শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি শিক্ষার দৈন্যদশা

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:৩০

বাংলাদেশে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়ার যে প্রভূত উন্নতি হইয়াছে, তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশকে ছাপাইয়া আমাদের স্লোগান হইতেছে স্মার্ট বাংলাদেশ গঠন। ইহা ডিজিটাল বাংলাদেশের আরো উন্নত ভার্শন বা রূপ। এই স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনেরও মৌলিক ভিত্তি তথ্যপ্রযুক্তিতে উন্নতি সাধন। এই উন্নতির জন্য স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষার্থী তথা নূতন প্রজন্মকে আগে তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করিয়া তুলিবার কোনো বিকল্প নাই। ইহার অংশ হিসাবে সরকার বিশেষত মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে শেখ রাসেল ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব চালু করিয়াছে। ইহা একটি মহতী উদ্যোগ নিঃসন্দেহে। কিন্তু দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ডিজিটাল ল্যাবগুলির অবস্থা শোচনীয়। এইখানকার কম্পিউটারগুলি দীর্ঘদিন ধরিয়া নষ্ট। কাগজে কলমে আইসিটি শিক্ষা বাধ্যতামূলক হইলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে  আইসিটি বিষয়ের শিক্ষকই নাই।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯০ শতাংশ ডিজিটাল ল্যাবের অবস্থা করুণ।  ডেস্কটপ ও ল্যাপটপ নষ্ট হইবার কারণে তাহা ব্যবহারের অনুপযোগী। ব্যাবহারিক পরীক্ষার নম্বর দেওয়া হইতেছে অনুমানের ওপর ভিত্তি করিয়া। দীর্ঘদিন ধরিয়া পড়িয়া থাকিবার কারণে ধুলাবালির আস্তরণ জমিয়াছে কম্পিউটার ও চেয়ার-টেবিলগুলিতে। ইহাতে শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাবহারিক জ্ঞান হইতে বঞ্চিত হইতেছে। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, একটি কম্পিউটার বা ল্যাপটপের সম্মুখে একজন শিক্ষার্থী চেয়ারে বসিবার সুযোগ পাইলেও বাকিরা দাঁড়াইয়া তাহা দেখিতেছে। অর্থাত্ কম্পিউটার ও ল্যাপটপের পাশাপাশি অন্যান্য সরঞ্জামাদিরও যে অভাব রহিয়াছে, তাহা বলাই বাহুল্য। এই ল্যাবগুলিতে কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়াছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের অভিযোগ, ল্যাব স্থাপনের পর সংশ্লিষ্ট দপ্তর হইতে আর কোনো খোঁজ নেওয়া হয় নাই। প্রতিটি ল্যাবে ১৭টি ল্যাপটপ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হইয়াছে। এই সরঞ্জামাদি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, পাঠ্যপুস্তকের বিষয়গুলিকে শিক্ষার্থীদের নিকট আকর্ষণীয়, আনন্দদায়ক ও সহজবোধ্য করিয়া উপস্থাপন করিবার লক্ষ্যে ডিজিটাল কন্টেন্ট চালু করিয়াছে সরকার। চালু করিয়াছে ই-বুক সেবা। ইহা ছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক বইটিও বাধ্যতামূলক পাঠদান করা হইয়াছে। কিন্তু মালটিমিডিয়াভিত্তিক এই সকল সুবিধা ও হাতে-কলমে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা যাইতেছে না কম্পিউটারের অভাব বা তাহা নষ্ট হইবার কারণে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬০ শতাংশের অধিক বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ল্যাব নাই। যেইখানে ইহা নাই, সেইখানে পর্যায়ক্রমে হইলেও ল্যাব প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকিলে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাপ্রসারের মূল লক্ষ্য অর্জন হইবে সুদূর পরাহত। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৯৮১টি। তন্মধ্যে ১০ হাজার ৯৯৩টিতে কম্পিউটার বিষয়ে কোনো শিক্ষক নাই। সেই হিসাবে এ দুই স্তরের প্রায় ৩২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেই নাই তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ের পাঠদানের কোনো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক। ফলে কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান কিংবা গণিতের শিক্ষক দ্বারা কোনোমতে জোড়াতালি দিয়া চলিতেছে এই বিষয়টির পাঠদান। তদুপরি ল্যাবে দেওয়া কম্পিউটারগুলির ভার্শন বেশ পুরাতন। করোনা মহামারির কারণে স্কুল ও কলেজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ল্যাপটপগুলি চার্জ দেওয়া হয় নাই। ইহাতে অধিকাংশ ল্যাপটপের ব্যাটারি নষ্ট হইয়া গিয়াছে। ইহা মেরামতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গাফিলতিও লক্ষণীয়।

এই ক্ষেত্রে আমরা মনে করি, সরকারিভাবে মেরামতের জন্য কোনো নির্দেশনা বা অনুদানের অপেক্ষা করিয়া বসিয়া থাকাটা যুক্তিসংগত নহে। শিক্ষার্থীরা যে ল্যাব ফি দেয়, তাহা দ্বারাই উহা মেরামত করা যাইতে পারে। তবে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল ল্যাবে ব্যবহূত কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক সামগ্রী মেরামতের জন্য প্রত্যেক জেলায় খুলিতে পারেন সার্ভিস সেন্টার। ইহাতে বেকার সমস্যা যেমন লাঘব হইবে, তেমনি নষ্ট কম্পিউটার-ল্যাপটপ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি লইয়া রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলিতে শিক্ষকদের দৌড়াদৌড়ি করিতে হইবে না।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন