ঋতু পরিবর্তনে রাজশাহীতে শিশুদের নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিদিন শতাধিক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোয় ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই অবস্থা। ভর্তি শিশুদের চিকিৎসা দিতে চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন।
এদিকে রামেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় এপিএন স্যালাইনের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় স্বজনরা চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ওষুধের দোকানে ৬৫ টাকার এপিএন স্যালাইন ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের স্যালাইন পাওয়া গেলেও রাজশাহী জুড়ে এপিএন স্যালাইনের হাহাকার চলছে।
রামেক হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে নাটোরের মাসুদ রানা কয়েক দিন ধরে অবস্থান করছেন। গত ৭ নভেম্বর হাসপাতালে তিনি সন্তানকে ভর্তি করান। হাসপাতালে স্যালাইন না থাকায় নগরীর লক্ষ্মীপুরের এক ফার্মেসি থেকে ৬৫ টাকার এপিএন স্যালাইন তিনি ৮০০ টাকায় কিনেছেন। চিকিৎসাধীন আরেক শিশুর বাবা সোলাইমান আলী জানান, এ স্যালাইন তিনি ১ হাজার ২০০ টাকায় কিনেছেন। তিনি আরও জানান, এপিএন, বেবি সল্টসহ আরও কিছু স্যালাইন চিকিৎসকরা লিখছেন। কিন্তু রাজশাহীতে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বেশি দাম দিতে চাইলে ফার্মেসির লোকেরা এনে দিচ্ছেন।
রোগীর স্বজনরা আরও জানায়, হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের উপচে পড়া ভিড় লেগে আছে। এই সুযোগে নগরীর লক্ষ্মীপুর ডায়াগনস্টিক পট্টির ফার্মেসিগুলো স্যালাইনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কয়েকগুণ দাম আদায় করছে। এপিএন স্যালাইনের ৫০০ এমএল ব্যাগের গায়ে লেখা দাম মাত্র ৬৫ দশমিক ২৫ টাকা। আর ১ হাজার এমএলের দাম লেখা ৮৬ দশমিক ৩২ টাকা। ডিএনএস-১০ স্যালাইনের দাম ৮০ টাকার মধ্যে। কিন্তু এসব স্যালাইন ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এমন অরাজক পরিস্থিতির মধ্যেও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো রহস্যজনকভাবে নীরব থাকায় ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির রাজশাহী শাখার সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম শামীম জানান, নিউমোনিয়ার প্রতিরোধী এ ধরনের এক ব্যাগ স্যালাইনের সর্বোচ্চ দাম ১০০ টাকা হতে পারে। কিন্তু ১ হাজার ২০০ টাকা হবে-এটা খুবই অস্বাভাবিক। শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় হয়তো চাহিদা বেড়েছে। তবে কোম্পানিগুলো সরবরাহ বাড়াচ্ছে না। এ কারণে সংকট তৈরি হয়েছে। ৬৫ টাকার স্যালাইন ১ হাজার ২০০ টাকা বিক্রি হওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় বলেও জানান তিনি।
জানা যায়, রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের কয়েকটি ওয়ার্ডে ২০০ শয্যা আছে। এর বিপরীতে প্রতিদিন শতাধিক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু ভর্তি হচ্ছে। ডায়রিয়া আক্রান্ত কিছু শিশুরাও রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রবিবার রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে দেখা যায়, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু ও স্বজনদের ভিড়ে ওয়ার্ডের ভেতরে ও বারান্দায় পা ফেলার জায়গা নেই। ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায় শিশু রোগীদের সারি করে শুইয়ে রাখা হয়েছে। প্রতিটি শয্যায় চার থেকে ছয়টি করে শিশু রাখা হয়েছে।
চিকিৎসকরা জানান, কয়েক দিন ধরে হাসপাতালে নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশু বেশি আসছে। তাদের বয়স শূন্য থেকে দুই বছর বা আড়াই বছর। অধিকাংশের চিকিৎসায় এপিএন স্যালাইন-৫০০ বেশি দরকার হচ্ছে। কিন্তু এক মাসের বেশি সময় হাসপাতালে বেবি সল্ট জুনিয়র, বেবি সল্ট ও এপিএন স্যাল্যাইন সরবরাহ নেই। ডিএনএস স্যালাইনও নেই। দোকান থেকে অস্বাভাবিক বেশি দামে এসব স্যালাইন অভিভাবক ও স্বজনদের কিনতে হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, শিশুদের প্রাণরক্ষাকারী স্যালাইন ঘিরে রাজশাহীতে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। অভিভাবকদের জিম্মি করে স্যালাইনের দাম প্রায় ২০ গুণ বাড়িয়েছে কতিপয় ওষুধ ব্যবসায়ী। তবে স্যালাইন প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো দাম বাড়ায়নি। তবে কোম্পানিগুলো বাজারে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ বাড়ায়নি।
