জীবন আনন্দে জীবনানন্দ

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৩, ১০:৪৫

জীবনে আনন্দ খুঁজে পান যিনি, তিনিই জীবনানন্দ। সত্যিই জীবনে আনন্দ পেয়েছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ? নাটোরের বনলতা সেনের কাছে সত্যিই পেয়েছেন শান্তি?

দারিদ্র্যের কষাঘাতে উৎপীড়িত তিমির হননের কবি জীবনানন্দ দাশ সত্যিই জীবনে আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন। পেয়েছিলেন শান্তি। তা না হলে পাখির নীড়েও তিনি শান্তি খুঁজে পান কীভাবে? এই কবির জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, বরিশাল শহরে। তার পূর্বপুরুষরা অবশ্য ঢাকা জেলার (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) বিক্রমপুর পরগণার কুমারভোগের গাওপাড়ায় থাকতেন। পদ্মার করালগ্রাসে সেই গ্রাম বিলীন হয়ে গেলে আশ্রয়ের জন্য বরিশালে চলে আসেন। সেই ১৮৮৩ সালের ঘটনা। ভারতবর্ষে তখন ব্রিটিশ শাসন জেঁকে বসেছে। পাশাপাশি ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনও তখন শক্তি সঞ্চয় শুরু করেছে। একটু একটু করে স্বাধীনতার পথে এগোচ্ছে ভারতবাসী।

‘অধ্যাপনার কাজ ছাড়াও কখনও ইনস্যুরেন্সের এজেন্ট হিসেবে, কখনও টুকিটাকি ব্যবসায়েরও চেষ্টা করেছেন তিনি। আবার কখনও গৃহশিক্ষকতা করেও জীবিকা নির্বাহ করেছেন তিনি’

কবি জীবনানন্দ দাশের পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত ধর্মে সনাতন হলেও ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন। বাবা সত্যানন্দ দাশও ছিলেন একজন ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী। সত্যানন্দ সর্বানন্দের দ্বিতীয় ছেলে। জীবনানন্দের মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন স্বভাবকবি। তার বিখ্যাত ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতা আজ পর্যন্ত শিশুপাঠ্য হয়ে আছে। মায়ের অনুপ্রেরণায়ই জীবনানন্দের কবি জীবনের সূচনা। তার কবিতায় উঠে এসেছে প্রকৃতির কথা, এসেছে ভালোবাসার কথা। তাই তিনি একাধারে তিমির হননের কবি, রূপসী বাংলার কবি। ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতায় বাংলাকে তিনি যেভাবে চিত্রিত করেছেন, এই প্রজন্মের কবিরা সেভাবে বাংলার সচিত্র নির্মাণ করতে পারবেন কিনা- তাতে সন্দেহ আছে।

‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শঙখচিল শালিকের বেশে,
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিঁকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়।
হয়তো বা হাঁস হবো- কিশোরীর- ঘুঙুর রহিবে লাল পায়
সারাদিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে।
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে
জলঙ্গীর ঢেউ এ ভেজা বাংলারি সবুজ করুণ ডাঙ্গায়।

হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে।
হয়তো শুনিবে এক লক্ষীপেঁচা ডাকিতেছে শিমুলের ডালে।
হয়তো খৈয়ের ধান সরাতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে।
রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক সাদা ছেঁড়া পালে
ডিঙ্গা বায়- রাঙ্গা মেঘে সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে,
দেখিবে ধবল বক; আমারে পাবে তুমি ইহাদের ভীড়ে।’

বলা হয়ে থাকে, বাংলাকে নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি এখন পর্যন্ত কেউ কবিতায় ফুটিয়ে তুলতে পারেননি। রূপক কল্পচিত্রে বাংলাকে উপস্থাপন করেছেন তিনি। বলেছেন- ‘সবুজের দেশ’। এ কারণেই কবি অন্নদাশংকর রায় তাকে ‘শুদ্ধতম কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

কবির ব্যক্তিজীবন
ছেলেবেলায় কবি জীবনানন্দ দাশকে ‘মিলু’ নামে ডাকা হতো। প্রায়শই টেবিল থেকে কবির লেখা কবিতাগুলো গোপনে পড়তেন বড়দিদি সুচরিতা দাশ। কিন্তু কিছুই পড়তে পারতেন না। তখন তিনি বলতেন- ‘এ কী কাকের ঠ্যাঙ, বকের ঠ্যাঙ।’ নিজের হাতের লেখা সম্পর্কে বড়দিদির সমালোচনা শুনে কবি শুধু হাসতেন, কিছু বলতেন না। কবি জীবনানন্দ দাশের সাহিত্য চর্চার পেছনে মা কুসুমকুমারী দাশ ও বড়দিদি সুচিত্রা দাশ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তার আরও দুই ভাই ব্রহ্মানন্দ দাশগুপ্ত ও অশোকানন্দ দাশ।

বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দের প্রভাব
তিরিশের দশকের পাঁচজন কবিকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের ‘পঞ্চপাণ্ডব’। জীবনানন্দ দাশ ছিলেন সেই পঞ্চপাণ্ডবের অন্যতম। ১৯২৫ সালের জুনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রয়াণে তিনি ‘দেশবন্ধু স্মরণে’ কবিতাটি লিখেছিলেন এবং তা ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত ‘ঝরা পালক’ কাব্যগ্রন্থে কবিতাটি ঠাঁই পায়।

সাহিত্য বোদ্ধারা মনে করেন, বাংলা কবিতার জগতে কবি জীবনানন্দ উচ্চমার্গে অবস্থান করেন। নিজের কবি জীবনের বর্ণনা তিনি এভাবে করেছেন-

‘আমি কবি, সেই কবি-
আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি
ঝরাপালকের ছবি’

‘কল্লোল’, ‘কালি ও কলম’, ‘প্রগতি’-সহ বিভিন্ন নামীদামী পত্রিকায় তার বিভিন্ন লেখা ছাপা হয়েছে। কবি জীবনে তার পারিবারিক উপাধি ‘দাশগুপ্তের’ বদলে কেবল ‘দাশ’ লিখতে শুরু করেন তিনি।

১৯৩১ সালে কবির মেয়ে মঞ্জুশ্রীর জন্মের আগে তার ‘ক্যাম্প’ কবিতা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কবিতাটি লিখে সাহিত্যসমাজে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হন। কবিতার বিষয়বস্তু ‘জোছনা রাতে হরিণ শিকার’ থাকায় অনেকে কবিকে অশ্লীলতার দোষে দুষ্ট বলে দায়ী করে থাকেন। কলকাতায় কবি মহলে প্রকাশ্যেই কবিতাটি নিয়ে সমালোচনা হতো। এমনকি সেই সমালোচনা শুনতে হয়েছে কবিকেও।

১৯৩৬ সালের নভেম্বরে ছেলে সমরানন্দের জন্মের দুই বছর পর ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত ‘বাংলা কাব্যসংকলন’ নামে একটি কবিতা সংকলনে কবির ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতা প্রকাশিত হয়।

কবির সংগ্রামী জীবন
দারিদ্র্য মুখর জীবনে কবিকে বারবার সংগ্রাম করতে হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকবার চাকরিও হারাতে হয়েছে। বেছে নিতে হয়েছে বহু বিচিত্র পেশা। শিক্ষাজীবনে যথেষ্ট মেধার স্বাক্ষর রাখলেও কর্মজীবন স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাতে পারেননি কবি জীবনানন্দ।

১৯১৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন ও ১৯১৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বিভাগে পাস করেন। ১৯১৯ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ ডিগ্রি, ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ করেননি প্রকৃতির মানসপুত্র এই কবি।

কর্মজীবনে বাংলাদেশ ও ভারতের একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কবি জীবনানন্দ দাশ করেছেন অধ্যাপনা। এর মধ্যে রয়েছে সিটি কলেজ, কলকাতা (১৯২২-১৯২৮), বাগেরহাট কলেজ, খুলনা (১৯২৯) ; রামযশ কলেজ, দিল্লি (১৯৩০-১৯৩১), ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল (১৯৩৫-১৯৪৮), খড়গপুর কলেজ (১৯৫১-১৯৫২), বড়িশা কলেজ (অধুনা ‘বিবেকানন্দ কলেজ’, কলকাতা) (১৯৫৩) ও হাওড়া গার্লস কলেজ, কলকাতা (১৯৫৩-১৯৫৪)।

জীবিকার প্রয়োজনে কবিকে সংগ্রামী জীবনযাপন করতে হয়েছে। কখনও কবিতা লেখার কারণে অন্যমনস্ক থাকায় কবিকে হতে হয়েছে রাসটিকেট। দারিদ্র্যের সঙ্গে বসবাস করা এই কবিকে বুঝতে পারেনি তদানীন্তন সমাজবাস্তবতা। অর্থাভাবে পীড়িত হয়ে স্ত্রী লাবণ্য দাশকে করতে হয়েছে স্কুলে শিক্ষকতা। অবশ্য কবি জীবনানন্দও বসে থাকেননি। অধ্যাপনার কাজ ছাড়াও কখনও ইনস্যুরেন্সের এজেন্ট হিসেবে, কখনও টুকিটাকি ব্যবসায়েরও চেষ্টা করেছেন তিনি। আবার কখনও গৃহশিক্ষকতা করেও জীবিকা নির্বাহ করেছেন তিনি।

টাকা-পয়সার জন্য সাংসারিক টানাপোড়েনে কবিকে প্রায়ই স্ত্রীর কাছে শুনতে হয়েছে চরম কটূক্তি। তীব্র মনোবেদনায় ভারাক্রান্ত কবি জীবন ভর অর্থাভাবে কাটিয়ে দিয়েছেন। তবু কবিতা লেখা ছাড়েননি।

জীবনভর দারিদ্র্যের ক্লান্তি, সাংসারিক গঞ্জনা আর স্ত্রীর তাচ্ছিল্যে গত্যন্তর না পেয়ে ১৯৫৪ সালে একদিন কলকাতার রাস্তায় আনমনে হাঁটছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ। হঠাৎ এক ট্রাম দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন। ১৪ অক্টোবর থেকে আটদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে ২২ অক্টোবর প্রয়াত হন তিনি। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি হাওড়া গার্লস কলেজে অধ্যাপনা করতেন।

প্রকৃতির মানসপুত্র এই কবি ১৯৫২ সালে রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার ও ১৯৫৫ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।

আজ ২২ অক্টোবর প্রয়াণের এই দিন শুধু একটি কথাই বলতে চাই- কবি জীবনানন্দ দাশ বেঁচে থাকুক প্রকৃতি প্রেমীদের হৃদয়ে, কবিতার পাঠকদের হৃদয়ে। লালিত হোক চিরায়ত বাংলার সারস্বত ঐতিহ্য।

তথ্যসূত্র:
১. মেহেদী হাসান তামিম, জীবনানন্দ দাশ: চেনা-অচেনার গণ্ডি পেরিয়ে, প্রথম আলো, ২৩ অক্টোবর ২০১৯;
২. দেশবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখলেন জীবনানন্দ, তর্ক হলো মায়ের সঙ্গে, একাদশ অশ্বারোহী, ৫ নভেম্বর ২০২১;
৩. সরস্বতী পুজো ঘিরে বিতর্কে রবীন্দ্রনাথ-সুভাষ, চাকরি খোয়ালেন জীবনানন্দ, একাদশ অশ্বারোহী, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২;
৪. জীবনানন্দের প্রথম প্রেমিকার ‘মিথ’ নিয়ে আজও অমলিন বরিশালের লাল গির্জা, একাদশ অশ্বারোহী, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯;
৫. বিমূঢ় যুগের ‘বিভ্রান্ত’ কবি নন জীবনানন্দ, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০;
৬. কবির বিভিন্ন কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ;
৭. ‘জীবনানন্দ দাশ: সমগ্র প্রবন্ধ’;
৮. জীবনানন্দ দাশ বিশেষ সংখ্যা (শব্দ লেখা), প্রকাশকাল: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১।

ইত্তেফাক/এসকে