কবি জীবনানন্দ দাশ তাহার পাখি কবিতার একাংশে লিখিয়াছেন ‘এই পাখি—এতটুকু—তবু সব শিখেছে সে—এ এক বিস্ময়...।’ পৃথিবীতে প্রায় ১২ হাজার প্রজাতির পাখি রহিয়াছে, তাহার এক-তৃতীয়াংশই পরিযায়ী। কিছু পাখি প্রতি বত্সর ২২ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়া চলিয়া যায় দূর দেশে। পরিযায়ী পাখি সাধারণত ৬০০ হইতে ১ হাজার ৩০০ মিটার উঁচু দিয়া উড়িয়া চলে দিনের পর দিন। ছোট পাখিদের গতি ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার। দিনরাতে এরা প্রায় ২৫০ কিলোমিটার উড়িতে পারে। বড় পাখিরা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত অনায়াসে উড়িতে পারে। আশ্চর্যের বিষয়, এই সকল পাখি তাহাদের গন্তব্যস্থান সঠিকভাবে নির্ণয় করিতে কখনো ব্যর্থ হয় না। সমুদ্রে নাবিক যেমন কম্পাস ব্যবহার করে, এই পাখিদের দেহেও সেই রকম বা তাহার চাইতেও উন্নত কিছু কৌশল রহিয়াছে সৃষ্টিগতভাবেই। দেখা গিয়াছে, পথ চিনাইতে অভিজ্ঞ পাখিরা ঝাঁকের সামনের দিকে থাকে। নূতনরা থাকে পিছনে। ধারণা করা হয়, পাখিরা উপকূলরেখা, পাহাড়শ্রেণি, নদী, সূর্য, চাঁদ, তারা ইত্যাদির মাধ্যমেই পথ খুঁজিয়া লয়। এমনকি যেই সকল পাখি একা ভ্রমণ করে তাহাদের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়াছে, জীবনে প্রথম বার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করিলেও তাহারা ঠিকই গন্তব্যে পৌঁছাইয়া যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রই পাখিদের পথ চিনায়। হাউ ইটস লাইক টু বি আ বার্ড বইতে পক্ষিবিশারদ ডেভিড অ্যালেন সিবলে বলিয়াছেন, হয়তো নীল আকাশে রক্তিম রেখার ন্যায় চৌম্বকক্ষেত্রটি দেখিতে পায় পরিযায়ী পাখিরা। তাহার দাবি, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র মানুষের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নহে; কিন্তু পাখিরা তাহা বুঝিতে পারে।
পাখিরা বিস্ময়। বিস্ময় তাহাদের শরীরী গঠন, তাহাদের ভূগোলজ্ঞান, তাহার জীবনাচরণ। পাখিদের অভিজ্ঞতায় যেই বিশ্ব ধরা দেয়, তাহা অতি সমৃদ্ধ, অতি বিচিত্র। মানুষ যতগুলি রং দেখিতে পায়, পাখি দেখিতে পায় তাহা অপেক্ষা অনেক অধিক। তাহারা অতিবেগুনি রশ্মি দেখিতে পায় বলিয়া তাহাদের বিশ্বের রং-রূপ আমাদের তুলনায় ভিন্ন। মানুষের চোখে যেই সকল পশুপক্ষী ধূসর, বিবর্ণ, পাখিদের চোখে তাহাদেরই কোনো কোনোটি দ্যুতিময়, বর্ণচ্ছটায় উজ্জ্বল। মহান সৃষ্টিকর্তার বিস্ময়ের এক ছোট্ট নিদর্শন এই বিচিত্র পক্ষীকুল; কিন্তু সেই বিস্ময়েরও শেষ থাকে। সুদূর সাইবেরিয়া হইতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়া যখন অনুকূল পরিবেশে আসে, কিংবা গ্রীষ্মের সময় উষ্ণতা হইতে বাঁচিতে চলিয়া যায় তুলনামূলক শীতলভূমিতে, এই সকল পাখি যেন পুরা বিশ্বকে তাহাদের দুইটি ডানার নিচে কবজা করিয়া ফেলে। সে যাহা চায়, তাহাই হয়। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অকুল পাথার—কোনো কিছুই তাহাকে নিরস্ত করিতে পারে না। সৃষ্টিকর্তা যেন সকল সূক্ষ্ম ক্ষমতা অর্পণ করিয়াছে তাহাদের মস্তিষ্কে, স্নায়ুতন্ত্রে, ডানার বিস্তারে। তবে জীবনানন্দ দাশ তাহার ঐ ‘পাখি’ কবিতার অন্য অংশের দিকটিও প্রণিধানযোগ্য। লিখিয়াছেন—‘সৃষ্টির কীটেরও বুকে এই ব্যথা ভয়;/ আশা নয়—সাধ নয়—প্রেম স্বপ্ন নয়/ চারিদিকে বিচ্ছেদের ঘ্রাণ লেগে রয়।’
এই পাখির ডানায় যেমন মহান সৃষ্টিকর্তার নিয়ামতের বিস্ময়ছাপ রহিয়াছে, তেমনিভাবে এই পাখিকেও নিজ ক্ষমতায় শত শত মাইল নির্বিঘ্নে উড়িবার পরও কখনো কোনো দুর্বিপাকে প্রাণবিসর্জন দিতে হয়। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র অনুধাবনের ক্ষমতা, অতিবেগুনি রশ্মি দেখিতে পাইবার বিস্ময়কর দৃষ্টিশক্তি এবং সামান্য আহার নিদ্রার মধ্য দিয়া দিনের পর দিন রাতের পর রাত অকুল পাথার পাড়ি দিয়াছিল যেই দুটি ডানা—অজানা অচেনা দুর্বিপাকে হঠাত্ মৃত্যুর মধ্য দিয়া তাহার সকল ক্ষমতা তিরোহিত হয়। রবীন্দ্রনাথের তোতাকাহিনির গল্পের মতো মৃত তোতাপাখির পেটের মধ্যে কাগুজেবিদ্যা যেমন খসখস গজগজ করিতেছিল, তেমনি বিস্ময়কর সকল কাণ্ডকারখানা ঘটানো পাখিটি যেন হঠাত্ দুর্বিপাকে মুখ থুবড়াইয়া পড়ে। তাহার ডানার পালকে আর কঙ্কালের মধ্যে যেন সৃষ্টিকর্তার দেওয়া সকল নিয়ামত আর ব্লেসিং যেন ঝোড়ো বাতাসে ক্ষণে ক্ষণে কাঁপিতে থাকে। পাখিরা এই বার্তায় দেয় যে, সৃষ্টিকর্তার দেওয়া সকল ব্লেসিং কখনো না কখনো ফুরাইয়া যায়।
