রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ঝিমিয়ে পড়া যুদ্ধে ইউক্রেন যেখানে এগিয়ে

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৩, ০৫:৩০

গাজার যুদ্ধের দিকে বিশ্বের মনোযোগ ঘোরার কারণে অনেকে মনে করতে পারেন, ইউক্রেন যুদ্ধ অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে। যারা এরকমটা মনে করছেন, তাদের ভাবনা পুরোপুরি সঠিক নয়। আমরা শুনে আসছি, এই যুদ্ধে ইউক্রেনের জন্য বিশেষ সুবিধাজনক সময় হলো গ্রীষ্মকাল। পালটা আক্রমণের প্রশ্নে এই সময়টা ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে ইউক্রেনের সেনাদের। তবে গ্রীষ্ম মৌসুম কিয়েভকে আশানুরূপ বাড়তি সুবিধা এনে দিয়েছে, এমন কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ নেই। কোনো ধরনের আঞ্চলিক লাভ হয়নি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির। অন্যদিকে, বিশেষ সুবিধায় নেই রাশিয়াও। মস্কোকে আহামরি লাভ এনে দিয়েছে গ্রীষ্মকাল—যেমনটা মনে করা হতো, এমন কথাও শোনা যায়নি।

চলমান ইউক্রেন যুদ্ধে অচলাবস্থা চলছে—এ কথা একেবারে ফেলে দেওয়ার মতোও নয়। তবে বলে রাখা দরকার, সামরিক পরিভাষায়, যুদ্ধে অচলাবস্থা সব সময় নেতিবাচক নয়! এটা মূলত নির্ভর করে যার যার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। এই কথার সপক্ষে যুক্তি কী? ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে, রাশিয়ার গোলাবারুদের মজুত তড়তড় করে নেমে এসেছিল, এই সময়ে যা পূরণ করে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে মস্কো। ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত সরবরাহ গতিশীল করার ফুরসত পেয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ইউক্রেনের বেলায়ও চিত্র একই—যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য এফ-১৬ ফাইটার জেট হাতে পেয়েছে ইউক্রেন। অর্থাত, খালি চোখে মনে হতে পারে যুদ্ধ ঝিমিয়ে পড়েছে, কিন্তু ভেতরে ভেতের থেমে নেই যুদ্ধের মূল কার্যক্রম।

আরকেটা বিষয়ও ঘটেছে এই সময়ের মধ্যে। রাজনৈতিক কিংবা কূটনৈতিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে, উদ্ভূত অচলাবস্থা উভয় পক্ষকে নিজ নিজ মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে পুনঃপুন বসার মহাসুযোগ এনে দিয়েছে। মস্কোর কথাই ধরা যাক। ইসরাইল-হামাস যুদ্ধের প্রভাবকে পুঁজি করে মধ্যপ্রাচ্যে তলে তলে একধরনের জনসংযোগ ঘটিয়েছেন পুতিন।

যুদ্ধে অচলাবস্থা দেখা দিলে রণময়দানের ক্লান্তি আছড়ে পড়ে আরো বেশ কিছু ক্ষেত্রে। ইউক্রেন যুদ্ধে যে ক্লান্তিভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাতে করে আমরা লক্ষ করেছি, ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে এর একধরনের রেশ বয়ে যাচ্ছে। কিয়েভের মিত্র বা অংশীদারেরা একধরনের ক্লান্তি অনুভব করছে।

যাহোক, ইউক্রেন যুদ্ধে অচলাবস্থা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত থাকতে পারে। তবে একটি বিষয়ে কোনো ধরনের দ্বিমত থাকার কথা নয়—যুদ্ধে পানিপথের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন বেশ খানিকটা সুবিধাজনক অবস্থানে এসেছে এই ক্ষেত্রে। বলতে হয়, পানিপথে নাটকীয়ভাবে বিকশিত হয়েছে কিয়েভ—বিশেষত কৃষ্ণসাগরে (ব্ল্যাক সি) আধিপত্যের প্রশ্নে। এবারের শীতে কৃষ্ণসাগর ইউক্রেনকে যথেষ্ট কৌশলগত ও রাজনৈতিক সুবিধা জোগাবে বলেই মনে হচ্ছে।

যুদ্ধের শুরু থেকেই কিয়েভ দাবি করে আসছে, কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার মতোয়েন করা ২৭টি যুদ্ধজাহাজ ও জাহাজকে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করেছে ইউক্রেনের সেনারা। এর মধ্যে রয়েছে ১১ হাজার টনের ক্রুজার মসকভার মতো জলযান। ক্রুজ মিসাইল বহনে সক্ষম রাশিয়ার কিলো শ্রেণির এই সাবমেরিন গুঁড়িয়ে দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়!

কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের সফল আক্রমণের পর সেভাস্তোপলের রাশিয়ান নৌঘাঁটি আর সেভাবে নিরাপদ থাকার কথা নয়, এটাই সত্য কথা। এর কারণ, কৃষ্ণসাগর নৌবহরের বেশির ভাগ অংশকে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের নভোরোসিয়েস্ক বন্দরে স্থানান্তরিত করতে বাধ্য হয়েছে মস্কো। বাকি যে কিলো শ্রেণির সাবমেরিনগুলো এখনো অবস্থান করছে এই অঞ্চলে, সেগুলোও নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এ ধরনের ব্যয়বহুল ও দুষ্প্রাপ্য জাহাজ হারানোর ভার বহনের মতো অবস্থায় নেই ক্রেমলিন।

এই শীতে সম্ভবত আমরা আবারও দেখব, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো ধসিয়ে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাবে মস্কো। গত বছর এটাই লক্ষ করা গেছে বেশি করে। এই কৌশলের অংশ হিসেবে কৃষ্ণসাগর থেকে উেক্ষপণ করা কালিব্র ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষ সুবিধা এনে দিয়েছিল পুতিনকে। তবে এবার সেটা ঘটবে বলে মনে হয় না। কারণ, কৃষ্ণসাগর থেকে অবশিষ্ট শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রগুলোও সরিয়ে নিতে বাধ্য হবে রাশিয়া—যেমনটা বলা হয়েছে আগেই। এর ফলে কৃষ্ণসাগর ঘিরে মস্কোর কৌশলগত সুবিধা যেমন হ্রাস পাবে, তেমনিভাবে কিয়েভের জন্য তা এনে দেবে বাড়তি সুবিধা। এমনকি এর ফলে উভয় পক্ষের বিকল্প কৌশলগত সুবিধার ওপরও প্রভাব পড়বে। অর্থাত্, সহজ হিসাব হলো, কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের সফলতার মুখে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ, শিপইয়ার্ড, কমান্ড সেন্টার ও বিমান প্রতিরক্ষা সাইটগুলো তীব্র অসুবিধার মুখে পড়তে পারে। এমনকি এর স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যেতে পারে কৃষ্ণসাগরের বাইরেও।

কৃষ্ণসাগর নিয়ে এত কথা বলা হচ্ছে কেন? বর্তমান চিত্র হলো, ইউক্রেনের মাটিতে যুদ্ধ কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ার কারণে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি ঘুরপাক খাবে কৃষ্ণসাগরকে কেন্দ্র করে। তাছাড়া রাশিয়া ও ইউক্রেনই শুধু নয়, স্থলযুদ্ধে চলমান একধরনের অচলবস্থার কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে মিত্র দেশগুলোও। এক্ষেত্রে কৃষ্ণসাগরে আধিপত্য ধরে রাখতে পারাটাই হয়ে উঠবে ট্রাম্প কার্ড।

আমরা লক্ষ করেছি, ইউক্রেনের বেশ কিছু অভিযানে—বিশেষ করে ক্রিমিয়া প্রশ্ন—রাশিয়ার দুর্বলতা সামনে এসেছে। এর গভীর তাত্পর্য রয়েছে বইকি। যদিও শিগিগরই উপদ্বীপটিকে পুনরুদ্ধার করার মতো অবস্থায় নেই কিয়েভ। তবে রাশিয়ার ভেতরে যে এ নিয়ে কাঁপুনি ধরেছে, তা বলাই বাহুল্য। ক্রিমিয়ার কার্চ ব্রিজে—যা কিনা প্রেসিডেন্ট পুতিনের স্বপ্নের প্রজেক্ট—ইউক্রেন সেনাদের পর পর দুটি সফল হামলা পুতিনকে বেশ বেকায়দায় ফেলে দেয়। অর্থাত্, নিশ্চিত করে বলা যায়, কৃষ্ণসাগরে মস্কোর আধিপত্য কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ক্রিমিয়ার ওপর। সেক্ষেত্রে এই অঞ্চলের প্রতিরক্ষা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হবেন পুতিন, যার সুযোগ নিয়ে জেলেনস্কি হাত দিতে পারবেন অন্য ফ্রন্টের লড়াইয়ের দিকে। এভাবে সামনের দিনগুলোতে কৃষ্ণসাগর সামগ্রিক রণকৌশলকে প্রভাবিত করবে ব্যাপকভাবে, যা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

বিমা চুক্তির (ইন্স্যুরেন্স ডিল) কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। কৃষ্ণসাগরের উত্তর-পশ্চিম তথা ইউক্রেনের প্রধান বাণিজ্য রুট থেকে রাশিয়ার নৌশক্তির স্থানান্তর কিয়েভের জন্য বেশ স্বস্তিদায়ক। ইউক্রেনকে অবরোধের জালে আটকে ফেলার রাশিয়ার যে প্রচেষ্টা, এর মধ্য দিয়ে তা খর্ব হবে ব্যাপকভাবে। ভলোদিমির জেলেনস্কি যেমনটা বলেছেন, ‘কৃষ্ণসাগরকে কবজা করে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার যে প্ল্যান করে বসে আছে রাশিয়া, সেই সুযোগ আর পাবে না মস্কো।’

অনেকে লক্ষ করেছেন, গত ৯ নভেম্বর কৃষ্ণসাগরে লাইবেরিয়ার একটি বেসামরিক জাহাজ আঘাতপ্রাপ্ত হয় রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায়। ওডেসা অঞ্চলের বন্দরে সংঘটিত ঐ হামলায় এক জন নিহত ও চার জন আহত হয়। এক্ষেত্রে ইউক্রেনের জন্য বিবেচনার বিষয় হলো ‘বিমা ইস্যু’।

উল্লেখ করার বিষয়, অবরোধ কেবল তখনই বিশেষভাবে কাজে দেয়, যখন জাহাজ অপারেটর ও বিমাকারীরা বড় ধরনের অপারেশনাল কিংবা আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যান। এদিক থেকে বলতে হয়, কিয়েভের জন্য এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিশ্বব্যাপী শিপিং সেক্টরগুলোকে ইউক্রেনের প্রতি আস্থা বাড়াতে কাজ করা। কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার নৌ শক্তিমত্তা কমে আসার ফলে এই কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে এসেছে ইউক্রেনের জন্য। এখন রাশিয়ান নৌবাহিনীর দ্বারা সৃষ্ট হুমকি হ্রাসের পাশাপাশি সামুদ্রিক বাণিজ্যকে স্বাভাবিক করার কাজে হাত দিতে হবে জেলেনস্কিকে। লাইবেরিয়ান পতাকাবাহী জাহাজের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা ভুলে গিয়ে বিশ্বের নতুন নতুন দেশ ও শিপ কোম্পানির সঙ্গে বিমা চুক্তি বাড়াতে হবে। এটা বেশ ভালোমতোই সম্ভব। কারণ, উক্ত হামলার ঘটনার পরও ১৪টি ব্রিটিশ বিমাকারীর সঙ্গে কিয়েভকে বিমা চুক্তি চূড়ান্ত করতে সক্ষম হতে দেখেছি আমরা। আগামী দিনগুলোতে বেশি পরিমাণে বিমাচুক্তি করতে পারলে তা কৃষ্ণসাগর করিডরকে রপ্তানিকারকদের কাছে আরো সহজ প্রবেশযোগ্য করে তুলবে। যত বেশি জাহাজ ইউক্রেনের ভেতরে বা বাইরে পণ্য স্থানান্তর করতে সক্ষম হবে, তত বেশি সুবিধা পাবে কিয়েভ। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হবে, ইউক্রেনের বাণিজ্য ক্ষমতা রুদ্ধ করার যে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে রাশিয়া, তা মুখ থুবড়ে পড়েছে পুরোপুরিভাবে।

ওপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধে স্থলে আপাতত কিছুটা অচলাবস্থা চলছে বটে, কিন্তু সমুদ্রে বেশ ভালো অবস্থান তৈরি করেছে ইউক্রেন। বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্য রুট কৃষ্ণসাগরই ইউক্রেন যুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবধান গড়ে দেয় কি না, কে বলতে পারে!

লেখক: ল্যাংকাস্টার ইউনিভার্সিটির রাজনীতি, দর্শন ও ধর্ম বিভাগের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার অধ্যাপক

দ্য কনভারসেশান থেকে অনুবাদ: সুমৃত খান সুজন

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন