রোববার, ঘড়ির কাটায় ঠিক সকাল এগারোটা। বাইরে গনগনে রোদ। এমন দিন দেখে বোঝা যায় না বাইরে অবরোধ। রাজধানীর আগারগাঁও জনতা হাউজিং থেকে কুটুম গলিতে যখন প্রবেশ করি চোখে পড়ে একটি পুলিশভ্যান। কুটুমগলি পেরিয়ে জামিল রোডে যখন পৌঁছালাম তখন এগারোটা ১০ বাজে। তালতলার এই গলিটি সবসময় লোকে লোকারণ্য। দেখে বোঝার উপায় নেই আজ অবরোধ। মানুষের চলাফেরা স্বাভাবিক। ফুটপাতে গা ঘেঁষাঘেঁষি দোকান। মাছের বাজারে মানুষের কোলাহল। মাছের ওপর ভনভন করছে মাছি। নিত্যপণ্যের উচ্চদরের দিনে মানুষ আর মাছির মধ্যে আসলে পার্থক্য কী? এমন প্রশ্নও ঢুকে পড়ে মাথার ভেতর।
খোলা হয়েছে হোটেল রেস্তোরাঁ। বাইতুল মামুর জামে মসজিদ পেরিয়ে বাম পাশে কাঁচাবাজার। কৌতুহলী জানতে চাইলাম আলুর দাম কত? দোকানি জানালেন ১০ টাকা কমেছে। এখন ৬০ টাকা। পেঁয়াজ কত? ১৩০। ভারত থেকে আমদানি করেও দাম কমেনি কেন? চোখ গেলো ইলিশ মাছের দিকে। তিনটি ইলিশ মাছ আনুমানিক ১ কেজি ছুঁইছুঁই। একদাম ৮০০ টাকা কেজি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে দেশব্যাপী চতুর্থ দফায় ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ চলছে বিএনপি ও সমমনা দলের।
চতুর্থ দফা অবরোধের প্রথম দিন আজ। আগারগাঁও সরকারি কোয়াটার পার হবার সময় চোখে পড়লো আরেকটি পুলিশের গাড়ি। কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার। পাশ কাটিয়ে ফলের দোকানগুলোর দিকে তাকালাম। উৎসাহী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ডাবের দাম কত? একশো টাকা। মানুষ কত সহজে ভুলে গেছে ডেঙ্গুর কথা? গতকালও মারা গেছেন ৮ জন।
আগারগাঁও মেইন রোডে যখন পৌঁছালাম তখন ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সাড়ে ১১টা। রাস্তা পেরোনো পর আরও একটি পুলিশের বড় লরি। গাড়িতে কোনো পুলিশ নেই। পুলিশের এত গাড়ি দেখে বোঝা যাচ্ছিল অবরোধের হাওয়া।
মক্কা বিরানি হাউজে ভিড়। তেহারির ঘ্রাণে কাবু হয়ে গেছি প্রায়। আমার ক্ষুধা পেয়ে যায়। মিরপুর থেকে ছেড়ে আসছে গণপরিবহন। তাদের কারও গন্তব্য গুলিস্তান কারও যাত্রাবাড়ী। আমি একটা গাড়িতে চড়ে বসি। গাড়িটির নাম আয়াত। চিড়িয়াখানা থেকে ছেড়ে যাবে যাত্রাবাড়ী।
চিড়িয়াখানা থেকে সায়দাবাদ-শনির আখড়াগামী আয়াত পরিবহনের চালক মহাব্বত আলী বলেন, অবরোধে যাত্রী কম কিন্তু রাস্তা ফাঁকা। আরামে গাড়ি চালাচ্ছি। আয়াত পরিবহন থেকে আগারগাঁও চৌরাস্তা মোড়ে নেমে যাই। মানুষের আনাগোনা কম। তবে গণপরিবহনও দেখা যায়।
সরেজমিনে গাবতলী থেকে ছেড়ে আসা বৈশাখী পরিবহনের একটি গাড়িতে মাত্র তিনজন যাত্রী নিয়েও যেতে দেখা গেছে। তাদের গন্তব্য গুলশান হয়ে ভাটারা। সেখানে কথা হয় কয়েকজন বাসচালক ও যাত্রীদের সঙ্গে। যাত্রাবাড়ী-মিরপুর রুটের শিকড় পরিবহনের গাড়িচালক মাসুদ বলেন, অবরোধে গাড়ি চালানো লাগবেই। নয়তো বাস মালিক সমিতি রুট পারমিট বন্ধ করে দেবে বলেছে। বাধ্য হয়েই রাস্তায় নেমেছি।
বাংলামোটরের উদ্দেশে বের হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী জানান, জরুরি কাজে বের হয়েছি। বিরোধী দল শান্তিপূর্ণভাবে যেকোনো কর্মসূচি পালন করতেই পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তির শেষ কোথায়? আমরা শান্তি চাই।
রাজধানীর আজিমপুরগামী মিরপুর সুপার লিংকের চালক ইদ্রিস মিয়া বলেন, অবরোধ তো আর পেটে শোনো না। ভয়ে ভয়ে বের হয়েছি। সাবধানে দেখে দেখে চালাচ্ছি। যাত্রী কম। কাল রাতে গাড়িতে আগুন দিছে। ভয়ে আছি।
বাহরুল বাশার নামে এক বেসরকারি চাকরিজীবী জানান, সরকারি অফিসে অবরোধে না গেলেও চলে। তাদের সরকারি পরিবহন সেবা আছে। বিপদ তো আমাদের। অফিসে না গেলে তো বেতন দেবে না। আমাদের যন্ত্রণা কেউ দেখে না। কোনো সরকারই না। তারা আছে তাদের ক্ষমতার স্বার্থে।
শিকড় পরিবহনে চালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে খামারবাড়ি মোড়ে চলে আসি। দুজন যাত্রী নেমে গেলেও গাড়িতে ওঠেন আরেক যাত্রী। ৪২ সিটের গাড়িতে যাত্রী মোট ১৫-২০ জন।
ফার্মগেটে যখন নামি তখন ১২টা বেজে ২০ মিনিট। গণপরিবহন একেবারেই কম। এমন ফার্মগেট সচারচার দেখা যায় না। মোটরসাইকেল চোখে পড়ার মতো। তাছাড়া হাতেগোনা কিছু প্রাইভেটকারও দেখা গেছে নগরীর এই ব্যস্ততম এলাকায়। সেখানেও কথা হয় আরও কয়েকজন চালক-যাত্রীদের সঙ্গে।
মিরপুর থেকে ছেড়ে আসা মতিঝিলগামী বিআরটিসি বাসচালক তাহের জানান, রাস্তাঘাট একেবারে ফাঁকা। মানুষ আতঙ্কে বের হচ্ছে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান, সরকারি গাড়ি। আমাদের তো বের হওয়া লাগবে। ষাটোর্ধ এক যাত্রী জানান, অবরোধ চলবে অবরোধের মতন। আমরা সাধারণ পাবলিক চলবো পাবলিকের মতোন। আমরা ভাই এতো অবরোধ-টবরোধ বুঝি না। বিরোধীদল গিয়ে সরকারের লগে বসুক। তাদের লগে আলোচনা করুক। ক্ষমতা ভাগাভাগির বলি আমরা কেন হবো?
এভাবে কথা বলতে বলতে কারওরান বাজার মোড়ে কখন যে পৌঁছে গেছি বুঝতে পারি না। সেখানে নেমে পড়ি। সোনারগাঁও হোটেলের সামনে একটা জটলা দেখা যায়। সেদিকে এগিয়ে গেলাম। ক্লান্ত এক পথচারীকে দেখা গেল। তিনি রাস্তা পারাপারের সময় পায়ে আঘাত পেয়েছেন। বললেন ভাই বিপদে আছি। আমাদের শান্তি নাই।
কারওয়ান বাজার থেকে মগবাজারগামী লাব্বায়েক পরিবহনে চড়ে বসি। কথা হয় চালক-যাত্রীদের সঙ্গে। শরীফ নামে এক মালিবাগগামী যাত্রী বলেন, বিরোধীদল অবরোধ ডেকেছে নির্বাচনের জন্য। কিন্তু আমাদের ভোগান্তি তো কেউ ভোগ করে না? বাংলামোটর এলাকায় কিছু গাড়ি দেখা যায়। সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে রাইড শেয়ারিং করা মোটরসাইকেল। কথা হয়ে তাদের সঙ্গে।
মহিদুল নামে এক রাইড শেয়ারিং চালক জানান, সকালে বের হয়েছি। মাত্র ২০০ টাকা হয়েছে। আর অবরোধ না থাকলে এতক্ষণ ২ হাজার টাকা ইনকাম করতে পারতাম। কথা বলতে বলতে গাড়ি পৌঁছে যায় মগবাজার। গাড়ি থেকে নেমেই দেখি রিকশার যানজট। কথা হয় তাদের সঙ্গে।
বাদল কাজী নামে একজন রিকশাচালক জানান, বাজার করতে পারছি না। অবরোধে ইনকাম কম। মানুষ নেই। চালের দাম ৭০ টাকা। আলু ৭০ টাকা। আমরা খামু কী? এসব নিয়ে কেউ ভাবে না। শুধু অবরোধ আর অবরোধ। জিনিসপত্রের দাম কমানোর দাবি জানান তারা।
প্রসঙ্গত, ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর থেকেই অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করে আসছে বিএনপি। কয়েক দফার অবরোধ চলাকালে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও যানবাহনে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। সারাদেশে বিএনপিসহ বিরোধী দলের শত শত নেতা-কর্মীকে আটক করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
