কলকাতাবাসীর বাংলাদেশ দলের প্রতি অবিশ্বাস্য সমর্থন আমাকে হতবাক করেছে! আমাদের হোটেল মালিক সকালে হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় বলে দিয়েছেন, ‘দাদা, আজকে না জিততে পারলে কিন্তু হোটেলে আসবেন না।’ আশা করি বুঝতে পারছেন আমরা কী পরিমাণ চাপে আছি। নেদারল্যান্ডসের কাছে ৮৭ রানে হারের পর ইডেন গার্ডেনে বসেই হোটেল ম্যানেজারের কথা মনে পড়ছিল। জিততে না পারলে যেন হোটেলে না ফিরি।
একটা দল তো হারতেই পারে। তাই বলে এভাবে লজ্জার হার মেনে নেওয়া কঠিন। এক জন ব্যাটারও ইডেনের পিচে থাকতে পারলেন না। অবস্থা খারাপ দেখে অনেকেই গ্যালারির আসন ছেড়ে চলে যান। কিন্তু আমরা যারা আশায় বুক বেঁধে বসে ছিলাম তাদেরও রক্তাক্ত হৃদয় নিয়ে ফিরতে হয়েছে।
ইডেন গার্ডেন থেকে আমাদের হোটেলের দূরত্ব হাঁটাপথে ১৫-২০ মিনিটের। শনিবার রাতে ম্যাচ হেরে ইডেন থেকে হোটেলে হেঁটে ফেরার পথে কমপক্ষে ১৫-২০ জন ভারতীয়দের (সাধারণ মানুষ, পুলিশ, দোকানি) কাছ থেকে বাজে কথা শুনতে হলো। চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখলে কান খেলা ছিল। শব্দ ঠেকানোর সুযোগ নেই যে, পথে পথে হাসি-ঠাট্টার শিকার হলাম। শুধু আমি কেন, বাংলাদেশ থেকে আগত স্টেডিয়ামে উপস্থিত ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি ফ্যানই চরম কটাক্ষের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশের সমর্থকরা কারো কথার জবাব দেননি।
কিন্তু নিজের কাছেও তারা লজ্জা পাচ্ছিলেন। কষ্ট বুকে সইতে না পেরে বাংলাদেশের এক দর্শক নিজের পায়ের জুতো খুলে নিজের গালে আঘাত করেছেন। এই দৃশ্য যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যারা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে এ ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন তারা খুবই ব্যথিত। এমন ঘটনা কারো কাছে কাম্য নয়। সেই ব্যক্তি তার ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলেছেন, এই ক্রিকেটারদের শাস্তি দেওয়া উচিত। এত টাকা খরচ করে আমরা স্বপ্ন নিয়ে দেশ থেকে এসেছি। খেলা দেখতে। ক্রিকেটারদের সমর্থন দিতে। ভিসা পেতে কত ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। খেলার টিকিট পেতে কতটা কষ্ট করতে হয়েছে। তার পরও রয়েছে আসা-যাওয়ার ভাড়া, থাকা-খাওয়ার খরচ।
আর যদি কোনো শিক্ষার্থী এসে থাকেন তার জন্য কষ্ট আরও বেশি। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ এসেছেন বাংলাদেশ থেকে। পথে পথে দেখা হয়। কথা হয়। খেলা দেখতে এসেছেন। কলকাতায় এক শ্রেণি আসে ব্যবসার জন্য, আরেক শ্রেণি আসে বেড়াতে যাওয়ার জন্য, আর যারা খেলা দেখতে এসেছেন তাদের সঙ্গে অন্যদের কোনো মিল-ই নেই। খেলার দর্শকদের সঙ্গে সহজেই মিলে মন-প্রাণ। দূর থেকে এসে দেশের পতাকা উড়ানো হচ্ছে। যাদের জন্য এত কষ্ট তাদের কি সেই অনুভূতি আছে। থাকলে কেন এভাবে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে চলে আসবেন শান্ত, সাকিব, মুশফিক, তানজিদ, লিটন দাসরা। ভারতীয় লোকজনরা জিগ্যেস করছে ‘তোমাদের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার বাংলাদেশে গিয়ে তাবিজ আনলেন সেটা দিয়ে কি জিততে পেরেছ দাদা।’ কথা হচ্ছে, এই দায় কার? শুধুই ফ্যানদের যারা ক্রিকেটারদের তাদের যোগ্যতার থেকে বেশি ভালোবাসা সম্মান দিয়েছে না-কি ক্রিকেটার আর ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও?
