রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

অতি উৎসাহিত ব্যাপারে সতর্ক থাকিতে হইবে

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:৩০

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক করিবার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তাগিদ দেওয়া হইতেছে। এই ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইহার জন্য তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করিয়াছেন। সিইসি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনারও একই ধরনের নির্দেশনা দিয়াছেন। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে ৩০টিরও অধিক রাজনৈতিক দল ইতিমধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়াছে; কিন্তু স্থানীয় ও মাঠ পর্যায়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই নির্দেশনা প্রতিপালিত হইতেছে না বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। বিশেষ করিয়া, সেইখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা প্রশ্নাতীত নহে। কোনো কোনো আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শক্তি প্রয়োগের জন্য বহিরাগত কিংবা চিহ্নিত অপরাধীদের লইয়া এলাকায় মহড়া দিতেছেন। কোথাও কোথাও ইহাকে কেন্দ্র করিয়া সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিতেছে। তাহারা এইভাবে ভীতসন্ত্রস্ত পরিবেশ সৃষ্টি করিলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তাহাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করিতেছেন না। উলটা তাহাদের কথামতো মিথ্যা, সাজানো ও ভিত্তিহীন মামলায় প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য প্রার্থী কিংবা তাহার সমর্থক নেতাকর্মীদের পদে পদে হয়রানি করা হইতেছে। তাহাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ, কোনো কারণ ছাড়াই সাধারণ মানুষকে থানায় আটক করিয়া টাকা আদায় ইত্যাদি অভিযোগও রহিয়াছে। অবিলম্বে ইহার প্রতিকার করা না গেলে আসন্ন নির্বাচন লইয়া তৈরি হইবে আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাস।

সরকারপ্রধান ও সকলের প্রত্যাশা অনুযায়ী আসন্ন নির্বাচন যতদূর সম্ভব তর্কবিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখিতে হইবে; কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যদি ইহাকে গুরুত্ব না দেন এবং স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-পাতিনেতাদের হুকুমমতো চলেন, তাহা হইলে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা কীভাবে সম্ভব? তাহাদের নিকট সরকারপ্রধানের এই মেসেজ বা বার্তা দেওয়া হইলেও হয় তাহারা তাহা সঠিকমতো অনুধাবন করিতে পারেন নাই অথবা তাহারা সকল কিছু বুঝিয়াও না বুঝিবার ভান করিতেছেন। কথায় বলে, অর্থই অনর্থের মূল। আবার সমাজে এই কথাটিও প্রচলিত যে, টাকা দিলে বাঘের চোখও পাওয়া যায়। অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে কেহ কেহ নির্বাচনকে প্রভাবিত করিয়া ইহার পরিবেশ নষ্ট করিতে তৎপর। অন্যদিকে কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা চাঁদাবাজিসহ যেইভাবে ছোটখাটো বিষয় লইয়া স্থানীয় পর্যায়ে ধরপাকড় চালাইতেছেন, তাহা অত্যন্ত নিন্দনীয়। ইহা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের অন্যতম প্রতিবন্ধক। জাতীয় নির্বাচনকে সম্মুখে রাখিয়াই যে এই ধরনের অপচেষ্টা চলিতেছে তাহা নহে। ইহার পূর্বে আমরা দেখিয়াছি—পৌরসভা নির্বাচনের এক সপ্তাহ পূর্বেও গ্রেফতার অভিযান পরিচালিত হইয়াছে। অথচ নির্বাচন কমিশন এই ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই।

সাধারণত তপসিল ঘোষণার পর কাহাকেও গ্রেফতারের নিয়ম নাই। এখন বলা হইতেছে, প্রতীক বরাদ্দের পর যখন নির্বাচনি প্রচারণা চলিবে, তখন কাহাকেও গ্রেফতার করা হইবে না। তাহা ছাড়া এইখানে আরও একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য, তাহা হইল—তপসিল ঘোষণার পর স্থানীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের ট্রান্সফার বা বদলি করিবার প্রথা চলিয়া আসিতেছে বহুদিন ধরিয়া। ইহা এই জন্য করা হয় যে, যাহাতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়। যাহাতে সরকারি কর্মকর্তাদের অঢেল অর্থকড়ি দিয়া কেহ কেহ ম্যানেজ করিয়া লইলেও নির্বাচনের পূর্বে তাহাদের বদলির মাধ্যমে সেই অপচেষ্টা আটকানো সম্ভব হয়; কিন্তু এই বার আদেশ দেওয়া হইয়াছে যে, অভিযোগ থাকিলেই কেবল বদলি করা হইবে। এই অভিযোগ দায়ের ও প্রমাণ করিতে করিতেই তো নির্বাচন শেষ হইয়া যাইবে। কেননা কাহারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠিলে তদন্ত কমিটি গঠন ও তদন্ত পরিচালনার জন্য সময়ের প্রয়োজন। তাই ইহা বাঙালিকে হাইকোর্ট দেখানো ছাড়া আর কী হইতে পারে?

উপরিউক্ত অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির অবসান না হইলে নির্বাচনকে ঘিরিয়া সংঘাত-সংঘর্ষ বৃদ্ধি পাইবার আশঙ্কাকে একেবারে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। অতএব, এই সমস্ত অতি উৎসাহী বা অসৎ কর্মকর্তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। আর যাহারা সরকারি দলের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী ও স্বাধীনতাবিরোধী এবং এই সকল অপকর্মের হোতা বা অনুঘটক, তাহাদের বিরুদ্ধেও এই মুহূর্তে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন