অভিযোগ ও নালিশ

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৩, ০৫:৩০

অভিধানে নালিশ শব্দটির মানে হচ্ছে—অভিযোগ, আবেদন, প্রতিকার-প্রার্থনা, ফরিয়াদ। নালিশ কমবেশি সবাই করে। তবে শিশুরা একটু বেশি করে। শিশুরা নালিশ কেন করে? সে এক জটিল ধাঁধা। মহামহিম সুকুমার রায়ের ‘ভালো ছেলের নালিশ’ নামক ছড়ায় আমরা পড়েছি :

মাগো!/ প্রসন্নটা দুষ্টু এমন! খাচ্ছিল সে পরোটা/ গুড় মাখিয়ে আরাম ক’রে বসে—/ আমায় দেখে একটা দিল, নয়কো তাও বড়টা,/ দুইখানা সেই আপনি খেল ক’ষে!/ তাইতে  কান ধরে তার একটুখানি পেঁচিয়ে/ কিল মেরেছি ‘হ্যাংলা ছেলে’ বলে—/ অম্নি কিনা মিথ্যা করে ষাঁড়ের মত চেঁচিয়ে/ গেল সে তার মায়ের কাছে চলে!/

মাগো!/ এম্নিধারা শয়তানি তার, খেলতে গেলাম দুপুরে,/ বল্ল, ‘এখন খেলতে আমার মানা’—/ ঘণ্টাখানেক পরেই দেখি দিব্যি ছাতের ওপরে/ ওড়াচ্ছে তার সবুজ ঘুড়ি খানা।/ তাইতে আমি দৌড়ে গিয়ে ঢিল মেরে আর খুঁচিয়ে/ ঘুড়ির পেটে দিলাম করে ফুটো—/ আবার দেখ বুক ফুলিয়ে সটান মাথা উঁচিয়ে/ আনছে কিনে নতুন ঘুড়ি দুটো!

শিশুদের মতো বড়রাও অবশ্য নালিশ করে। এতে কাজের কাজ কতটুকু হয়, আল্লাহ মালুম, তবু করে। যেমন করছে আমাদের দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। এই দলটি গত প্রায় দেড় যুগ ধরে ‘নালিশ’ পার্টিতে পরিণত হয়েছে। এ দলের নেতা নত্রীদের কেবলই অভিযোগ আর নালিশ। তারা বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের কখনো ঘরোয়া সমাবেশ ডেকে কখনো তাদের কার্যালয় বা বাসগৃহে গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়ে যাচ্ছেন। শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও তারা এই কাজটি অত্যন্ত সততার সঙ্গে করে যাচ্ছেন। কিন্তু এই নালিশের খুব একটা সুফল মিলছে না। বিদেশি কূটনীতিকরা বিএনপির প্রতি সমাবেদনা জানাচ্ছেন। কখনো কখনো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব বিরোধ মিটিয়ে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছেন। এর বেশি তারাই-বা কী করতে পারে?

অবশ্য নালিশ করাটা কেবল বিএনপির স্বভাব নয়, মানুষমাত্রই কমবেশি অভিযোগ বা নালিশ করে থাকে। এই সংসারে আমাদের মনের মতো করে সবকিছু ঘটে না। আর তা না ঘটলেই আমরা খেপে যাই। এর-ওর-তার ওপর ঘটনার দায় চাপাই। কাউকে না কাউকে অভিযুক্ত করি; তার বিরুদ্ধে নালিশ জানাই। প্রতিবাদ করি। এটা আমাদের বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা নালিশ নেই—এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।

নালিশ করার অভ্যাসটা আমরা ছোটবেলা থেকেই আয়ত্ত করি। যদিও সেসব নালিশের বড় বেশি প্রতিকার পাওয়া যায়নি। ছোটবেলায় আমরা ‘নালিশ করে বালিশ পাওয়া’ ধরনের একটি কথা প্রায়ই শুনতাম। কেউ হয়তো কারো নামে অভিভাবক বা শিক্ষকের কাছে কোনো অভিযোগ করেছে, কিন্তু তিনি ব্যাপারটি তেমন গুরুত্ব দেননি। তখন অভিযোগকারীকে ‘নালিশ’ করে করে ‘কয়টা বালিশ পেয়েছে’ জানতে চেয়ে খ্যাপানো হতো। ছোটবেলার নালিশের ধরনই অবশ্য আলাদা—ও আমাকে ভেঙিয়েছে, আমাকে খেলায় নেয়নি, আমাকে বকেছে ধরনের নালিশই অহরহ শোনা যেত। এসব নালিশের আর কি প্রতিকার হয়!

সব নালিশের প্রতিকার কখনোই হয় না। কিন্তু তবু নালিশের মতো জিনিস নেই। ইংরেজিতে কথাই আছে, যে চাকাটা সবচাইতে বেশি কিচকিচ আওয়াজ করে, সেই চাকাই সবচাইতে বেশি তেল বা গ্রিজ পায়।

এই নালিশ বা অভিযোগ সম্পর্কে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। তার দুই-একটা উল্লেখ করা যাক—গল্পটা নিউ ইয়র্কের এক ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের। এই দোকানের ম্যানেজারের কাছে গিয়ে এক খদ্দের কী একটা বিষয় নিয়ে অভিযোগ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে ম্যানেজার ভদ্রলোক রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে এক কর্মচারীকে ডেকে পাঠালেন এবং সেই কর্মচারীকেই দায়ী করলেন। বললেন, ‘তোমার কাজে অবহেলার জন্যই এ রকম হয়েছে। এজন্য তোমাকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। এরকম অভিযোগ আসা দোকানের জন্য কত বড় অসম্মানের, তা তুমি জানো?’

কর্মচারীটি অভিযোগ শুনে আমতা আমতা করতে লাগল; কিন্তু ম্যানেজার তাকে মোটেও ক্ষমা করলেন না, তাকে একেবারে চরম দণ্ড অর্থাত্ বরখাস্তের ঘোষণা দিলেন। লঘু পাপে এত গুরুদণ্ড দেওয়া হবে, তা অভিযোগকারী ভদ্রলোক কল্পনা করতে পারেননি। তিনি অনুতপ্ত হলেন এবং এবারের মতো কর্মচারীটিকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য ম্যানেজারকে অনুরোধ করলেন। কিন্তু ম্যানেজারের মন কিছুতেই নরম হলো না। সে তার সিদ্ধান্তে অটুট রইলেন। এর কয়েক মাস পর সেই খদ্দের আবার সেই দোকানে গেছেন। কেনাকাটা করে ম্যানেজারের ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি সেই পরিচিত দৃশ্যটি দেখতে পান। সেই যে কর্মচারীটিকে তার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ছাঁটাই করা হয়েছিল, সেই কর্মচারীটি আগের মতোই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে অছে। ঘরে সেই কর্মচারীর পাশে অন্য এক ব্যক্তি, সে-ই বোধহয় কোনো অভিযোগ করেছে। দেখা গেল, এবারও ম্যানেজার কর্মচারীটিকে কর্তব্যে অবহেলার জন্য বরখাস্ত করছেন! ব্যাপারটা মুহূর্তের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেল। এই কর্মচারীটির চাকরিই হলো বরখাস্ত হওয়া। যখনই কোনো অভিযোগ আসুক, সঙ্গে সঙ্গে তাকে ডেকে এনে খদ্দেরের সামনে বরখাস্ত করা হয়। এতে গ্রাহকের দৃষ্টিতে দোকানটির মর্যাদা বৃদ্ধি হয়।

অভিযোগ বিষয়ে এবার একটি ভিন্ন গল্প। এক বাড়িতে একটা পার্টি ছিল। রাত ১২টা বেজে গেছে, কিন্তু কয়েক জন অভ্যাগতের ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা নিশ্চিন্তে বসে হাসি-ঠাট্টা, পান-গান চালিয়ে যাচ্ছে। অস্থির হয়ে গৃহকর্তা মত্ত অভ্যাগতদের অগোচরে চুপিসারে পাশের বাড়িতে গিয়ে বললেন—ভাই, মিনিট পাঁচেক পরে এসে আমার বাড়িতে কড়া নেড়ে বলুন, এত রাতে হই-হল্লায় খুব ডিস্টার্ব হচ্ছে।

প্রতিবেশী বললেন, আমি আপনার কাছে এ রকম অভিযোগ করতে যাব কেন? আমার তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। ভদ্রলোক বললেন আপনার হচ্ছে না ঠিক; কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি ভাই, আমার ভীষণ অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু আমি তা ওদের বলতে পারছি না। আপনি রাগারাগি করলে ওরা বুঝতে পারবে আমোদের ষোলআনা পূর্ণ হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে কেটে পড়বে।

বাস্তবে অবশ্য সবকিছু এমন ভালোয় ভালোয় হয় না। অভিযোগ করলেই বরং অনেক ক্ষেত্রে বিপদ বাড়ে। চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষই কোনো অভিযোগ উত্থাপন করার সাহস পায় না। অভিযোগ করলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হতে হয়। তাছাড়া যার কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়, সেই পুলিশও অভিযুক্ত সন্ত্রাসীর চাইতে নিরীহ অভিযোগকারীকে হয়রানি করে বেশি। ফলে আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই কিল খেয়ে কিল হজম করার বিদ্যায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। তবে কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা এত কিছুর পরও অভিযোগ আর নালিশ নিয়ে মাথা ঘামায় এবং মাথা ঘামিয়ে আনন্দও পায়।

আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ লক্ষ করা রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে। সাধারণ মানুষ তো আছেই, সরকারি দলের প্রতি বিরোধী দলের এবং বিরোধী দলের বিরুদ্ধে সরকারি দলের অভিযোগও নিয়ত শোনা যায়। এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযোগ-নালিশ চালিয়েই যাচ্ছে। জামায়াত-বিএনপিসহ তাদের মিত্ররা সন্ত্রাস-নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে—এমন অভিযোগ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। পক্ষান্তরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি দলের ক্যাডারদের দিয়ে ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের খুন এবং গুম করছে—এমন অভিযোগ বিরোধী দল বিএনপির। এই পালটাপালটি অভিযোগের কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আসল সত্য হারিয়ে যাচ্ছে। তার পরও অভিযোগ এবং নালিশ চলছেই।

দেখা যাচ্ছে, আমরা নালিশ বা অভিযোগ করছি ঠিকই, কিন্তু যথাযথ স্থানে নয়। সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা ভোটারদের কাছে করতে হবে। ভোটাররাই সরকার পরিবর্তনের মালিক। কিন্তু ভোট বর্জন করে বিদেশিদের কাছে সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ করলে তাতে সুফল মিলবে কী?

সরকারকে বাগে রাখতে হলে সবার আগে দরকার জনসম্পৃক্ততা, জনকল্যাণে কর্মসূচি গ্রহণ, নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থা প্রমাণ করা। এর আগে বিএনপি নেতৃত্ব জোর গলায় বলতেন, বিদেশে আমাদের আমাদের কোনো প্রভু নেই, বন্ধু আছে। কিন্তু ক্রমাগত সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে নালিশ ও অভিযোগ উত্থাপনের বহর দেখে মনে হচ্ছে, বিদেশিদের বিএনপি এখন আর শুধু ‘বন্ধু’ মনে করছে না, ‘আরো কিছু’ মনে করছে!  তবে অভিযোগ করে কোনো লাভ হয় না, নালিশ জানিয়েও কোনো ‘বালিশ’ মেলে না জেনেও যারা নালিশ এবং অভিযোগ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে যাচ্ছেন, তাদের ধৈর্য ও সাহসের প্রশংসা করতেই হয়!

লেখক: রম্যরচয়িতা

ইত্তেফাক/এমএএম