বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাড়িতেছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৩, ০৩:৫২

সারা বিশ্ব আজ বড় অস্থির। করোনা মহামারি হইতে বিশ্ববাসী পরিত্রাণ পাইয়াছেন। এই জন্য তাহাদের অনেক মূল্য দিতে হইয়াছে। কিন্তু মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসাবে বিশ্বে নূতন করিয়া যে যুদ্ধবিগ্রহ দেখা দিয়াছে, তাহা থামিবার কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো মীমাংসা না হইতেই ফিলিস্তিনকে কেন্দ্র করিয়া অস্থির হইয়া উঠিয়াছে মধ্যপ্রাচ্য। পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ ইউক্রেনে বিশ্বের এক নম্বর গম রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়ার হামলা আজও চলমান। অন্যদিকে বিশ্বের মোট তেলের ৫২ শতাংশ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ৪৩ শতাংশের মজুতের অধিকারী মধ্যপ্রাচ্য আবার অশান্ত। ফলে বিশ্বে খাদ্য ও জ্বালানির সরবরাহ ও নিরাপত্তা আজ মারাত্মকভাবে হুমকির সম্মুখীন। ইহাতে দেশে দেশে দেখা দিয়াছে অসহনীয় মূল্যস্ফীতি। ২০২০ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি যেইখানে ছিল ১.৯৩ শতাংশ, সেইখানে ইহা গত বত্সর ছিল ৮.২৭ শতাংশ। এই বত্সর শেষ নাগাদ তাহা কোথায় গিয়া দাঁড়াইবে, তাহা আমরা কেহ জানি না। যুদ্ধকে কেন্দ্র করিয়া একের পর এক নিষেধাজ্ঞা ও পালটা নিষেধাজ্ঞায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় বিশ্ববাসীকে আজ দিশাহারা করিয়া তুলিয়াছে।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতি বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির অবস্থা কী হইতে পারে, তাহা সহজেই অনুমেয়। করোনার পূর্ব পর্যন্ত আমাদের অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স ছিল বেশ সন্তোষজনক। এশিয়ার টাইগার হিসাবে বাংলাদেশ আগাইয়া যাইতেছিল। কিন্তু করোনা ও যুদ্ধের অভিঘাত আমাদের দুশ্চিন্তায় ফেলিয়া দিয়াছে। ইহার উপর নির্বাচনি বত্সরে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো এইখানেও অর্থনৈতিক চাপ থাকাটা অস্বাভাবিক নহে। কেননা নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া রাজনীতি অস্থির হইয়া উঠিলে অর্থনীতিতে তাহার বিরূপ প্রভাব পড়িতে বাধ্য। ইহাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্তসহ বিপাকে পড়ে সামষ্টিক অর্থনীতি। সরকারের আয়-ব্যয়ের ঘাটতি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদি সমস্যা প্রকট হইয়া উঠে। ইহারই পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট-২০২৩ প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা ও টাকার অবমূল্যায়ন এই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে বড় অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলিয়া দিতে পারে। যদিও চলতি অর্থবত্সরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হইয়াছিল ৭.৩ শতাংশ, তবে বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী তাহা হইতে পারে ৫.৬ শতাংশ। আইএমএফ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ীও আমরা রহিয়াছি নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে। আমদানি-রপ্তানি ও রেমিট্যান্স হ্রাস, শিল্প খাতে বিপর্যয়, শিল্পের কাঁচামাল ও নিত্যপণ্য চাহিদামতো স্থানান্তর সংকট, রাজস্ব আদায়ে ধস, রিজার্ভ হ্রাস, ডলার-সংকট, ব্যাংক খাতে অস্থিরতা ইত্যাদি কারণে আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন হুমকির মুখে।

প্রতিকূল আবহাওয়া, জ্বালানিসংকট, অর্থপাচার, করপোরেট সুশাসনের অভাব প্রভৃতি কারণও দায়ী অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য। মর্গান স্ট্যানসির গবেষণায় অর্থনীতিবিদরা দেখাইয়াছেন যে, ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বের মোট দেশজ উত্পাদন হইবে ২.৯ শতাংশ, যাহা গত বত্সর ছিল ৩.৪ শতাংশ। তবে বিশ্ব অর্থনীতিকে দুর্দশা হইতে উদ্ধার করিতে এবং সম্ভাব্য আরেকটি ভয়াবহ বিশ্বমন্দা হইতে রক্ষা পাইতে হইলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ করা। কিন্তু দুশ্চিন্তায় থাকা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির নেতাদের এই আবেদন কি বিশ্বনেতাদের কর্ণকুহরে আদৌ পৌঁছাইবে বা পৌঁছাইলেও কি তাহাদের শুভবুদ্ধির উদয় হইবে? এই পরিপ্রেক্ষিতে উন্নত দেশগুলি বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দিয়া উঠিতে পারিলেও অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য তাহা হইতে পারে বিপজ্জনক। তাই এই মুহূর্তে উন্নয়নশীল দেশগুলির নেতাদের উচিত নিজেদের বিরোধ-বিসংবাদ যতখানি সম্ভব দূরে ঠেলিয়া দেওয়া ও জাতীয় অর্থনীতিকে বাঁচাইতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

ইত্তেফাক/এএইচপি