একটি দেশের জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে বেশ কয়েকটি শক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টা কাজ করে, যা সমৃদ্ধ একটি দেশের কাঠামো তৈরি করে দেয়। স্বাধীন গণমাধ্যম এই শক্তিগুলোর অন্যতম। এজন্যই স্বাধীন গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গণমাধ্যম ব্যাবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নেও প্রভূত অবদান রাখে। এ দৃষ্টিতে উন্নয়ন ও গণমাধ্যম একে অপরের পরিপূরক—একটি অন্যটি ছাড়া ভারসাম্যহীন। নোবেল বিজয়ী বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন গবেষণাও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এজন্যই বলেছেন, ‘যে দেশে সংবাদপত্র স্বাধীন, সে দেশে দুর্ভিক্ষ হয় না।’ এ উদ্ধৃতির তাত্পর্য হলো, একটি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম ও অত্যাবশ্যকীয়। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ হাতে পেয়েছে সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, অনলাইন গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এসব আধুনিক গণমাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্রের নানাবিধ তথ্য-উপাত্তের বিষয়ে জানার সুযোগ পায় এবং দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হয়ে অধিকার ও দায়দায়িত্বের বিষয়ে অংশীদার হয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকাকে অস্বীকার করে কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব নয়, বরং গণমাধ্যমের সহায়তাই কেবল সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নকে টেকসইভাবে ত্বরান্বিত করতে পারে। এক্ষেত্রে তথ্য ও জ্ঞান শক্তিশালী হাতিয়ার, যা মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে জনগণের সমর্থনে কথা বলিয়ে তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে এবং সরকারি কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির ক্ষেত্রে প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের এই যুগে গণামাধ্যম ও সাংবাদিকতায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বের নানা প্রান্তের সাংবাদিকদের মধ্যে যোগাযোগ এখন অনেক সহজ। পূর্ব ইউরোপে ও সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোতে স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থসাহায্য হয়েছে। ঐ সময় থেকে বিশেষজ্ঞরা বলতে শুরু করলেন, উন্নয়নের জন্য যেমন কৃষি ও শিল্প খাতে উন্নয়ন দরকার, তেমনি স্বাধীন গণমাধ্যমও দরকার। এটা সফল উন্নয়নের একটি তত্ত্ব। বৈজ্ঞানিক গবেষণার এটা প্রমাণিত যে, স্বাধীন গণমাধ্যমের সঙ্গে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত শিক্ষা ও সামাজিক সেবা, দুর্নীতি ও সংঘবদ্ধ অপরাধ হ্রাসের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জনগণের প্রকৃত উন্নয়ন চাইলে গণমাধ্যমেও মেধা ও অর্থের বিনিয়োগ করতে হবে, যেমনটা অন্যসব ক্ষেত্রে করা হয়। মোটাদাগে সাংবাদিকতা হলো জবাবদিহি ও ক্ষমতার প্রহরী (ওয়াচডগ ইন পাওয়ার)। গবেষণা-দক্ষতার পদ্ধতিগত ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজে আসলেই কী হচ্ছে, তা জানা সম্ভব। সব সুস্থ সমাজে ওয়াচডগ সাংবাদিকতা-স্বাধীন ও প্রগতিশীল গণমাধ্যম আবশ্যক। কীভাবে টাকা খরচ হচ্ছে, কীভাবে ক্ষমতার ব্যবহার হচ্ছে, রাজনৈতিক পদ্ধতি কতখানি কার্যকর হচ্ছে কিংবা নীতিকার্যক্রম কতটা কাজ করছে—সে সম্পর্কে ক্ষমতাসীনদের কঠিন প্রশ্ন করা কেবল স্বাধীন গণমাধ্যমের পক্ষেই সম্ভব। কারণ, গণমাধ্যমে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ দিন শেষে জনগণ ও নীতিনির্ধারকদের মেলবন্ধন।
উন্নয়নশীল বিশ্বে পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা অনেক নাজুক, সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর হাত অনেক লম্বা, অনেকেই মনে করেন তারা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন-হয়রানি তো আছেই। সেখানে বিজ্ঞাপনের বাজার অনুন্নত আর বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করা সম্ভব। অর্থনৈতিক সংকট তো আছেই, আছে সম্পদের অভাব, উন্নত প্রশিক্ষণের অভাব। আমাদের দেশে এখনো সাড়ে চার কোটির ওপর লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। দরিদ্র লোকের বঞ্চনা অনেক বেশি, কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ কম। গণমাধ্যমই এখানে দুপক্ষের বার্তাবাহক। কারণ, উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম শর্ত হচ্ছে, জ্ঞান সম্প্রসারণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ। অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হলে আমাদের আগে তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং এর গুণমান নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, যাদের তথ্যভান্ডার যত সমৃদ্ধ, তাদের ক্ষমতায়ন শক্তি তত বেশি।
গণমাধ্যম মানুষের মনোজগত্ নিয়ন্ত্রণ করে। এ প্রেক্ষাপটে মিডিয়া অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ফলাফল বদলে দিতে পারে। যেমন বিগত শতকের ষাটের দশক থেকে স্বাধীনতার উষালগ্ন পর্যন্ত জাতীয় জাগরণে জনগণের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল তখনকার গণমাধ্যম। জনগণ ও গণমাধ্যমের এমন অবিভাজ্য ঘনিষ্ঠতা বাঙালির ইতিহাসে আর কখনো দেখা যায়নি। তখন নেতৃস্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর মালিকানা ছিল সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের হাতে। স্বাধীনতাযুদ্ধেও বিশেষত বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে গণমাধ্যম অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। স্বাধীনতার পর কয়েক বছর বাংলাদেশের গণমাধ্যম বিকশিত হতে শুরু করলেও তা বাধাগ্রস্ত হয়। তবে ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কার্যক্রমে গণমাধ্যমের জোরালো ভূমিকা ছিল। এরপর অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও ব্যক্তিখাতের প্রসারের পাশাপাশি গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রসার শুরু হয়েছিল।
বিগত দশকে বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও এফএম রেডিওর সূচনার মাধ্যমে গণমাধ্যমে ল্যান্ডস্কেপেও ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে যাদের সংবাদপত্র বা স্যাটেলাইট টেলিভিশনের সুবিধা নেই, তারা এখন এফএম রেডিওর মাধ্যমে তাত্ক্ষণিক সংবাদ জানতে পারছেন। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি ও এর ভয়ানক প্রভাব সম্পর্কে জানতে প্রিন্ট মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ফলে সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষত ইউনিসেফ, ডব্লিওএইচও ও বিশ্বব্যাংক এগিয়ে এসেছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার এটাকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছিল সংবাদপত্রের প্রচার-প্রচারণায় বাধ্য হয়ে। অবৈধ স্থাপনা ও নদী দখলের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হচ্ছে। পরিবেশ ও নদী রক্ষার আন্দোলনেও গণমাধ্যম জোরালো ভূমিকা রাখছে। আজকে বুড়িগঙ্গাসহ অন্য নদনদী বা যে কোনো অঞ্চলের পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন হোক অন্য কিছু, মিডিয়া যদি কার্যকর ভূমিকা পালন না করে—তাহলে সরকারের কোনো উদ্যোগই ফলপ্রসূ হবে না, জনসচেতনতা বাড়বে না। অনুরূপভাবে আমরা দেখি, অ্যাসিড সন্ত্রাস, গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহ ও ফতোয়া জারির বিরুদ্ধে মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক জনসমর্থন ও জনসচেনতা বেড়েছে। ফলে অ্যাসিড সন্ত্রাস এখন অনেকাংশে কমেছে।
তবে বিপরীতভাবে এটাও সত্য, আমাদের দেশের নেতিবাচক বিষয়টি বেশি প্রকাশ হয়, যেমন বিশ্বের ৩০টি দূষিত শহরের মধ্যে আমাদের প্রতিবেশী ভারতেই ২২টি। আবার আমেরিকাতে প্রতি দেড় মাসে একটি স্কুলে সন্ত্রাসী হামলা হয়। অথচ আমাদের গণমাধ্যমে এসব ঘটনা অনেক সময় ঢালাওভাবে ফুটে ওঠে। এতে করে, কিছু বিষয় স্বাভাবিক হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। বরং এসব বিষয়ে গভীর ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আর্থসামাজিক উন্নয়নে আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে। কাজেই গণমাধ্যমকে এরকম অনেক বিষয়ে আরো যত্নশীল হতে হবে।
পরিশেষে বলব, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সব অন্ধকার দূর হোক, গণমাধ্যমকে জনগণের ভাগ্য উন্নয়নের পথে বন্ধু হিসেবে মনে করে কাজ করার স্বাধীনতা দেওয়া হোক, গণমাধ্যমকে সুন্দর ও শোভন সমাজে উত্তরণের হাতিয়ার করা হোক। বিনিময়ে গণমাধ্যম রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালনে সহযোগী ভূমিকা পালন করে দেশের প্রকৃত উন্নয়নে জনসচেতনতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে ত্বরান্বিত করবে—এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি
