শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধ নহে, কেন?

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৩, ০৪:৩০

মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধকে গণ্য করা হয় কালো অধ্যায় হিসাবে। যুদ্ধের প্রকৃতিই এমন, একবার শুরু হইলে তাহা আর বন্ধ হইতে চাহে না। সহনশীলতা বলিয়া যে একটি শব্দ রহিয়াছে, তাহা যেন ভুলিয়াই যায় পক্ষগুলি। চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে গত ৭ অক্টোবর যখন ইসরাইল-হামাস সংঘাতের খবর শোনা গেল, তখনই পরিষ্কার হইয়া যায়, রণাঙ্গনের আগুনে ভস্মীভূত হইতে হইবে ফিলিস্তিনের গাজাকে। এই যুদ্ধ এখন পর্যন্ত উভয় পক্ষের প্রায় ২০ হাজার মানুষের প্রাণ কাড়িয়াছে। উভয় পক্ষের অনমনীয় আচরণ দেখিয়া মনে হইতেছিল, এই সংঘাতও ইউক্রেন যুদ্ধের পথ ধরিতে চলিয়াছে। তবে সুসংবাদ হইল, যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হইয়াছে উভয় পক্ষ। কাতার, যুক্তরাষ্ট্রও মিশরের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে রাজি হইয়াছে ইসরাইল ও হামাস। গাজা তথা ফিলিস্তিনের ভাগ্যই এমন যে, এইখানে বিপদ কখনোই একা আসে না—সঙ্গে করিয়া লইয়া আসে নূতন নূতন দুঃসংবাদ। এই কথা বলার কারণ, যুদ্ধ বন্ধ হইবার চুক্তি হইয়াছে বটে, কিন্তু তাহা মাত্র চার দিনের জন্য!

সাম্প্রতিক বত্সরগুলির সংঘাত-হানাহানি যেন লিওন ত্রোিস্কর ভবিষ্যদ্বাণীকেই বারবার স্মরণ করাইয়া দেয়—‘আপনি যুদ্ধের প্রতি আগ্রহী না হইতে পারেন, কিন্তু যুদ্ধ আপনার প্রতি আগ্রহী।’ বর্তমান বিশ্বে ইহাই কি যুদ্ধের বাস্তবচিত্র নহে? যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার অবস্থা মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই কী মারাত্মক পর্যায়ে গিয়া দাঁড়াইয়াছে! গাজা হইয়া উঠিয়াছে ‘শিশুদের কবরস্থান’। হাসপাতালগুলির অবস্থাই-বা কী? ‘যুদ্ধকালীন একটি হাসপাতালের চিত্র মানুষকে দেখায়, যুদ্ধ আসলে কী’—এরিখ মারিয়া রিমার্কের এই কথা যেন বাস্তব হইয়া উঠিয়াছে। মর্মে উপলব্ধি হইতেছে ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসের কথাও—‘শান্তির সময় পুত্র পিতাকে সমাধিস্থ করে, কিন্তু যুদ্ধের সময় পিতা পুত্রকে।’ গণমাধ্যমের খবরে আমরা দেখিয়াছি, গাজার পিতামাতারা সন্তানের হাতে-পায়ে তাহাদের নাম লিখিয়া রাখিতেছিলেন, যাহাতে খারাপ কিছু ঘটিলে ঐ নাম দেখিয়া তাহাদের শনাক্ত করা যায়। কী মর্মান্তিক দৃশ্য! এই সকল বিষয় ছুঁইয়া গিয়াছে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকেও। এক লেখায় তিনি বলিয়াছেন, ‘অনেকের ন্যায় হূদয় ভাঙিয়া যাইতেছে আমারও।’

প্রশ্ন হইল, চার দিনের জন্য যুদ্ধবিরতির পর কী ঘটিবে? অতি স্বল্প সময়ের এই যুদ্ধবিরতি কি গাজাবাসীর মন থেকে ভয়, আতঙ্ক, উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা দূর করিতে পারিবে? অবশ্যই নয়। কারণ, ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট ইতিমধ্যেই হুংকার দিয়াছেন, ‘যুদ্ধবিরতি শেষে আবারও হামলা চালানো হইবে গাজায়’। ইসরাইলি সেনাদের উদ্দেশে তিনি বলিয়াছেন, ‘বিরতির সময় সংঘটিত হইয়া যুদ্ধ চালাইয়া যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি লইতে হইবে।’ গ্যালান্ট হুঁশিয়ারি করিয়াছেন, ‘এই সংঘাত চলিতে পারে আরো অন্তত দুই মাস।’ যুদ্ধ-কবলিত যে কোনো জাতির জন্যই এই এমন সংবাদ ঘাড়ের ওপর যমদূতের নিঃশ্বাসের ন্যায়।

গাজার যুদ্ধ আরো চলিবে—ইহাই কী বাক্যের শেষ অংশ তথা চূড়ান্ত কথা? রক্তের এই হলিখেলা বন্ধে আর কোনো রাস্তা কি খোলা নাই? ‘আমরা জানি কীভাবে যুদ্ধ জয় করিতে হয়; তাই এখন আমাদের জানিতে হইবে কীভাবে শান্তি জয় করিতে হয়’—বিশ্বনেতৃত্ব কি সত্যিই ভুলিয়া গিয়াছে স্টিফেন অ্যামব্রোসের এই কথা? বাস্তবতা হইল, আধুনিক সভ্যতায় বাস করিয়া আমরা যতটা না শান্তির সন্ধান করিয়াছি, তাহার চাইতে অধিক ব্যয় সময় ব্যয় করিয়াছি যুদ্ধের কলাকৌশল রপ্ত করিবার কাজে। তথাকথিত সভ্যতার পতন ঘটিবে এই একটিমাত্র কারণেই। যুদ্ধবাজ শক্তিগুলি উপেক্ষা করিয়া চলিয়াছে মহান দার্শনিক সক্রেটিসের আহ্বান—‘কঠিন যুদ্ধেও সবার প্রতি দয়ালু হও।’ আলবার্ট আইনস্টাইন বলিয়াছেন, ‘জোর করিয়া শান্তি রক্ষা করা যায় না, তাহার জন্য লাগে সমঝোতা এবং একতা।’ সুতরাং বিশ্বনেতৃবৃন্দকে জুতসই এবং চূড়ান্ত সমঝোতার রাস্তা ধরিয়া আগাইতে হইবে। স্বল্পমেয়াদি এই যুদ্ধবিরতির সুযোগের সদ্ব্যবহার করিয়াই চিরদিনের জন্য সংঘাত বন্ধের পথের সন্ধান করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন