‘দ্বিধার পৃথিবী’ বিস্তার করিতেছে জাল

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৩, ০৪:১৫

অর্থনীতি হইল জাতীয় নিরাপত্তার ইঞ্জিন। এই অর্থনীতি আবার প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনীতি দ্বারা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকিলে অর্থনীতির চাকা দুর্বার গতিতে ছুটিতে পারে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সংকটের উত্পত্তি ঘটে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার কারণে। আজিকার মহা প্রতিযোগিতার বিশ্বে বৃহত্ শক্তিগুলির মধ্যে যে ধরনের ‘রাজনৈতিক খেলা’ চলিতেছে, তাহা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কী বহিয়া আনিবে, তাহাই বিবেচ্য। বিশেষত, পরাশক্তিগুলির মধ্যকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-কলহের কারণে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিকে বরণ করিতে হইতেছে নানাবিধ অনভিপ্রেত দুর্বিপাক ও দুর্দশা। বৃহত্ অর্থনৈতিক শক্তিগুলির মধ্যে যে অস্থিরতা চলিতেছে, তাহার অভিঘাতে বিক্ষত হইতেছে ডেভলপিং নেশনস। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পক্ষগুলির মধ্যে চলমান যুদ্ধে আক্রান্ত অঞ্চলই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে না, ইহার ফলে দরিদ্র দেশগুলির অবস্থাও অতি শোচনীয় হইয়া পড়িতেছে। ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’—যুগ যুগ ধরিয়া শুনিয়া আসা এই কথাই বর্তমান বিশ্বে বড় বাস্তবতা।

বৃহত্ শক্তিগুলির দ্বন্দ্বে বিশ্বের কোন কোন দেশ উত্তাল হইয়া উঠিতেছে, তাহার হদিস রাখাই যেন দুষ্কর! কারণ, সহিংস হউক বা অহিংস, সরকারগুলিকে একধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়া যাইতে হইতেছে। এই অস্থির ঢেউয়ে আক্রান্ত প্রতিটি মহাদেশই। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাই ইহার এক নম্বর কারণ। একটি সময় ছিল, যখন ‘পরাশক্তি (সুপার পাওয়ার)’ বলিতে আমরা দুইটি বলয় বা পক্ষকে বুঝিতাম, কিন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আরো অনেক সুপার পাওয়ারের আবির্ভাব ঘটিয়াছে। সামরিক শক্তিমত্তার কলেবর বাড়াইতে সম্প্রসারণ ঘটিয়াছে পূর্বের শক্তিগুলিরও। কানেকটিভিটির বিশ্বে ইহা এমন এক ব্যবস্থা, যেইখানে ক্ষুদ্র দেশগুলিও কোনো একটি পক্ষে নাম লেখাইতে বাধ্য। এই অর্থে, বৃহত্ শক্তিগুলির মধ্যে কোনো বিবাদ দেখা দিলে তাহাতে যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে জড়াইয়া পড়িতেছে ক্ষুদ্র দেশগুলি, তথা উন্নয়নশীল বিশ্ব। ইহার ফলে ঐ সকল উন্নয়নশীল দেশের জাতীয় জীবনেও নামিয়া আসিতেছে একধরনের অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও দ্বিধা।

বর্তমান বাস্তবতায় বৈশ্বিক অর্থনীতিকে হাতের মুঠোয় রাখিবার জন্যই তীব্র প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইয়াছে সুপার পাওয়ারগুলি। ইহার ফলে যুদ্ধবিগ্রহ কেবল বাড়িতেছেই। সৃষ্টি হইতেছে নূতন নূতন সংকট। এই সকল সংকট বা সংকটাবস্থা বৃহত্ রাষ্ট্রগুলি সামলাইতে পারিলেও দরিদ্র দেশগুলি পড়িয়া যাইতেছে অর্থনীতির গভীর খাদে। উদ্ভূত সংকট হইতে নিষ্কৃতি লাভে কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে চলিতে গিয়া পড়িয়া যাইতেছে নূতন বিপদে। অনিশ্চয়তার বেড়াজালে আবদ্ধ হইয়া হাঁসফাঁস করিতেছে অনেক দেশ। বিশ্বব্যাংক বহুকাল পূর্ব হইতেই মন্দার আশঙ্কা করিয়া আসিতেছে। সত্যি বলিতে, বিশ্বব্যাপী মন্দা চলিতেছে! ইহা যে পরাশক্তিগুলির মধ্যকার প্রতিযোগিতার সাইড ইফেক্ট, তাহা আজ পরিষ্কার। অর্থাত্, অস্থিতিশীল বৈশ্বিক রাজনীতি উন্নয়নশীল বিশ্বের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকে একেবারে ভাঙিয়া চূর্ণবিচূর্ণ করিয়া দিতেছে। ইহা তো মহা মুশকিলের কথা!

সংঘাত-যুদ্ধ যখন শেষ হইয়া যায়, তখন ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত মানুষের কপালে জোটে করের বোঝা—ঋণ, রাশি রাশি বিধবা আর কাঠের পা। অর্থাত্, পরাশক্তিগুলি যখন যুদ্ধ থামাইবে, তখন বিশ্বের চূড়ান্ত অবস্থা কীরূপ হইবে, তাহা সহজেই অনুমেয়। সেই সময় উন্নয়নশীল বিশ্বের চিত্র কেমন হইবে? যুদ্ধজাত অস্থিরতা এড়াইয়া যাওয়ার চেষ্টা করিলেও তাহা হইতে কি নিষ্কৃতি পাওয়া যাইবে? পরাশক্তিগুলির মধ্যকার দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ যেইহেতু শীঘ্র শেষ হইবে বলিয়া মনে হইতেছে না, কাজেই আমাদের ভবিষ্যতের পৃথিবী হইবে ‘দ্বিধার পৃথিবী’। সেই পৃথিবীতে নিশ্চিতভাবে অপেক্ষা করিতেছে আরো বড় বিপদ! পরাশক্তিসৃষ্ট অস্থিরতা এবং তাহার কারণে উন্নয়নশীল বিশ্বের দুর্দশার উত্তরণ ঘটিবে কীভাবে, তাহাই বড় চিন্তা!

ইত্তেফাক/এএইচপি