জর্জ অরওয়েলের ক্লাসিক উপন্যাস ‘উনিশ শ চুরাশি’ এই মুহূর্তে বেশ জনপ্রিয় একটা বই। বইটা অ্যামাজনের ক্লাসিক সাহিত্যে বিক্রীত তালিকার শীর্ষ দশে রয়েছে এবং গত বছর রাশিয়ান মিডিয়া জানায় যে, এটা সে বছর রাশিয়ায় সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড করা ই-বুক ছিল।
এই মাসের শুরুর দিকে ইলন মাস্ক এক্সে (তত্কালীন টুইটারে) একটা ছবি পোস্ট করেন, যেখানে তার নতুন টি-শার্টে ‘হোয়াট উড অরওয়েল থিঙ্ক’ বা ‘এ ব্যাপারে অরওয়েল কী ভাবতেন’—এ রকম একটি বাক্য লেখা রয়েছে। এটা দেখে অনেকে ভাবছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত গুজবের ছড়াছড়ি দেখেই হয়তো ইলন মাস্ক বিখ্যাত অরওয়েলিয়ান বিভ্রান্তিকে স্মরণ করছেন।
জর্জ অরওয়েলের ক্লাসিক উপন্যাস ‘নাইনটিন এইটি ফোর’ তথা ‘উনিশ শ চুরাশি’ নিরঙ্কুশতাবাদ, সেনসরশিপ, গুজব ইত্যাদি শব্দের সঙ্গে আমাদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। ট্রাম্প, পুতিন ও শি জিনপিংয়ের যুগকে অনেকে সেই উপন্যাসে বর্ণিত শাসনব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করছেন। এ মাসের শুরুতে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধ চলাকালে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার ছড়াছড়ি দেখা গেছে। এটা অরওয়েলের উপন্যাসে বর্ণিত সেই কাহিনিকে মনে করিয়ে দেয়, যেখানে শাসকশ্রেণি ইতিহাসের পাতায় নিজেদের ‘ন্যায়ের রক্ষক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান।
বইটা প্রথম প্রকাশের প্রায় ৭৫ বছর পর ঔপন্যাসিক স্যান্ড্রা নিউম্যান ‘উনিশ শ চুরাশি’ উপন্যাসটিকে একটা নারীবাদী পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা আমাদের কল্পনা করতে বলে যে গল্পটা যদি একটা নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়, তাহলে কেমন হতো? জুলিয়া নামের একটা চরিত্রের মাধ্যমে তিনি গল্পটাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে বলার চেষ্টা করেছেন, যেখানে একটা প্রান্তিক চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটা কল্পনা করা হয়েছে।
জন মিল্টন রচিত ১৭ শতকের মহাকাব্য ‘প্যারাডাইজ লস্ট’, যা শয়তানের দৃষ্টিকোণ থেকে ওল্ড টেস্টামেন্টকে বর্ণনা করে। এটা এই ধারার প্রথম এবং সম্ভবত সর্বোত্তম উদাহরণ, যার মধ্যে জিন রাইসের ১৯৬৬ সালের ‘ওয়াইড সারগাসো সি’র মতো উপন্যাসও রয়েছে। নিউম্যানের কাল্পনিক চরিত্র ‘জুলিয়া’ মূল গল্পকে একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে।
‘উনিশ শ চুরাশি’ উপন্যাসে স্বৈরাচারী শাসনের পুলিশের এজেন্টরা বিশ্বাসঘাতকতার মামলা দিয়ে এক দম্পতিকে আটক করে নির্যাতন শুরু করে। তাদের দৃষ্টিতে ঐ দম্পতি শাসকের প্রতি বিরাট এক হুমকি। অরওয়েল মনে করেন, এখানে স্ত্রীর চেয়ে স্বামী বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হবে, কারণ সে একটা পুরুষ। এখানে দম্পতির পুরুষ সদস্য উপন্যাসের নায়ক। আমরা তার পুরো নাম জানি। উইনস্টন স্মিথ। আমরা জানি, তার বয়স ঊনত্রিশ বছর। মিনিস্ট্রি অব ট্রুথ তথা সত্য মন্ত্রণালয়ের রেকর্ডস বিভাগে (যেখানে তিনি জাল খবর তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন) কাজ করেন। এই গল্পে তার স্ত্রীর জায়গায় আমরা জুলিয়া চরিত্রটাকে বসিয়ে ধীরে ধীরে কাহিনির ভেতরে ঢুকব।
তারা উভয়েই সত্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন, কিন্তু উইনস্টন যখন ইতিহাস পুনর্লিখনের কাজে ব্যস্ত, তখন জুলিয়া একটা যান্ত্রিক কাজে নিয়োজিত। জুলিয়া রাজনীতিতে আগ্রহী নন। উইনস্টন যখন তার সঙ্গে স্বৈরাচারী শাসকের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করতে যান, তখন তিনি ঘুমিয়ে পড়েন।
যদিও বর্তমানে তারা দুজনই পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন, তবে এটা স্পষ্ট যে এখানে উইনস্টনই বড় মাছ। রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে উইনস্টনের সহযোগী হিসেবে জুলিয়াকে আটক করা হয়েছে। তাকে বড় অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।
এখানে জুলিয়াকে এমন ছোট করে দেখার কারণ হলো অরওয়েল পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের অধিকারী ছিলেন। ১৯৮০-এর দশকে অরওয়েল সমাজে নারীদের অবস্থান উপেক্ষা করার কারণে এবং দরিদ্র নারীদের সমাজের বোঝা হিসেবে বিবেচনা করার কারণে বিভিন্ন নারীবাদী ব্যক্তিত্বের তীব্র সমালোচনার শিকার হন।
এখানে অরওয়েলের পরিবর্তে যদি একজন নারীবাদী ‘উনিশ শ চুরাশি’ উপন্যাসটা লিখতেন, তাহলে গল্পটা কেমন হতো? এখানে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে, জুলিয়ার একটা পরিপূর্ণ নাম থাকবে। জুলিয়া ওয়ার্থিং। তার একটা পরিপূর্ণ ব্যাকস্টোরিও থাকবে। নিউম্যানের উপন্যাসে জুলিয়া এসেছেন বুর্জোয়া সমাজতন্ত্রী পরিবার থেকে, যিনি প্রাথমিকভাবে স্বৈরাচারী শাসকের বিপ্লবের অগ্রদূত হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।
তার পরিবারকে প্রথমে নির্বাসিত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত হত্যা করা হয়, যখন সোভিয়েত স্বৈরশাসক জোসেফ স্টালিনের মতো নেতা নিজ দলের মধ্যে তার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করে সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মাধ্যমে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন। জুলিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক বিরোধী মানসিকতার কারণে তিনি নির্বাসিত জীবন থেকে ফিরে আসতে পারেন। পরবর্তীকালে তিনি স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে উইনস্টনের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড দেখে তার প্রেমে পড়েন (বাস্তবে উইনস্টনের প্রতি জুলিয়ার সত্যিকারের ভালোবাসা জন্মায় না, কারণ জুলিয়ার গল্পে উইনস্টন ছোট একটা চরিত্র)।
অরওয়েল ও নিউম্যানের গল্পে জুলিয়া চরিত্রের এমন বিস্তর ফারাক প্রমাণ করে যে, একই গল্প যদি দুইটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয়, তাহলে পৃথিবীটাকে কত আলাদা মনে হতে পারে। অরওয়েল যেখানে এই নারী চরিত্রটাকে একটা পরিপূর্ণ নামের মর্যাদাও দেননি, সেখানে নিউম্যান একই নারীকে গল্পের প্রধান চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। জুলিয়া ওয়ার্থিং নিজেকে পিতৃতন্ত্রের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করতে অস্বীকৃতি জানান এবং নিজেকে প্রধান চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করে তার দৈনন্দিন কাজ পরিচালনা করেন। এর ফলে তিনি নিজের চরিত্রকে সফল করার জন্য উইনস্টন স্মিথকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেন।
কেন জুলিয়া তার নিজের অধিকারে একজন বুদ্ধিজীবী বিদ্রোহী হতে পারেন না? কেন তাকে সহানুভূতি, ব্যাবহারিকতা ও অন্তর্দৃষ্টির ঐতিহ্যগত ‘মেয়েলি’ বৈশিষ্ট্য দ্বারা চিহ্নিত করা হয়? কেন তিনি নিজ গুণে একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন না?
নারী আন্দোলন দীর্ঘকাল ধরে মাতৃতান্ত্রিক বা জৈবিক নারীবাদীদের মধ্যে বিভক্ত ছিল, যারা নারীকে পুরুষদের থেকে মৌলিকভাবে আলাদা হিসেবে দেখেন এবং নারীদের সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। অন্যদিকে সমান অধিকারের নারীবাদীরা যুক্তি দেন যে লিঙ্গ পার্থক্য মূলত একটা সামাজিক গঠন মাত্র। বাস্তবে একটা সমাজে নারী-পুরুষ সমান ভূমিকা পালন করে।
অরওয়েল নারীসুলভ আচরণের মাধ্যমে জুলিয়াকে ব্যবহার করে গল্পটাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, যার কারণে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনায় জুলিয়ার উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না। অন্যদিকে নিউম্যান জুলিয়াকে একটা বুদ্ধিজীবী চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং এটা করতে গিয়ে উইনস্টন স্মিথের চরিত্রকে ছোট করে ফেলেছেন। উভয় লেখকই বিপরীত লিঙ্গকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দিয়েছেন এবং নিজ নিজ লিঙ্গের চরিত্রকে বুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রধান চরিত্রের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন, এখানে তারা দুইটা চরিত্রকে সমান গুরুত্ব দিয়ে গল্পটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন।
n লেখক :আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক
সিএনএন থেকে অনুবাদ :আব্দুল্লাহ আল মামুন
