একটা বড় প্রশ্ন। এই বিশ্ব কে চালায়? একটা সময় দুইটা সুপার পাওয়ার দুনিয়াতে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল। এক পাশে যুক্তরাষ্ট্র অন্যপাশে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য। কিন্তু এমন চিত্রও বদলাতে শুরু করেছে। তাহলে বর্তমানে বিশ্বকে চালায় কারা? তৃতীয় কোন শক্তি?
‘সীমানা আবার কী? আমরা পৃথিবীর নাগরিক’ এই মর্মে ১৯৪৮ সালে গ্যারি ডেভিস ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড’ আন্দোলন শুরু করেছিলেন। কেউ বলেছিল অবাস্তব, কেউ বলেছিল দেশদ্রোহী, কেউ বলেছিল পাগল। আর তিনি বলেছিলেন, ‘আমি পৃথিবীর সন্তান, পৃথিবীর নাগরিক। আমার কাছে পৃথিবী পদার্থমাত্র নয়, তা এক জীবন্ত আইডিয়া। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিভেদের এই সীমারেখা আমি মানব কেন?’ ২০১৩ সালে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জারি ছিল গ্যারির লড়াই। সবকিছুর পেছনে গ্যারির একটাই সহজ সরল যুক্তি ছিল রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিভেদের এই প্রাচীর ভেঙেই একমাত্র বিশ্বজুড়ে অনবরত ঘটে চলা যুদ্ধ থামানো সম্ভব। কিন্তু গ্যারির এই থিউরি বিশ্ব মোড়লরা পাত্তা দেবে কেন? বিশ্বে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারেই তাদের লক্ষ্য। ফলে সুপার পাওয়ার এই দেশগুলোর নাগরিকরা শান্তিতে বিছানায় শুয়ে পপকর্ন খেতে খেতে ব্যাক টু দ্য ফিউচার দেখে আর যুদ্ধরত দরিদ্র বা স্বল্পোন্নত দেশগুলো পুড়ে খাক হয়।
বিশ্ব কূটনীতির মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র
পরাশক্তি দেশগুলো বিশ্ব শাসনের লক্ষ্যে এখন বিশ্ব কূটনৈতিক চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফির জন্য লড়াই করছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মানচিত্র দেখলেই আপনার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এর সবচেয়ে শক্তিশালী খেলোয়াড়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার একমাত্র দেশ যারা দুনিয়ার প্রতিটি কোণে সৈন্য, নাবিক, সামরিক সরঞ্জাম পাঠাতে পারে। তার আশপাশে আর কেউ নেই। এশিয়ায় চীন তার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে কিন্তু এর বাইরে নয়। এশিয়ার অনেক আমেরিকান মিত্র এ নিয়ে আবার উদ্বিগ্ন। ফলস্বরূপ তারা আমেরিকার ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে উঠছে এবং মার্কিন নিরাপত্তার ছাতার নিচে থাকতে চাইছে। কিন্তু ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধে কূটনৈতিক লড়াইয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ শক্তির সামনে অনেকটাই মাথানিচু করতে বাধ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যাতে খানিকটা স্বস্তি খুঁজছে রাশিয়া।
মার্কিন চাপে ইউরোপীয় ইউনিয়ন
যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু ইউরোপ দীর্ঘ দিন ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অনুসরণ করে আসছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের কী লাভ হয়েছে তা দেশটি জানে, কিন্তু ধসে গেছে ইউরোপের অর্থনীতি। ২০০৮ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতি মার্কিন অর্থনীতির চেয়ে ১০ শতাংশ বড় ছিল, আজ মার্কিন অর্থনীতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতির চেয়ে ৫০ শতাংশ বড়। ফলে অর্থনৈতিক চাপে আছে ইউরোপিয়ান দেশগুলো। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যুদ্ধ বাঁধিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় যে শরণার্থী সংকট তৈরি হয়েছে তার চাপ এসে পড়েছে ইউরোপের ঘাড়ে।
রাশিয়াকে ঘায়েল করার সুযোগ পেয়ে ইউক্রেনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র সঙ্গে টেনে এনেছে ইউরোপকেও। যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনা হতে দিচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র, যার মাসুল গুনছে ইউরোপ। রাশিয়ার জ্বালানি গ্যাস কেনায় বাধা ও নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে চারগুণ বেশি দামে জ্বালানি কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক আধিপত্য বাড়াচ্ছে চীন
চীন শুরুতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলো, তাদের পরিকল্পনা ছিল আরও ধনী এবং শক্তিশালী হওয়ার। ঠিক আমেরিকানদের মতো। বর্তমানে তাদের অর্থনীতি ও শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের জায়গা করে নিয়েছে চীন। ফলে ভূরাজনীতি আর অর্থনীতিতে মার্কিন আধিপত্য সয়ে যাওয়া দক্ষিণ গোলার্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আর মার্কিন প্রেসক্রিপশনের ওপর ভরসা করতে চাইছে না। চীনের ওপর ভরসা বাড়ছে তাদের।
আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন অর্থনৈতিকভাবে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। একারণেই তারা একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। শুনে হয়ত অবাকই হবেন বর্তমানে মার্কিন-চীন বাণিজ্য সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। মজার ব্যাপার হলো বর্তমানে বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রই যুক্তরাষ্ট্রের ছায়াতলে থাকতে চায় আবার চীনের বাজারেও তাদের প্রবেশাধিকার চায়। কারণ চীনের অর্থনীতি ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে।
কিছুটা কোণঠাসা রাশিয়া
রাশিয়া পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কখনোই একাত্মতা প্রকাশ করেনি। এক সময়কার সুপার পাওয়ার বর্তমানে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছে এবং তারা এটা নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ করে রাশিয়া বর্তমানে কিছুটা কোণঠাসা। দৃশ্যত রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর শক্তি অনেকটাই কমেছে।
পশ্চিমারা বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধে নাকি রাশিয়া দুই লাখ সৈন্য হারিয়েছে। আর নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোটাও বেশ কঠিন। রাশিয়া চীন ও অন্যান্যদের পারমাণবিক অস্ত্র আছে, কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক ভালো খবর হচ্ছে কেউই তা ব্যবহার করছে না।
এছাড়াও ভারত বিশ্বমঞ্চে অর্থনৈতিকভাবে একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। জাপানও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। পরবর্তী দশবছরে অর্থনীতির বিভিন্ন উত্থান এবং পতন হবে, কিন্তু কারও কাছেই একক কর্তৃত্ব থাকবে না। বরং এখানে বহুমুখী আধিপত্য থাকবে।
তাহলে এই বিশ্বকে চালায় কে?
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ছাড়াও তৃতীয় একটি শক্তি রয়েছে যা বর্তমানে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে ‘ডিজিটাল অর্ডার’। এটি কোনো দেশের সরকার নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। বর্তমানে প্রযুক্তির ছায়া তলে বিশ্ব। বিশ্ব চলছে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে। পৃথিবীর নাগরিকদের আবেগ, বিবেক, বিক্ষোভ কিংবা অর্থনীতি, কূটনীতি, যুদ্ধ, সাইবার হামলা, প্রোপাগান্ডা সব কিছুরই নিয়ন্ত্রক এই ডিজিটাল অর্ডার। যা অনেকটা গ্যারি ডেভিসের ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড’-এর মতো, যার কোনো সীমানা নেই, সবাই এক পৃথিবীর নাগরিক। সুতরাং ডিজিটাল দুনিয়ায় যারা সেরা হবে তারাই হবে পৃথিবীর নতুন রাজা।
লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

