আমাদের একটা বৈশিষ্ট্য হলো, যখন নিজের পক্ষে কিছু বলতে হয়, তখন এক রকম শব্দ ব্যবহার করি। আর যখন কারো দুর্নাম করতে হয়, কারো নামে কলঙ্ক লেপন করতে হয়, কারো প্রতি ঝাল মেটাতে হয়, তখন এক রকম শব্দ ব্যবহার করি। নিজের ক্ষেত্রে সবই ভালো, সবই সুন্দর। কিন্তু অন্যের সবকিছুই কুিসত, নোংরা ও জঘন্য। যেমন— নিজের কেউ যদি বেশি খায়, তাকে আমরা বলি, ‘ভোজনরসিক’। অথবা ‘জানেন, আমার আমার ছেলেটা না খেতে খুব পছন্দ করে’। আর যখন এটা অন্য কারো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, তখন আমরা বলি, ‘এমন পেটুক জীবনে দেখি নাই।’ অথবা, ‘কী হাভাতে রে বাবা, যেন দুনিয়াসুদ্ধ খেয়ে ফেলবে।’ অনেক সময় রাক্ষসও বলি।
নিজের ক্ষেত্রে আমরা বলি, হিসাবি, মিতব্যয়ী। কিন্তু অন্যের ক্ষেত্রে সেটা হয়ে যায়, হাড়কিপটে, ছোটলোক ইত্যাদি। শব্দ ব্যবহারের অনেক সামাজিক তাত্পর্য আছে। আছে অনেক রাজনীতিও। আসলে শব্দ-প্রতিশব্দগুলোকে আমরা নিজেদের স্বার্থ ও সুবিধামতো ব্যবহার করি। যখন যেটাতে সুবিধা হয়, তখন সেই শব্দটা ব্যবহার করি। এমনকি অনেক সময় আমরা যে শব্দটা ব্যবহার করলাম, সেটার মানে-মতলব পর্যন্ত বদলে দিই।
বাস্তবে শব্দের ব্যবহার এবং অভিধানে দেওয়া মানের সঙ্গেও অনেক সময় মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন—মাস্তান শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে নিরীহ, আল্লাহওয়ালা, দরবেশ। উপমহাদেশে মুসলিম যুগে সুফি দরবেশ, ঐশী প্রেমে মত্ত, ভাবে উন্মত্ত, দেওয়ানা, বিবাগী ও খোদার প্রেমে পাগল সুফিগণ নিজেদের ‘মাস্তান’ বলা শুরু করেন। সাধারণ মানুষও বুঝে না-বুঝে সুফি দরবেশগণকে মাস্তান বলা শুরু করে। এভাবে পারস্যের দুর্বৃত্ত মাস্তান বাংলায় দরবেশ মাস্তানে পরিণত হয়। যদিও তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ‘মাস্তান’ শব্দটি ফারসি থেকে বাংলায় আসে। ফারসি ‘মাস্তান’ শব্দের অর্থ নেশাগ্রস্ত, মাতাল, দুর্বৃত্ত, গুন্ডা ইত্যাদি। বর্তমানে মাস্তান শব্দের বাংলা অর্থও উপদ্রবকারী, চাঁদাবাজ, বদমায়েশ, গুন্ডা প্রভৃতি। ভুল জায়গায় ভুল শব্দের প্রচলন করে আমরা অনেক সময় ঐ শব্দের আসল অর্থকেই অবমাননা করে ফেলি।
আরবি ফাজিল শব্দের অর্থ বিদ্বান। কিন্তু বাংলায় শব্দটির অর্থের অবনতি ঘটেছে। বাংলায় শব্দটি এখন আর ইতিবাচক নয়, ডাহা নেতিবাচক। বাংলায় ফাজিল মানে বাচাল (আমার এক ফাজিল বন্ধু বলেছেন—কাজী নজরুল ইসলাম)। ফাজিল শব্দের অন্যান্য অর্থের মধ্যে রয়েছে জমা অপেক্ষা খরচের বাহুল্য (জমা-ওয়াশীল ফাজিল হাতছিট, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর), অতিরিক্ত, অবশিষ্ট (নিকাশ করিয়া লেনদেনি ফাজিল কিছুতেই কমে না আর—কাজী নজরুল ইসলাম; সেই ধানের ফাজিল সাগরিদগণকেই সমান বাঁটিয়া দেয়—আবুল মনসুর আহমদ), পণ্ডিত (সংস্কৃত বিদ্যায় ফাজিল নহেন—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর)।
কিন্তু ফাজিল শব্দের এসব আভিধানিক অর্থ আর প্রচলিত নয়। বরং ফাজিল শব্দের এসব অর্থ ছাপিয়ে এখন ‘বাচাল’ ও ‘বখাটে’ অর্থটাই দাপটের সঙ্গে টিকে আছে।
তালেবান শব্দটির কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। এটি একটি ফারসি শব্দ। এটা বহুবচনের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়। এর অর্থ হচ্ছে ছাত্রগণ বা ছাত্ররা। তালেব অর্থ ছাত্র এবং এর বহুবচন হচ্ছে তালেবান। এখন কেউ যদি কোনো প্রধান শিক্ষককে জিগ্যেস করে, আপনার বিদ্যালয়ে কতজন তালেবান আছে? তাহলে তাকে অবশ্যই উত্তম-মধ্যম খেতে হবে!
দুষ্ট শব্দটি আমাদের অভিধানে মোটামুটি একটি নিরীহ মানে নিয়ে স্থান করে আছে। অভিধানে দুষ্ট মানে: বিণ. ১. দোষযুক্ত, দূষিত (দুষ্টব্রণ, দুষ্টক্ষত); ২. অসত্, মন্দ (দুষ্টচরিত্র); ৩. অশুভ (দুষ্টগ্রহ); ৪. অশান্ত, দুরন্ত (দুষ্ট ছেলে)।
দুষ্টামি বি. ১. অসদাচরণ; ২. চঞ্চলতা; ৩. দুরন্তপনা।
তবে অভিধানে যা-ই থাকুক, দুষ্ট শব্দটি আমাদের সমাজে ‘মিষ্ট’ অর্থেই প্রয়োগ হয় বেশি। এই শব্দটির মধ্যে বেশ একটা প্রশ্রয় প্রশ্রয় ভাব আছে। শিশুদের ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই এই শব্দটি ব্যবহার করে থাকি। বড়দের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত ‘তাত্পর্যপূর্ণ’ভাবে শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। কেউ কাউকে জব্দ করলে ভরা সমাবেশে জব্দকারীর প্রশংসা করে বলি, ও যা দুষ্ট! আমরা সাদাকালো যুগে সিনেমা-নাটকে দেখতাম নায়ক-নায়িকাকে কিংবা নায়িকা নায়ককে রোমান্টিক দৃশ্যে আদর করে বলেছে ‘যা দুষ্টু’! এই বলার মধ্যে প্রশ্রয় ছিল, ছিল আরো দুষ্টু হওয়ার উসকানি!
সচীনদেব বর্মণের গাওয়া একটি বিখ্যাত গান আছে : ‘হায় কী যে করি এ মন নিয়া/ সে যে প্রণয়ও হুতাশে ওঠে উথলিয়া/ ওই দুষ্টু পাপিয়া বলে পিয়া পিয়া পিয়া পিয়া...।’
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তদানীন্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ সাঈদ নির্বাচন কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে ‘দুষ্ট লোকেরা পালিয়ে গেছে’ বলে আলোড়ন তুলেছিলেন। যদিও বাস্তবে দুষ্ট লোকেরা কখনো একেবারে পালিয়ে যায় না। তারা পরিস্থিতি বুঝে ঘাপটি মেরে থাকে। এরপর সুযোগমতো আবার স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়। আমাদের দেশে দুষ্ট বুদ্ধির মানুষ, দুষ্টচক্র, দুষ্ট রাজনীতি, রাজনীতির দুষ্টচর্চা ইত্যাদির কোনো অভাব নেই।
যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় যাওয়ার লোভ, আর যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকার নেশা আমাদের রাজনীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। এই দুষ্টচক্রেই আবদ্ধ রয়েছে দেশের রাজনীতি। এর থেকে উদ্ধার বা পরিত্রাণের কোনো পথ আপাতত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি একের পর রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়ে ক্ষমতাসীনদের ঘায়েল করতে চাইছে। আবার ক্ষমতাসীনরাও কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি আইন ও প্রশাসন দিয়ে বিরোধী দলকে দমন করতে চাইছে। তবে উভয় পক্ষই বিপদে আছে। কেননা, প্রায় তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পরও, একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে আবার ক্ষমতায় ফেরাটা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য নিশ্চিত নয়। সহজও নয়। অন্যদিকে প্রায় দেড় যুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে থেকে, বর্তমান প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন করে, ক্ষমতায় আসাও বিএনপির জন্য সহজ নয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর গোপন স্বার্থের খেলা। ভারত, চীন, রাশিয়া, আমেরিকা, ইউরোপীয় দেশসমূহের বহুমাত্রিক স্বার্থ ও কৌশলের দুষ্টচক্রে পড়েছে বাংলাদেশের রাজনীতি। এর থেকে রেহাই মিলবে কীভাবে, কোন পথে তা কেউ বলতে পারছেন না।
পুনশ্চ :এক গ্রামে ভীষণ দুষ্ট প্রকৃতির এক গাধা ছিল। কোথাও সে স্থির থাকতে পারত না। প্রতিবেশীদের খেত-খামার সাবাড় করত। ফসল নষ্ট করত দেদার। অতিষ্ঠ গ্রামবাসী মালিককে সতর্ক করে দিল। গাধাকে সামলে রাখার পরামর্শ দিল।
কিন্তু গাধার মালিক গাধাটাকে সামলে রাখতে পারল না। পরদিনই গাধা গ্রামের এক প্রতিবেশীর গমখেত তছনছ করে দিল। গ্রামবাসী গাধাটাকে ধরে ফেলল এবং শাস্তি হিসেবে গাধার লেজ কেটে দিল।
ঘটনা জানতে পেরে মালিক এসে অগত্যা লেজহীন গাধাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল। বিরক্ত হয়ে গাধাকে নিয়ে খোঁয়াড়ে ঢোকাল। খোঁয়াড়ের অন্য সব পশু গাধার লেজ নেই বলে ব্যাপক হাসাহাসি করল। তবে খোঁয়াড়ের অন্য একটি গাধা লেজকাটা গাধার জন্য সহমর্মিতা দেখিয়ে বলল, যা হওয়ার হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে বুঝেশুনে চলিস, দুষ্টামি করিস না। তাহলে কিন্তু আরো বড় বিপদে পড়বি!
দুষ্ট গাধা বলল, আর বিপদ! আমাকে এখনই লেজ লাগাতে হবে। লেজ ছাড়া কী আর চলে? তাছাড়া এভাবে লেজহীন থাকলে সবাই আমাকে চিনে ফেলবে, হাসাহাসি করবে...।
সহমর্মী গাধা বলল, তা কি হয়? তুই নিজে একেবারে হাতে ধরে এই বিপদ ডেকে এনেছিস...।
দুষ্ট গাধা তার কান দুটো সশব্দে ঝাড়া দিয়ে বলল, হ্যাঁ, হয়। আমি যেখানে আমার লেজ কাটা গেছে সেখানে যাব। কাটা লেজ খুঁজে নিয়ে আসব। খোঁয়াড়ের ভেতরের অন্যান্য প্রাণী এই কথা শুনে হেসে উঠল।
সহমর্মী গাধাটি বলল, এসব ছাড়! আবারও বিপদে পড়তে চাস? খারাপ অবস্থাকে আরো খারাপ হতে দেওয়া ঠিক নয়!
লেজহীন গাধা বলল, এ কাজ করলে ‘খারাপ’ ভালো হয়ে যাবে, দেখে নিয়ো!
এ কথা বলে লেজ কাটা গাধা গায়ের জোরে খোঁয়াড়ের দরজা ভেঙে আবারও গেল সেই গমখেতে যেখানে তার লেজ কাটা হয়েছিল। একটু গম খেয়ে লেজ খুঁজতে শুরু করল। এদিকে গাধার আগমন বার্তা সারা গ্রামে রটে গেল। গ্রামবাসী আবার সমবেত হয়ে দুষ্ট গাধাটাকে ধরে ফেলল।
তারা নিজেদের মধ্যে অনেক আলাপ-আলোচনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, মার দিয়ে কোনো কাজ হবে না। বরং ওর কান দুটোও কেটে দিতে হবে। তাতে যদি গাধার শিক্ষা হয়।
এরপর গাধার কান দুটিও কেটে নেওয়া হলো। গাধা এবার টের পেল কী বোকামিটাই না করেছে সে...!
‘দুষ্ট’—তা সে গাধাই হোক, আর রয়েল বেঙ্গল টাইগারই হোক, লেজ-কান না কাটলে সে একই কাজ বারবার করতে থাকবে!
লেখক: রম্য রচয়িতা ও কলামিস্ট

