পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

হবিগঞ্জের হাওর-কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২৩, ০২:৪৬

হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাওর ও কৃষিজমিতে অপরিকল্পিতভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠায় সংকুচিত হচ্ছে হাওর ও কৃষিজমি। একই কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া বিষাক্ত বর্জ্যে ফসল ও মত্স্য সম্পদ বিনষ্ট হওয়া ছাড়াও জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগব্যাধি। পরিবেশ বিপর্যয়ের এই আশঙ্কা সত্বেও নির্বিকার রয়েছে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো। জেলার সর্ববৃহত্ ঘুঙ্গিয়াজুরি হাওরে ইদানীং শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এতে হাওরের আয়তন কমে যাওয়া ছাড়াও এর জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হচ্ছে।

জানা যায়, গত তিন দশকে মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর থেকে অলিপুর পর্যন্ত স্থানে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উভয় পার্শ্বে বেসরকারি উদ্যোগে অপরিকল্পিতভাবে অর্ধশতাধিক বৃহত্ ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। জমির ক্রয় মূল্য কম, বিদ্যুত্-গ্যাসের সহজলভ্যতা, প্রয়োজনীয়সংখ্যক শ্রমিক পাওয়া, সর্বোপরি রেল ও সড়ক পথে ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখানে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। রতনপুর-ছাতিয়াইন, পাইকপাড়া-নসরতপুর সড়ক এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মিরপুর-আউশকান্দি অংশেও বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারিভাবে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের তোয়াক্কা না করে হাওর কিংবা ফসলি জমি বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা (ইটিপি) স্থাপন না করেই উত্পাদনে যাওয়ায় এগুলো থেকে নিষ্কাষিত বিষাক্ত কেমিক্যাল সংবলিত বর্জ্য খালেবিলে-নদীতে ছেড়ে দেওয়ায় জেলার মাধবপুর ও লাখাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবার অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি থাকা সত্বেও তা যথাযথ ভাবে ব্যবহার করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ৮ নভেম্বর হবিগঞ্জ জেলা বাপা কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধি দল অলিপুর শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন করেন। এ সময় স্থানীয় জনসাধারণ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে নিষ্কাষিত বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য ফকিরা খাল, রাজ খাল, খড়কি গাং দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার অভিযোগ করেন। তারা জানান, এতে শিবজয়নগর, ছাতিয়াইন, পিয়াইম, খড়কি, সাকুচাইল, মনিপুর, মোড়াকড়ি, জগদীশপুর, একতিয়ারপুর, সাতপাড়িয়াসহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন।

পরিবেশকর্মী আব্দুল কাইয়ুম জানান, খড়কি গাং দিয়ে বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য খালটি নদীতে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় পরিবেশ বিপন্ন করছে।

লাখাই উপজেলার গদাইনগর গ্রামের কৃষক আব্দুল মতিন জানান, শৈলজুড়া খাল নিয়ে বিষাক্ত শিল্পবর্জ্যের কালো পানি সুতাং নদীতে ছড়িয়ে পড়ায় নদীর পানি বিনষ্ট হওয়া ছাড়াও নদীটি মাছশূন্য এবং পার্শ্ববর্তী জমির ফসল উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার তোফাজ্জল সোহেল বলেন, হাওরসহ ফসলি জমিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রবণতা অব্যাহত থাকায় জেলার একাধিক উপজেলায় মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে।

জেলা বাপা সভাপতি অধ্যক্ষ ইকরামুল ওয়াদুদ বলেন, দীর্ঘদিন যাবত্ হাওর ও ফসলি জমিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে হাওর ও জমির আয়তন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। জেলার হাওর এলাকায় জীববৈচিত্র্য রক্ষাকল্পে এখনই কার্যকরব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

পরিবেশ অধিদপ্তর হবিগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপ পরিচালক আক্তারুজ্জামান টুকু বলেন, এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে। এর বেশি কিছু বলতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।

জেলা প্রশাসক দেবী চন্দ বলেন, পরিকল্পিত শিল্পায়নের বিকল্প নেই। শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশের ভারসাম্য যাতে বিপন্ন না হয়, সে ব্যাপারে সকলকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অচিরেই জেলার বিভিন্ন স্থানের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে শিল্পদূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জেলা প্রশাসক জানান।

ইত্তেফাক/এসকে