাস, ঐ পর্যন্তই! আজ ৩০ বছর পরও ফিলিস্তিন অথরিটি প্রতিষ্ঠিত হলেও কোনো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হতে পারেনি। ফিলিস্তিনে অবস্থিত হলেও পশ্চিম ও পূর্ব উভয় অংশের জেরুজালেমই ইসরাইলের দখলে।

১৯৮৭ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের আন্দোলনের কৌশল ছিল প্রধানত ব্যাপক গণজমায়েতের পাশাপাশি ইসরাইলের পুলিশ-মিলিটারির সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ। তাতে পিএলও ছিল প্রধান সাংগঠনিক শক্তি। ১৯৯৩ সালের শান্তিচুক্তির পর পিএলও সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ছেড়ে ইসরাইলের নজরদারি মেনে নিয়ে ফিলিস্তিন প্রশাসনে মন দেয়। আমেরিকা আর ইউরোপের অর্থসাহায্যে এবং জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ফিলিস্তিনিদের খাদ্য, স্বাস্থ্য আর শিক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু ২০০০ সালে এসে ঘটল পরিবর্তন। শুরু হলো ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক প্রতিরোধ। এবার নেতৃত্ব পিএলও-র হাত থেকে বেরিয়ে চলে গেল হামাসের হাতে। শুরু হলো তাদের আত্মাবলি দেওয়ার সূচনা। ঘটতে থাকল পরপর সুইসাইড বম্বিং। একদিকে অধিক হারে মরতে থাকল সাধারণ ফিলিস্তিনি আর ইসরাইলি, অন্যদিকে ফিলিস্তিনি যুবক শহিদদের স্মৃতিসৌধে কবরস্থান ভরে যেতে থাকল। ইসরাইলের সামরিক শক্তি এবং নিয়ন্ত্রণ দুটিই বৃদ্ধি পেল এবং ফিলিস্তিনি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রতিটি অঙ্গ, তাদের চলাফেরা, কাজে যাওয়া, খাদ্য সরবরাহ, বিনোদন—সবকিছু বাধা পড়ল ইসরাইলি সেনাশাসকদের নিয়মের বন্ধনে। ২০০৫ সালে গাজার প্রশাসন তুলে দেয় হামাসের হাতে। এর ফলে পরিস্থিতির আরো অবনতি হলো। ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি হতে থাকল। কিন্তু এরই মধ্যে আমেরিকার মধ্যস্থতায় ইসরাইলের সঙ্গে বিভিন্ন আরব দেশের স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন শুরু হয়েছিল। সৌদি আরব এবং ইউএই এই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এগিয়েও গিয়েছে অনেকটাই।

এই অবস্থায় ঘটে গেল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের বিদ্রোহ। কেউ এই বিদ্রোহকে তুলে ধরবে জঙ্গি আক্রমণ হিসেবে, কেউ আখ্যায়িত করবে মুক্তিসংগ্রাম হিসেবে। কিন্তু যারা মৃত্যুবরণ করছে, তাদের কাছে তাদের জীবন হরণের বার্তাই পৌঁছে দেবে এ সংঘর্ষ। বন্দুকধারী জঙ্গিরা বৃদ্ধ-মহিলা-শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করছে। অবাক হয়ে সবাই এ-ও দেখেছে—ইসরাইলের মতো দেশের বজ্রমুষ্টিও আলগা করা যায়, তার নিশ্ছিদ্র প্রতিরক্ষার বর্ম ভেদ করা যায়; সে অপরাজেয় নয়। কিন্তু তা তো ঘটে গেল আচমকা। তারপরই শুরু হয়ে গেল দুপক্ষের প্রচণ্ড যুদ্ধ। বৃষ্টির মতো বোমা ফেলা শুরু হলো। মানুষের জন্য কোথাও কোনো নিরাপদ জায়গা নেই। পালিয়ে যাওয়ারও কোনো জায়গা নেই। গাজায় হামাসের হামলা চালানোর পরপরই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, ‘এ হামলার জবাবে ইসরাইল যে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা মধ্যপ্রাচ্যকেই বদলে দেবে। আগামী কয়েকদিনে আমরা শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি, তার স্মৃতি তাদের আগামী বহু প্রজন্মকে তাড়া করে ফিরবে।’ ইতোমধ্যে ইসরাইলি সেনারা পুরো গাজা শহর থেকে ফিলিস্তিনিদের সরে যেতে বলেছে। কিন্তু যুদ্ধের পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, সরে যাওয়াটাও বেশ কঠিন। লাগাতার বম্বিং হচ্ছে, স্থলপথেও এগোচ্ছে ইসরাইলি সেনা। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণভয়ে ছুটছে। গাড়িতে জায়গা নেই; খাবার, পানি, বিদ্যুত্ কিছুই নেই। যে কোনো যুদ্ধের এটাই চেনা ছবি। দেশ আর মানুষের নামগুলো শুধু বদলে বদলে যায়—ঘটনা থাকে একই। কখনো ইউক্রেন, আবার কখনো গাজা-ইসরাইল। সাধারণ মানুষগুলো যুদ্ধে নামেনি। হামাস বা ইসরাইলের হয়ে প্রচারও করেনি। তবু তারাই রয়েছে মৃত্যুর অপেক্ষায়। সাধারণ মানুষের জন্য যে কোনো যুদ্ধের এটাই ফলাফল—‘হয় বন্দুকের গুলিতে মর, আর তা না-হলে না খেয়ে মর’। যুদ্ধ প্রথমেই মেরে ফেলে সত্যকে; তারপর মানবিকতা আর অর্থনীতিকে। যুদ্ধের আগুন যত বাড়তে থাকে, মানুষের দুর্ভোগ ততই বাড়তে থাকে। একটি যুদ্ধ সেই যুদ্ধরত জাতি এবং অঞ্চলকে ধাক্কা দিয়ে বছরের পর বছর পিছিয়ে দেয়। এ যুদ্ধও ইসরাইল, ফিলিস্তিন এবং আরব দুনিয়াকে ৫০ বছর পিছিয়ে নিয়ে যাবে। এ অঞ্চলগুলোর সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ মাথা তুলে দাঁড়াতে কেটে যাবে দশকের পর দশক।

লেখক: কলামিষ্ট 

ইত্তেফাক/এএইচপি