রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

যে আত্মত্যাগ শিখিয়ে গেছেন ডা. মিলন

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:৩০

শহিদ ডা. মিলন। একটি অবিস্মরণীয় নাম। একটি ইতিহাস। গণতন্ত্রের জন্য আত্মত্যাগের এক মহিমান্বিত নাম। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় তৎকালীন সরকারের লেলিয়ে দেওয়া দুর্বৃত্তদের গুলিতে ডা. শামসুল আলম খান মিলন নিহত হন। এই শোকাবহ ঘটনার স্মরণে ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি বছর শহিদ ডা. মিলন দিবস পালিত হয়ে আসছে। ডা. মিলনের মধ্য দিয়ে তখনকার স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চারিত হয়। অল্প কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।

হাজারো সংগ্রাম, অসংখ্য আত্মত্যাগ ও মানবতার সেবায় নিয়োজিত চিকিত্সকদের একমাত্র জাতীয় ঐতিহাসিক সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)। চিকিত্সক ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুমূর্ষু মানুষের সেবায় সদা ব্যস্ত এই সংগঠনের সদস্যরা। এ দেশের মানুষের কাছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পথিকৃত বিএমএ। ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ঢাকা মেডিক্যালের পাশে সুউচ্চ শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠা, উনসত্তরের গণ-আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে এই সংগঠনের সংগ্রামী সেনারা নির্ভীক আত্মত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত। পেশাজীবীদের মধ্যে সর্বোচ্চ রক্তদানকারী চিকিত্সকেরা অন্যদের সঙ্গে নিয়ে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছেন। সেই গৌরবময় ইতিহাস ও পূর্বসূরিদের অনুপ্রেরণায় ডা. শামসুল আলম খান মিলনসহ আমরা সেই বিএমএর সদস্য হতে পেরে সত্যিই গর্বিত।

৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স তখন মাত্র ২০ বছর। যে লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭১ সালে তত্কালীন বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এ দেশের ছাত্র-যুবক, শিক্ষক, চিকিত্সক, কৃষক, শ্রমিক, জনতাসহ সব পেশার মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন; স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় দেশি-বিদেশি চক্রান্তের সেই জাতির পিতাকে হত্যার মাধ্যমে লক্ষ্যচ্যুত হয় বাংলাদেশ। আবারও এ দেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় অগণতান্ত্রিক সামরিক স্বৈরশাসন। সেই স্বৈরশাসকের নাগপাশ ছিন্ন করে গণতন্ত্র উত্তরণের বছর হিসেবে আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছিল ১৯৯০ সাল।

১৯৯০ সাল ঢাকার রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নেমে এসেছিল সব মতের, পেশার মানুষ। লক্ষ্য একটাই ছিল—স্বৈরশাসকের পতন, গণতন্ত্রের উত্তরণ। তাই ঢাকা শহর সে সময় পরিণত হয়েছিল মিছিলের নগরীতে। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং চিকিত্সা পেশার সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের চিকিত্সকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ২৩ দফার ভিত্তিতে যখন অগণতান্ত্রিক সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই সামরিক স্বৈরাচারের দোসরদের সহায়তায় ১৯৯০ সালে এ দেশের জনগণের ওপর টিক্কা খান সরকারের মতো চাপিয়ে দেওয়া হয় গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে চিকিত্সক সমাজ অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতির বিরুদ্ধে অন্য সব পেশাজীবীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনকে আরো বেগবান করে।

অতঃপর এলো ২৭ নভেম্বর ১৯৯০। সারা দেশে স্বৈরাচার সামরিক সরকারবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। বিএমএর নেতৃত্বে ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে সারা দেশে চলছিল চিকিত্সকদের কর্মবিরতি। তত্কালীন পিজি হাসপাতালে চলছিল বিএমএ আহূত চিকিত্সক সমাবেশ। এতে যোগদানের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে রিকশাযোগে শাহবাগ পিজি হাসপাতালের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তত্কালীন বিএমএর মহাসচিব ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও যুগ্ম-সম্পাদক ডা. শামসুল আলম খান মিলন।

পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি-সংলগ্ন টিএসসি মোড় অতিক্রমের সময় তাদের রিকশা লক্ষ্য করে গুলি চালায় সামরিক জান্তা বাহিনী। বুকে গুলি লেগে রিকশা থেকে লুটিয়ে পড়েন ডা. মিলন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে রিকশায় করে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগে। সেখানে জরুরি চিকিত্সা করেও বাঁচানো যায়নি তাকে। সবাইকে কাঁদিয়ে তার প্রিয় মেডিক্যাল কলেজেই শহিদের বেশে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। অথচ এই কলেজেই তিনি পড়েছিলেন মেধাবী ছাত্র হিসেবে, পড়িয়েছিলেন বিনয়ী শিক্ষক হিসেবে, নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রাঞ্জল সদালাপী পরমতসহিষ্ণু ব্যক্তি হিসেবে।

ডা. মিলন শহিদ হওয়ার পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আরো বেগবান হয় এবং অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। গণতন্ত্রের উত্তরণের পথে প্রাথমিক বিজয় সূচিত হয়। স্বার্থক হয় মিলনের আত্মদান।

শহিদ ডা. মিলন এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্বের নাম। ১৯৫৭ সালের ২৯ জানুয়ারি বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে ১৯৮৩ সালে এমবিবিএস পাশ করে চিকিত্সক হিসেবে কর্মময় জীবন শুরু করেছিলেন তিনি। ঢাকা মেডিক্যালে ইন্টার্নশিপ চলাকালীন তিনি ইন্টার্ন চিকিত্সক সংগঠনের আহ্বায়ক হয়েছিলেন। শিক্ষক হিসেবেও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষক সমিতির নির্বাচিত কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

ডা. শামসুল আলম খান মিলনের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল ১৯৮৮ সাল থেকে। তখন বিএমএ নির্বাচনে মিলন যুগ্ম-সম্পাদক এবং আমি দপ্তর সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই। সেই থেকে একই সঙ্গে সংগঠনের হয়ে কাজ করতাম। দুটি ভিন্ন প্যানেল থেকে আমরা নির্বাচিত হলেও বিএমএর কাজে বা পেশাগত কোনো বিষয়ে আমাদের মধ্যে বড় ধরনের কোনো মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। একে অপরের সহযোগী বা পরিপূরক হিসেবে পেশার জন্য অটল থেকে কাজ করেছি। চিকিত্সকদের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণ চিকিত্সকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন তিনি, যা তার নির্বাচিত হয়ে আসা থেকেই প্রতীয়মান হয়।

১৯৯০ সালের ২৭ জুলাই বিএমএর বিশেষ বার্ষিক সাধারণ সভায় গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি ও স্বৈরশাসকের অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদে সব চিকিত্সক সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তখন মঞ্চ থেকে নেমে আমি আর মিলন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। ঐ সময় বিবিসি রেডিও থেকে টেলিফোনে বিএমএ নেতাদের একটি সাক্ষাত্কার নেওয়া হয়। ১৯৯০ সালের ২৭ জুলাই রাতে বিবিসি রেডিওতে আমার যে সাক্ষাত্কারটি প্রচারিত হয়, তাতে মিলন পাশে থেকে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে আমাকে সহযোগিতা করেছিলেন।

শহিদ ডা. শামসুল আলম খান মিলনের ২৭তম শাহাদাতবার্ষিকীতে আমি তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তার আত্মদান ছিল দেশের সাধারণ ও বৃহত্তর মানুষের মঙ্গলের জন্য। তিনি ছিলেন অতিমাত্রায় একজন সমাজসচেতন মানুষ। এ দেশের হাজার হাজার চিকিত্সকের প্রতি, চিকিত্সা পেশার প্রতি, সাধারণ মানুষের প্রতি, গণতন্ত্রের প্রতি তার অপরিসীম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ ছিল। মাঝেমধ্যে হোঁচট খেলেও বাংলাদেশে গণতন্ত্র আজ সুসংহত। ডা. মিলন যে লক্ষ্য সামনে রেখে সংগ্রাম করতে করতে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন, অনেক হতাশার পর ১৯৯৬-২০০১ ও ২০০৮ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তিন মেয়াদে দায়িত্বরত জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত গণতান্ত্রিক সরকার তার অনেকটাই বাস্তবায়ন করেছে।

এই দিবসে প্রত্যাশা, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার অচিরেই বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে নিয়োাজিত চিকিত্সক কর্মকর্তার সঙ্গে অন্যান্য পেশার বা ক্যাডারের মধ্যে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করবে। কর্মস্থলে চিকিত্সকদের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান প্রয়োজন এবং চিকিত্সা অবকাঠামো নির্মাণসহ স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বৃদ্ধি প্রয়োজন, এছাড়া চিকিত্সকদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রবর্তন, স্বাস্থ্যবিমা, হেল্থ কমিশন গঠন সময়ের দাবি। গ্রামীণ জনপদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নত চিকিত্সাসেবা সহজলভ্য ও সম্পপ্রসারিত হবে। মিলনের বিদেহী আত্মা শান্তিতে থাকুক, এই কামনা নিরন্তর।

লেখক: উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন