বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

মানুষের বিশ্বাস এক জটিল সমীকরণ

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:৩০

বিশ্বাস ও আস্থা—ছোট্ট এই দুইটি শব্দের গুরুভার আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বিপুল ও বিশাল। বিশ্বাসের ব্যাপারে জন মিল্টন যেমন বলিয়াছেন, বিশ্বাস জীবনকে গতিময় করিয়া তোলে আর অবিশ্বাস করিয়া তোলে দুর্বিষহ। প্রকৃত অর্থে ‘বিশ্বাস’ করিতে পারি বলিয়াই আমরা এক পায়ের উপর ভরসা করিয়া অন্য পা সামনের দিকে বাড়াইয়া দিতে পারি; কিন্তু আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক জীবন হইতে যদি বিশ্বাসের আয়নায় চিড় ধরিয়া যায়, তাহা হইলে সেইখানে ডাবল প্রতিবিম্ব তৈরি হয়। আসলে বিশ্বাস করা সহজ; কিন্তু কাহাকে বিশ্বাস করা যায়, তাহা বুঝা কঠিন। আর বিশ্বাসে যদি কেহ অমর্যাদা করে, তাহা হইলে তিনি হইয়া পড়েন মোচড়ানো সাদা মসৃণ কাগজ—যাহাকে কোনোভাবেই আর সোজা সুন্দর রূপে ফিরাইয়া আনা সম্ভব হয় না। আব্রাহাম লিঙ্কন যেমন বলিয়াছেন, যে কাউকে বিশ্বাস করা বিপজ্জনক; কিন্তু সকলকে ‘অবিশ্বাস’ করা আরো অধিক বিপজ্জনক। আমরা কি সেই ‘অবিশ্বাস্য’ বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে প্রবেশ করিতে যাইতেছি?

এই বিশ্বাস প্রসঙ্গে অনেকে বলেন, বিশ্বাস এত কঠিন জিনিস যে, একজন মানুষ কখনো-সখনো নিজেকেও নিজে বিশ্বাস করিতে পারে না। জিহ্বার নাকি দাঁতের উপর সকল সময় বিশ্বাস রাখিতে নাই। হঠাত্ কখনো জিভের উপর কামড় বসাইয়া দেয় দন্ত। সাপুড়িয়া মনে করেন সাপকে তিনি পোষ মানাইয়াছেন; কিন্তু সাপ কি সাপুড়িয়াকে সুযোগ পাইলে কামড় দিতে কুণ্ঠিত হয়? সুতরাং বিশ্বাস বড়ই জটিল জিনিস। আবার বিশ্বাস না করিয়াও আমরা এক পা চলিতে পারিব না। আর এই ক্ষেত্রে প্রয়োজন নিজেকে বুঝিয়া লওয়া। চারপাশ বুঝিয়া লওয়া। সজাগ রাখা নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রীয়কে, পরিস্থিতিকে সন্ধিবিচ্ছেদ করা। বুঝিয়া দেখা—যাহা হইতেছে, কেন হইতেছে? কার্যকারণ ছাড়া কিছুই হয় না। সাপকে রজ্জু মনে করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি রজ্জুকে সাপ ভাবিয়া ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও ক্ষতিকর।

ইহা সহজ কথা। আবার ইহাই অতি কঠিন কথা। সেই জন্যই কোনো কাজ করিবার পূর্বে গভীরভাবে ভাবিতে হইবে; কিন্তু সকলের কি ভাবিবার ক্ষমতা থাকে? থাকে না। আসলে অধিকাংশ মানুষই অধিক ‘চিন্তা’ করিবার ধীশক্তি রাখেন না। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করিবার যোগ্যতা রহিয়াছে খুব কম মানুষের। এই জন্যই দার্শনিক ভলতেয়ার বলিয়াছেন, ‘একজন মানুষকে উত্তরের চাইতে তাহার প্রশ্ন দ্বারা বিচার করো।’ কারণ প্রশ্ন করিতে হইলে চিন্তাভাবনা করিতে হয়। চিন্তাভাবনা করা তো এত সহজ নহে। সম্ভবত এই সিংহভাগ মানুষের মনের কথা পড়িতে পারিয়াছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর চীনা দার্শনিক লাওিস। তিনি বলিয়াছেন, ‘অত চিন্তাভাবনার কী আছে? চিন্তা বন্ধ করুন, দেখিবেন আপনার সমস্যাগুলিও উধাও হইয়া গিয়াছে।’ কথাটি তিনি ব্যঙ্গার্থে বলিয়াছিলেন। কারণ আমরা ‘চিন্তা’ করিতে পারি বলিয়াই আমাদের অস্তিত্ব আছে। সুতরাং, চিন্তা না করিতে পারিলে নিজের অস্তিত্ব লইয়াই টানাটানি পড়িবে। 

তবে অধিকাংশ মানুষই ‘চিন্তাভাবনা’ করিতে ভয় পায়। অসংখ্য মানুষের চেতনার জগত্ অবোধ শিশুদের কাছাকাছি। অবোধ শিশু যেমন জানে না, আগুনের শিখায় হাত দিলে হাত পুড়িবে; সে তো আগুনের উজ্জ্বল জ্যোতি দেখিয়া তাহা ধরিতে ব্যাকুল হইবেই। হাত না পোড়া পর্যন্ত শিশুকে কিছুতেই সেই আগুনের আকর্ষণ হইতে রোখা যাইবে না। আবার কেহ কেহ আছেন যাহারা অভ্যাসদোষে আক্রান্ত। সেই যে প্রবাদে বলা হইয়াছে, ‘অভ্যাস দোষ না ছাড়ে চোরে,/ শূন্য ভিটায় মাটি খোঁড়ে।’ সুতরাং নিজেকে চিনিতে হইবে। বুঝিতে হইবে নিজের ওজন। আত্মবিশ্লেষণ করিয়া দূর করিতে হইবে অভ্যাসদোষ। কাজ করিতে হইবে বুঝিয়া এবং ভাবিয়া। না বুঝিয়া পা ফেলিলে কখনো-না-কখনো পদচ্যুতি ঘটিবেই।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন