বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

দেখিতে হইবে নিজেকে বিবেকের দর্পণে

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:৩০

যুগের সহিত তাল মিলাইয়া বাংলাদেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তিসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতির যে উন্নয়ন ঘটিয়াছে এবং ঘটিতেছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। একটি দেশে যেই সমস্ত উন্নয়নপ্রকল্প গৃহীত হইয়া থাকে, তাহা কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য নহে, বরং দেশের সর্বস্তরের সাধারণ জনগণের কল্যাণার্থে বাস্তবায়ন করা হয়। জনসাধারণের জন্য যাহা কিছু তৈরি করা হয়, তাহা সবই রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এই রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুফল যেমন জনগণ ভোগ করে, তেমনই ইহা ব্যবহার করিবার সময় যেন ইহার ক্ষতিসাধন না হয়, তাহা দেখিবার দায়িত্বও জনগণের উপর বর্তায়। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, একশ্রেণির মানুষ আপনার স্বার্থে এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করিয়া সম্পদ বিনষ্ট তো করিতেছেই, তাহার সঙ্গে অন্যদেরকেও সেই সম্পদের সুফল হইতে বঞ্চিত করিতেছে। এমনকি তাহাদের এই অপকর্ম অন্যদের জন্য নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করিতেছে মারাত্মকভাবে, যাহা মোটেও কাম্য হইতে পারে না।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের কুমিল্লা অংশে কয়েকটি স্টেশন এলাকায় যাত্রীবাহী ট্রেনের নাট-বল্টুসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চুরি করিয়া লইয়া যাইতেছে একটি চক্র। ইহার কারণে রাত্রে ট্রেন চলাচলে ঝুঁকি বাড়িতেছে। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনায় বহু যাত্রীর মৃত্যু ঘটিতে পারে বলিয়া আশঙ্কা করিতেছেন রেল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। শুধু ইহাই নহে, লাকসাম-আখাউড়া ডাবল রেললাইন প্রকল্পে পাঁচটি স্টেশনের ৬৭টি পয়েন্ট মেশিনের মধ্যে ২৫টির মোটর চুরি হইয়া গিয়াছে। এই মেশিনগুলি রেললাইনে সিগন্যাল-পদ্ধতি আধুনিকায়নের জন্য স্থাপন করা হইয়াছিল। মোটর ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ভুল সিগন্যাল প্রদান অসম্ভব। যাহার কারণে যে কোনো সময় দুইটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটিতে পারে। যেই চক্র এই সকল যন্ত্রাংশ চুরি করিতেছে, তাহারা শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট করিতেছে না, একই সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের জীবন লইয়া ছিনিমিনি খেলিতেছে।

হাতের পাঁচটি আঙুল যেমন সমান হয় না, তেমনি সমাজের সকল মানুষের চিন্তাভাবনা, নীতি-নৈতিকতাও একরকম হয় না। বিশ্বের প্রতিটি দেশে, প্রতিটি সমাজে নীতিজ্ঞানবর্জিত অসাধু ব্যক্তির উপস্থিতি অতীতে ছিল, বর্তমানে রহিয়াছে এবং ভবিষ্যতেও থাকিবে। কিন্তু তাহাদের বিবেকবোধ কতটা লোপ পাইলে, নৈতিক অবক্ষয় কতটা মারাত্মক রূপ ধারণ করিলে তাহারা এমন কাজ করিতে পারে, তাহা সহজেই অনুমেয়। চৌর্যবৃত্তি যখন বহুসংখ্যক মানুষের জীবন নাশের কারণ হইয়া দাঁড়ায়, তখন তাহাকে নেহাতই চুরি বলিয়া গণ্য করা যায় না। মানুষের জীবন লইয়া এইভাবে ছেলেখেলা করা অগ্রহণযোগ্য ও অপ্রত্যাশিত। কেননা অনেক সময় ইহার কারণে সৃষ্ট রেল-দুর্ঘটনায় শত শত মানুষ হতাহত হইতে দেখা যায়। যাহাদের এই সকল মূল্যবান সরকারি সম্পদ দেখভাল করিবার কথা, এই ক্ষেত্রে তাহাদের দায়িত্বহীনতা অমার্জনীয়।

বিবেক বলিয়াও তো কথা রহিয়াছে। রেলওয়ে সেক্টরে এই সকল চুরি ও অপকর্ম যাহারা করে, তাহাদের মধ্যে বিবেকের দংশন বলিয়া কিছু আছে বলিয়া মনে হয় না। শুধু রেলওয়ের ক্ষেত্রে নহে, সরকারি অন্যান্য সম্পদ সংরক্ষণেও আমাদের নাগরিক অসচেতনতা রহিয়াছে। ‘সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল‘-এর মতো প্রবাদবাক্য যেই সমাজে বিরাজমান, সেই সমাজে এমন অপকর্ম রোধ করাটাও কঠিন। আমাদের মধ্যে বিচার ও বিবেচনাবোধ জাগ্রত না হইলে দেশ শাসন করা যে কাহারও পক্ষে যে কঠিন, তাহা বলাই বাহুল্য। ক্ষুদ্র কিংবা বৃহত্—যে কোনো অন্যায়-অপকর্মে অগ্রসর হইবার পূর্বে নিজেকে দেখিতে হইবে বিবেকের দর্পণে। কারণ বিবেক হইল মানুষের আত্মার ধ্বনি, যাহা সর্বদা তাহাকে ভালোমন্দ এবং উচিত-অনুচিত সম্পর্কে সতর্ক করিতে থাকে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন