রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

হেনরি কিসিঞ্জার: রেস্ট ইন পিস

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৪:০০

কোনো গুণীজনের প্রতি শুভকামনা জানাইতে সংস্কৃত ভাষায় একটি শুভাশিস রহিয়াছে—‘শতায়ু ভব’। অর্থাত্ কাহারো আয়ুষ্কাল শত বত্সর কামনা করা, যাহাতে সেই ব্যক্তি একটি দারুণ কর্মময় জীবন অতিবাহিত করিতে পারেন। ঠিক এমনই শতবর্ষ আয়ুষ্কাল অতিক্রম করিয়া গতকাল কানেকটিকাটের নিজস্ব বাড়িতে এই নশ্বর পৃথিবী হইতে চিরবিদায় লইয়াছেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার। তাহার কর্মময় জীবন লইয়া পক্ষে-বিপক্ষে অনেক বাদানুবাদ রহিয়াছে। কাহারো প্রয়াণে তাহার সুখ্যাতিপূর্ণ দিকগুলিই তুলিয়া ধরিতে হয়।

বিশ্বকে বিভিন্ন সময়ে বাঁকবদলে বিশেষ ভূমিকা পালনকারী হেনরি কিসিঞ্জারের রহিয়াছে অসংখ্য আলোচিত অধ্যায়। ১৯২৩ সালে জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করা হেনরি কিসিঞ্জার মাত্র ১৫ বত্সর বয়সে নািস জার্মানি হইতে পলায়ন করিয়া পরিবারের সহিত ১৯৩৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চলিয়া আসেন। ১৯৪৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভের পর তিনি প্রথমে দেশটির সামরিক বাহিনী ও পরে কাউনটার ইনটেলিজেন্সে কাজ করেন। পিএইচডি ডিগ্রি লাভের পর তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে শিক্ষক হিসাবে যুক্ত হন। অতঃপর ১৯৬৯ সালে তত্কালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তাহাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগদান করিলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক প্রভাব তৈরির সুযোগ অর্জন করেন। পর্যায়ক্রমে নিক্সন প্রশাসনে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে কাজ করেন। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সহিত তাহার এতটাই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল যে, ব্রিটিশ দার্শনিক ইসাইয়া বার্লিন এই যুগলকে অভিহিত করিয়াছেন—‘নিক্সনজার’ হিসাবে। ইহার পর প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সময়েও কিসিঞ্জারের নেতৃত্বে পরিচালিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল হিসাবে ইসরাইল ও ইহার প্রতিবেশীদের মধ্যে ইয়ম কিপুর যুদ্ধ অবসানে মধ্যস্থতার সুযোগ আনিয়া দেয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ অবসানে প্যারিস শান্তিচুক্তিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও অনেক আইনপ্রণেতারা বিভিন্ন বিষয়ে তাহার পরামর্শ লইয়াছেন। তিনি এতটাই বিশিষ্ট ছিলেন যে, ১০ বত্সর পূর্বে যখন তিনি নবতিপর হইয়াছিলেন, তাহাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাইতে হাজির হইয়াছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলেরই প্রভাবশালী শীর্ষ কর্তাব্যক্তিগণ। দুই দলের সহিত সখ্য রাখিবার ক্ষেত্রে সুখ্যাতি ছিল কিসিঞ্জারের।

১৯৭০-এর দশকে চীন যখন কূটনৈতিকভাবে একঘরে হইয়াছিল, তখন দেশটিকে সেই অবস্থা হইতে বাহির করিয়া আনিতে তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কিসিঞ্জার। ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে গোপনে বেইজিংয়ে চলিয়া গিয়াছিলেন কিসিঞ্জার। চীনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দুয়ার উন্মুক্ত করিয়া দেওয়ায় উত্পাদন খাতে বেইজিংয়ের উত্থান ঘটিতে শুরু করে এবং ক্রমান্বয়ে চীন আজ বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের পর সবচাইতে বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হইয়াছে। কিসিঞ্জার যখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব ছাড়েন, ততদিনে তিনি চীনের পরামর্শকের খাতায় নাম লিখাইয়াছেন। এমনকি গত জুলাইয়ে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই বেইজিং সফর করেন শতবর্ষী কিসিঞ্জার। ১৯৭১ সালে কিসিঞ্জারের ভূমিকা লইয়া বিতর্ক রহিয়াছে। ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ইন্ডিয়া টুডেতে প্রকাশিত ‘কিসিঞ্জার স্মৃতি: বাংলাদেশ যুদ্ধের যন্ত্রণা’ প্রতিবেদনের এক জায়গায় কিসিঞ্জারের উদ্ধৃতি দিয়া বলা হয়: ‘পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমাদের বিভ্রম দূর করিতে হইবে এবং নৈতিকতা ও বাস্তববাদের মধ্যে যে কোনো একটিকে বাছিয়া লইতে হইবে।’ তাহার বিরুদ্ধে আনীত সমালোচনার উত্তরে কিসিঞ্জার বলিয়াছিলেন :‘ন্যায়বিচার বা সদ্গুণের উপর কোনো জাতিরই একচেটিয়া অধিকার নাই এবং বিশ্বব্যাপী নিজস্ব ধারণা বাস্তবায়নের ক্ষমতা কাহারো নাই।’ ১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর তিনি ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর সহিত গণভবনে দুই ঘণ্টাব্যাপী একান্ত বৈঠক করেন। ইহার পর তিন মিনিটের প্রেস কনফারেন্সে তিনি যদিও এই প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকার করেন যে, কেন একাত্তর সালে তিনি বঙ্গোপসাগরে ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ পাঠাইয়াছিলেন। তবে কিসিঞ্জারের সফর সম্পর্কে প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুল্টজ তাহার ‘বাংলাদেশ :দ্য আনফিনিশড রেভলিউশন’ গ্রন্থে লিখিয়াছেন :বঙ্গবন্ধুর সহিত সাক্ষাতের পর কিসিঞ্জার সাংবাদিকদের বলিয়াছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে না দেখিলে তিনি বুঝিতেই পারিতেন না যে, একজন মানুষের পক্ষে এমন উচ্চতায় পৌঁছানো সম্ভব।’

‘শতায়ু ভব’ মানুষটি বিশ্বে শতভূমিকা পালন করিয়া শতবর্ষে বিদায় লইলেন। আমরা তাহার আত্মার শান্তি কামনা করি।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন