প্রচলিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেন প্রয়োজন

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৩, ০৩:৪২

গতকাল প্রকাশিত সম্পাদকীয় নিবন্ধে আমরা বলিবার চেষ্টা করিয়াছি যে, উন্নয়নশীল বিশ্বে ভুল-বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজব মোকাবিলায় প্রচলিত গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করিতে হইবে। নির্বাচনি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত করিবার জন্য এই সকল দেশে গুজব এক বড় হাতিয়ার। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করিয়া ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে যেইভাবে মিথ্যা ও ঘৃণা ছড়ানো হয়, তাহা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য উদ্বেগজনক। এমনকি বহু ক্ষেত্রে চলে অশ্লীলতার বেসাতি। ভাষা ব্যবহারে ভদ্রতা, নম্রতা ও শালীনতার অভাবও লক্ষণীয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেইভাবে কটাক্ষ করা ও অপপ্রচার চালানো হয়, তাহা কোনো বিবেকসম্পন্ন ও রুচিশীল ব্যক্তির পক্ষে আদৌ সম্ভব নহে; কিন্তু প্রশ্ন হইল, এই সকল অশ্রাব্য ভাষা, গুজব ও মিথ্যা রটনার প্রতিরোধে প্রচলতি গণমাধ্যমকে কীভাবে শক্তিশালী করা সম্ভব?

আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার, গুজব প্রতিরোধ করিতে হইলে এক নম্বর কর্তব্য প্রচলিত গণমাধ্যম তথা প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ফ্রিডম বা স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া কোনো দেশেই গণতন্ত্রের বিকাশ সম্ভব নহে। উন্নয়নশীল যেই সকল দেশে এই স্বাধীনতা নাই বা হুমকির সম্মুখীন, সেই সকল দেশেই গুজবের ডালপালা ছড়ায় বেশি। এমনকি ইহাকে সামাল দেওয়া একসময় কঠিন হইয়া পড়ে। এমন সকল অদ্ভুত ও উদ্ভট গুজব ছড়ানো হয়, যাহা দেখিয়া ও শুনিয়া আক্কেল গুড়ুম হইবার দশা হয়। মন্ত্রী-মিনিস্টারগণ বিদেশ সফরে গেলেন, অমনি রটানো হইল তিনি বা তাহারা পলাইয়া গিয়াছেন; কিন্তু তাহা ডাহা মিথ্যা এবং সত্যের অপলাপ। আবেগবশত অনেকেই ইহাতে তাত্ক্ষণিকভাবে লাইক, শেয়ার বা কমেন্ট দিয়া বসেন অথবা চ্যানেলটি সাবসক্রাইব করিয়া ফেলেন। তবে ঘোর কাটিতেই মিথ্যা ও ছলনা ধরা পড়িয়া যায়। বর্তমানে একটি নির্দিষ্ট দিন-তারিখ উল্লেখ করিয়া বলা হইতেছে, সেই দিনের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের সরকারকে পদত্যাগ করিতে হইবে। তাহা না হইলে লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়া যাইবে। বিদেশে সরকারঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হইবে। ইহার পূর্বে দিন-তারিখ উল্লেখ করিয়া একাধিক বার সরকারপতনের কথা বলা হইলেও তাহা সত্য হয় নাই। ইহার পর লক্ষ করা যাইতেছে, বিদেশের মাটিতে বসিয়া যাহারা এমন প্রচার-প্রপাগান্ডা চালাইতেছেন, তাহাদের আগের মতো জনপ্রিয়তা আর নাই। তবে এই পরিস্থিতি কেন তৈরি হইল? যদি এই সকল দেশের স্বীকৃত ও অনুমোদিত গণমাধ্যমকে মুক্ত করিয়া দেওয়া যাইত, নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিবিধান না থাকিত, তাহা হইলে এই সকল গুজব বন্ধ হইয়া যাইত বা কমিয়া আসিত। কেননা, গুজব তখনোই ছড়ায়, যখন কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতির উপর কাহারো নিয়ন্ত্রণ থাকে না কিংবা কী কারণে সেই ঘটনা ঘটিতেছে, সেই সম্পর্কে কাহারো সম্যক ধারণা থাকে না। উন্নয়নশীল বিশ্বে যাহারা ক্ষমতায় থাকেন, তাহাদের গায়ের চামড়া এত পাতলা কেন তাহাও একটি বড় প্রশ্ন। তাহারা মিডিয়ার উপর অধিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করিতে গিয়া নিজেদেরই বিপদ ডাকিয়া আনেন। সেল্ফ সেনসরশিপও এই সকল দেশের গণমাধ্যমের জন্য ক্ষতিকর।

অবশ্য পশ্চিমা বিশ্বে ফ্রিডম অব স্পিচ বা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে যেইভাবে দেখা হয়, তাহা উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য কতটা প্রযোজ্য তাহা আরেক প্রশ্ন। এমনকি অনেকে ইহাতে ত্যক্তবিরক্ত। কেননা, উন্নয়নশীল বিশ্বে নিজেদের স্বার্থে এখন অবজেকটিভ জার্নালিজম বা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জায়গায় ডেভেলপিং জার্নালিজম তথা উন্নয়ন সাংবাদিতাকে গুরুত্ব দেওয়া হইতেছে। এই ধরনের সাংবাদিকতার প্রধান কথাই হইল, আমরা সরকারের সমালোচনা করিব বটে, তবে ভালো ও ইতিবাচক দিকগুলিও তুলিয়া ধরিব নিঃসংকোচে; কিন্তু একতরফা সমালোচনা বা ঢালাও নেতিবাচকতা এই সকল দেশে সাংবাদিকতার আদর্শ হইতে পারে না। ইহা এই সকল দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে আত্মঘাতীর শামিল।

অতএব, সমালোচনা করিতে হইবে ভদ্রোচিত, পরিশিলিত ও পরিমার্জিত উপায়ে, শালীন ও যুক্তিসংগত ভাষায়। প্রচলিত গণমাধ্যমে প্রফেশনাল এডিটিংয়ের সুযোগ ও একাধিক চেকপোস্ট থাকিবার কারণে ইহা যতটা সম্ভব, ইউটিউব বা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ততটা যে সম্ভব নহে, তাহা আজ দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। এখানেই প্রচলিত মিডিয়ার গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা সমধিক। উন্নয়নশীল দেশের সরকারগুলিকে এই বাস্তবতা সঠিকভাবে উপলদ্ধি করিতে হইবে এবং এই সকল মিডিয়ার বিকাশে নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরিবর্তে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণ করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি