রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

স্মার্ট গ্রন্থাগার দেশের শিক্ষা উন্নয়নের মাইলফলক

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৩, ০৫:৩০

মানবসভ্যতার উষালগ্ন থেকেই সমাজে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়ে আসছে। আজকের মতো সুসজ্জিত গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব তখন পাওয়া না গেলেও সভ্যতার একমাত্র ধারক ও বাহক হিসেবে গ্রন্থাগার স্বীকৃত। প্রাচীনকালের যেসব সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া যায়, তার প্রত্যেকটি সভ্যতার মধ্যে গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব বিদ্যমান। যদিও সেসব গ্রন্থাগার তত্কালীন রাজপরিবার এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ছিল। তখনকার গ্রন্থাগারগুলো ছিল গণমানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। শুধু তা-ই নয়, গ্রন্থাগার ছিল তখনকার সমাজের আভিজাত্যের প্রতীক। কিন্তু কালের বিবর্তনে মানুষের ধারণা ব্যাপকভাবে পালটে গেছে। এর কারণ তথ্য প্রযুক্তি উন্নয়নের ফলে গ্রন্থাগারের সেবার মানও উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে পাঠকদের চাহিদা আরো উন্নত করতে বর্তমান সরকার স্মার্ট গ্রন্থাগারকে বেছে নিয়েছে। তাই বিশাল অন্তহীন জ্ঞান সমুদ্রের মধ্যে জীবনকে জানার জন্য স্মার্ট গ্রন্থাগার হচ্ছে বর্তমান সময়ে সব মানুষের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।

স্মার্ট শব্দের অর্থ সুনির্দিষ্ট পরিমেয় সাধনযোগ্য প্রাসঙ্গিক সময়সীমাকে বোঝায়। অর্থাত্ স্মার্ট শব্দটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তথ্যপ্রযুক্তি, জ্ঞানবিজ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিষয়গুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে স্মার্ট গ্রন্থাগার হলো এমন একটি গ্রন্থাগার, সেবা ও ধারণা। যার মধ্যে থাকবে একটি ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কিং ও ইন্টারনেট অব থিংস (এলওটি) পদ্ধতি। এই এলওটি শব্দটি মূলত ডিভাইসগুলোর সম্মিলিত নেওয়ার্ক, যা ক্লাউড ও যোগাযোগ সুবিধা প্রদানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। এর ফলে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির ওপর ভিত্তি করে কিছু ডেটা সিগন্যাল সেন্সিং ও এর কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে স্মার্ট গ্রন্থাগারের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে মেশিন লার্নিং, বিকন অথবা আইবিকন, মোবাইল কিয়স্ক (ট্যাবলেটভিত্তিক কিয়স্ক), মোবাইল অ্যাপস এবং আরএফআইডি ইত্যাদি প্রযুক্তি বিদ্যমান। ফলে স্মার্ট গ্রন্থাগারে বিভিন্ন ডিভাইস ব্যবহার করে ব্যবহারকারী ও গ্রন্থাগারিকদের মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপন করা সম্ভব। যার মূলে দেশের সব গ্রন্থাগারকে আধুনিক ও ডিজিটালসমৃদ্ধ করে পাঠকসেবাকে আরো উন্নত করাও সম্ভব, যাতে জনগণ বিশেষ করে তরুণ প্রজম্ম বইমুখী তথা গ্রন্থাগারমুখী হয়। এর জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাবিত হয়ে একটি স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে যথাযথ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। তবে একটি দেশের গ্রন্থাগারে কতটা সমৃদ্ধ তা দেখেই সে দেশের উন্নয়ন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। তাই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রন্থাগারকে আধুনিকীকরণ করা অপরিহার্য।

উল্লেখ্য যে, গ্রন্থাগারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাকে নবপ্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের সভায় বর্তমান সরকার জাতীয়ভাবে গ্রন্থাগার দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আর কয়েক দিন পরই এই দিবসটি আসছে। দেশের জনগণের পাঠাভ্যাস সৃষ্টি ও বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোর কার্যক্রম আরো গতিশীল করতে দেশব্যাপী এই দিবসটি পালন করা হয়। যতদূর জানা যায় যে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পরে অর্থাত্ ১৯৫৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে বর্তমান সরকার জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতি বছর ৫ ফেব্রুয়ারিতে ‘জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত ২২তম জাতীয় সম্মেলনে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে চারটি ভিত্তির কথা উল্লেখ করেন। এগুলো হলো—ক. স্মার্ট সিটিজেন (চৌকশ নাগরিক) খ. স্মার্ট ইকোনমি (চৌকস অর্থনীতি), গ. স্মার্ট গভর্নমেন্ট (চৌকস সরকার) এবং ঘ. স্মার্ট সোসাইটি (চৌকশ সমাজ)। এজন্য এর পূর্বশর্ত হলো স্মার্ট শিক্ষা ও স্মার্ট গ্রন্থাগার। এক্ষেত্রে স্মার্ট সিটিজেনের চারটি গুণ থাকতে হবে। যথা—বুদ্ধি, দক্ষতা, উদ্ভাবনী ও সৃজনশীলতা। তবে গ্রন্থাগার সেবার বৈষম্য দূর করে সবাইকে স্মার্ট গ্রন্থাগার সেবার আওতায় আনার মাধ্যমে স্মার্ট নাগরিক গঠনে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশকে স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রথমে নাগরিকদের স্মার্ট নাগরিক হতে হবে। স্মার্ট বাংলাদেশ হবে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি দেশ। এদের চিন্তা-চেতনায়, মননে, দর্শনে, দৃষ্টিভঙ্গিতে ও বিশ্বাসে স্মার্ট নাগরিক হতে হবে। এজন্য প্রথম ও প্রধান উপাদানই হলো জ্ঞান অর্জন করা। আর জ্ঞান অর্জন ছাড়া স্মার্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ স্মার্ট বাংলাদেশের সব ক্ষেত্র—কৃষি, অর্থনীতি, ব্যবসায়-বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও চিকিত্সা ইত্যাদি সবই জ্ঞাননির্ভর। কাজেই স্মার্ট নাগরিক হতে হলে সর্বাগ্রে আমাদের জ্ঞানচর্চায় মনোনিবেশ করতে হবে। তাই জ্ঞান অর্জনের ব্যারোমিটার বা পরিমাপক যন্ত্র হচ্ছে গ্রন্থাগার। ২০২১ সালে বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকের (গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স) তালিকায় বিশ্বের ১৫৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২০তম। এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ আর জ্ঞান অর্থনীতির সূচক ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এই সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। আর টানা চতুর্থ বারের মতো এ তালিকায় শীর্ষ স্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড। এদিকে ২০২১ সালে জ্ঞান সূচক তৈরিতে সাতটি বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয়। এগুলো হলো—প্রাক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, প্রযুক্তিগত ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, উন্নয়ন ও উদ্ভাবন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং অর্থনীতি ও সাধারণ সক্ষমতার পরিবেশ। এক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষায় প্রতি বছর বিভিন্ন সংস্থা যে বৈশ্বিক র্যাংকিং তৈরি করে। এতে প্রথম ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নেই। টাইমস হায়ার এডুকেশনের ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং-২০২৩ এ ১০৪টি দেশ ও অঞ্চলের ১ হাজার ৭৯৯টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। তবে চারটি ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষমতা পরিমাপ করে এ তালিকা করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে শিক্ষা, গবেষণা, জ্ঞান স্থানান্তর ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষ স্থানে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। এ দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৬০০ থেকে ৮০০-এর মধ্যে এবং বাংলাদেশের আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এ অবস্থানে নেই। এছাড়াও র্যাংকিং দেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় ১ হাজার ২০১ থেকে ১ হাজার ৫০০ এর মধ্যে স্থান পেয়েছে। এগুলো হলো বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার মান আরও উন্নত করা জরুরি। এক্ষেত্রে ইউজিসিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মান উন্নত করার জন্য আরো বেশি তদারক করতে হবে বলে সুশীল সমাজ মনে করেন।

এই অবস্থার উন্নতির জন্য দেশের গ্রন্থাগারগুলো তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় আন্তর্জাতিক মানের গ্রন্থাগারের মতো উন্নত এবং সমৃদ্ধ হতে হবে। এর পাশাপাশি গ্রন্থাগারগুলোকে ডিজিটালাইজেশন করার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে। বিশেষত গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরসহ সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্মিলিত এবং অত্যাধুনিক ও নান্দনিক গণগ্রন্থাগার ভবনে বাস্তবায়ণের লক্ষ্যে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর বহুতল ভবন নির্মাণ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় রয়েছে, যা একটি আধুনিক দৃষ্টিনন্দন স্মার্ট গ্রন্থাগার হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এদিকে ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার প্রকল্পের মাধ্যমে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর বই নিয়ে প্রতিটি জেলায় পাঠকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অন্যদিকে আধুনিক গ্রন্থাগার ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমম্বয়ে গ্রন্থাগারের সার্বিক সেবা ব্যবহারকারীরা যাতে সহজেই ঘরে বসেই পেতে পারে, তারও ব্যবস্থা করা হবে। যেখানে নতুন নতুন প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে আরো সহজ করবে। আর ৪র্থ শিল্পবিপ্লবের চালেঞ্জকে সামনে রেখে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বাধিক ব্যবহার করে স্মার্ট বাংলাদেশ ও স্মার্ট গ্রন্থাগার গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে গ্রন্থাগারকে স্মার্ট করতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। গ্রন্থাগার না থাকলে যেমন পূর্বপ্রজম্ম সম্পর্কে কিছু জানতে পারবে না। ঠিক তেমনি স্মার্ট প্রযুক্তি না থাকলে ভবিষ্যত্ সম্পর্কেও চিন্তাভাবনা করা সম্ভব নয়। তাই স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে গ্রন্থাগারগুলোকে স্মার্ট করতে হবে। ফলে গ্রন্থাগার সংগ্রহগুলোকে আরও স্মার্ট করতে হবে। তথাপি, কাগজে মুদ্রিত পাঠ্যসামগ্রীর সঙ্গে লাইব্রেরিতে ডিজিটাল কনটেন্ট, ই-ম্যাটেরিয়াল, অনলাইন কনটেন্ট, অডিও বুক ও ভিডিও কনটেন্ট ইত্যাদিও সংরক্ষণ করতে হবে। স্মার্ট গ্রন্থাগার ব্যবহারকারীদের জন্য ওয়েবসাইট অ্যাপস তৈরি করে বিরতিহীনভাবে ২৪ ঘণ্টা ব্যবহারের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আর ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার সুবিধা সম্প্রসারণ ও গ্রন্থাগারের দৈনন্দিন বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে এআই, আইওটি, রোভোটিক্স, ন্যানো টেকনোলজি এবং থ্রিডি প্রিটিং ইত্যাদি প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। গ্রন্থাগার কর্মীদেরকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ ও সক্ষম হতে হবে। এজন্য প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম ইত্যাদির মাধ্যমে গ্রন্থাগার কর্মীদেরকে প্রশিক্ষিত করা যেতে পারে। পৃথিবীর স্মার্ট দেশ ও জাতিগুলোর থেকে ধারণা নিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণা এবং প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করেই বাংলাদেশের স্মার্ট গ্রন্থাগারকে আরো উন্নতি করা যেতে পারে।

লেখক: গ্রন্থাগার বিভাগের প্রধান, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, চট্রগ্রাম

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন