বারবার সাংবাদিকরা রক্তাক্ত হবেন কেন?

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৩, ০৬:৩০

দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক কার্যক্রমের কারণে আমার মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকতার কাজে যাওয়া হয়ে ওঠে না। শনিবার যেহেতু প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মহাসমাবেশ ছিল, তাই আগ্রহভরেই সব কয়টি প্রোগ্রামেই হাঁটলাম। তবে দেখা মিলল মহাসমাবেশে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর রাজনৈতিক কর্মীদের উগ্রবাদী হামলা, পুলিশের অসহযোগিতা, টিয়ার গ্যাসসহ সংঘর্ষ-সহিংসতার চিত্র। গত শনিবারের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ২৫-৩০ জনের বেশি সাংবাদিক আহত হয়েছেন। গুরুতর কয়েক জন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

এর মধ্যে ইত্তেফাক, কালবেলা, সময় টিভি, যমুনা টিভিসহ বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের সংবাদকর্মী রয়েছেন। এই সমাবেশগুলোতে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কাছে সাংবাদিকরা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের চোখেই ছিলেন। কোথাও ছবি কিংবা ভিডিও ধারণের মতো স্থান দেওয়া হয়নি। কোথাও ছাদে কিংবা ছাদের কোণে বা গাছে ঝুলে ভিডিও বা ছবি তুলতে হয়েছে। সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন। তারা কখনো-বা গুলির সামনে, টিয়ারগ্যাসের মধ্যে কখনো-বা সংঘর্ষের ফাঁকে সেরা ছবিটি তোলার জন্য জীবন বাজি রাখেন। আমার বিশ্বাস সংবাদকর্মীদের এমন কষ্টের চিত্র কোনো কোনো মিডিয়া মালিক যেন দেখেও দেখেন না। এ কথা যেমন সত্য, তেমনি রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দও আজকাল সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ ভাবা শুরু করেছেন। যেটি ঘটনা সেটিই সংবাদ—সেটি বেমালুম ভুলে যান রাজনৈতিক দলের লোকজন, প্রশাসন কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে জড়িত সরকারি আমলারাও।

এবার ধরুন, ২৮ অক্টোবর শনিবারের রাজনৈতিক দলগুলোর এক দিনের কর্মসূচিতে যদি ২৫-৩০ জন সাংবাদিকের শরীরের রক্ত ঝরাতে হয়, তাহলে আগামী তিন মাসে কত রক্ত ঝরবে? গতকালের ঘটনায় পুলিশের টিয়ারশেল নিক্ষেপে ঢাকায় কর্মরত সিনিয়র সাংবাদিক রফিক ভূঁইঞা রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে মারা গেছেন। কেন গণমাধ্যমকর্মীরা বারবার রক্তাক্ত হবেন? একই দিন পুলিশের ওপর হামলা-নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগে মামলা হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকদের ওপর নির্মম এ হামলার ঘটনায় কে বিচার চাইবে? পুলিশ যেমন রাষ্ট্রীয় বাহিনী, তেমনি সাংবাদিকরাও রাষ্ট্রের অঘোষিত চতুর্থ স্তম্ভের একটি অংশ। পুলিশ হত্যা এবং তাদের ওপর হামলার ঘটনায় অন্য যে কোনো পুলিশ বাদী হয়েই মামলা করে থাকেন। কিন্তু সাংবাদিক আহত হলে কেন নিজেকে বাদী হয়ে মামলা করতে হবে? সেখানে কর্মরত কোনো সহকর্মী কিংবা কর্মরত মিডিয়া মালিকদের পক্ষ থেকে অথবা যে কোনো সংগঠনের পক্ষ থেকে মামলার কেনো সুযোগ নেই? এর মানে সাংবাদিকদের ওপর বারবার হামলা হবে, কিন্তু কোনো বিচার হবে না, তাই তো?

কথা হলো, রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা, সুরক্ষা দেবেন। সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেবেন, নিরাপত্তা দেবেন। কিন্তু সাংবাদিকরা আদৌ কি সেই সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন? যদি না পেয়ে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন পাচ্ছেন না? স্বাধীনতার ৫২ বছরে দাঁড়িয়েও দেশের মানুষকে স্বাধীনতার জন্য, ভোট ও ভাতের অধিকারের জন্য চিল্লাচিল্লি বা গলাবাজি করতে হবে। বিশ্বের উন্নত কিংবা বাংলাদেশি ক্যাটাগরির রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক যে নাজুক পরিস্থিতি, সেটা শিগিগরই চোখে পড়বে। যারা দেশের শত শত কোটি টাকা খরচ করে উন্নত রাষ্ট্রের ফর্মুলা খুুঁজতে ভিনদেশে যান, তারা কেন এ দেশটাকে উন্নত করে শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলেন না?

এ দেশে পদ্মায় সেতু বসেছে, চট্টগ্রামে পানির নিচে গাড়ি চলে, ঢাকায় আকাশে গাড়ি চলে, চলছে মেট্রোরেলও। দেশটাকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অসাম্প্রদায়িক ছোট্ট একটি দেশ বাংলাদেশ। লাল-সবুজের পতাকাধারী স্বাধীনতা বাঙালির অহংকার। লাখ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় দেওয়ার কারণে বিশ্বের কাছে এদেশ সেরা। এ দেশের মাটিতে বারোমাসি সোনা ফলে। তবে শুধু একটি জায়গায়ই শুধু অনৈক্য। সেটি হচ্ছে রাজনৈতিক মতপার্থক্য। এ দেশটাকে সাজাতে দরকার উন্নত মেধা আর মননশক্তি। সেটি রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী লোকদের মধ্যেও থাকতে পারে। দেশ, মাটি ও মানবতার পক্ষে আসুন, সব ধরনের নৈরাজ্য, সহিংসতা, হানাহানি বন্ধ করে দেশের পক্ষে কথা বলি, উন্নয়নের পক্ষে কাজ করি।

পৃথিবী শুরু থেকে ২০২৩ বছরের এ দেশটার মধ্যে বাংলাদেশ নামের মাতৃভূমিকে আমরা সকলে মিলে এগিয়ে নিয়ে যাই। পাঁচ বছর পরপর জ্বালাও-পোড়াও কোনো রাজনৈতিক সমাধান হতে পারে না, তেমনি একচোখা দৃষ্টিভঙ্গিও কোনো সমাধান নয়। দরকার গণতন্ত্র প্রশ্নে স্থায়ী সমাধান। আমাদের দেশে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা প্রকট। এই ধরুন, এক সরকার আমলে একটি ব্রিজের কাজ হাতে নিয়েছে। আরেক সরকার এসে ঐ ব্রিজের কাজ সমাধান করবে না করে নতুন আরেকটি ব্রিজ তৈরি করবে, রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করবে। এখন প্রশ্ন হলো একটি ব্রিজের জায়গায় দুইটি বরাদ্দ এবং ডাবল খরচ। এই মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

পরিশেষে, আমরা সাংবাদিক সুরক্ষা আইন চাই। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা চাই। স্বাধীনতা-পরবর্তী ৩৯ জন সাংবাদিক হত্যার বিচার চাই। ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে সব কয়জন সাংবাদিক হামলার বিচার চাই।

লেখক: চেয়ারম্যান, বোর্ড অব ট্রাস্টি ও সভাপতি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম—বিএমএসএফ

ইত্তেফাক/এমএএম