রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

কানে পানি না গেলে সত্য অনুধাবন হয় না

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:৪৫

সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া ক্ষমতাসীন দলের একাধিক পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাইতেছে। সম্প্রতি একটি জেলায় ক্ষমতাসীন দলের যুযুধান দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সময় শতাধিক ককটেল বিস্ফোরণে দুই পক্ষের অন্তত পাঁচ জন আহত হইয়াছে। আরেক জায়গায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ট্যাটাবিদ্ধসহ ১২ জন আহত হইয়াছে। দেখা যাইতেছে, ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে ঘাপটি মারিয়া থাকা অরাজক ও অস্থির পরিবেশ সৃষ্টিকারী  কথিত নব্য নেতাকর্মীরা ট্যাটা, বল্লম, রামদা, হকিস্টিক, লোহার রড, চাপাতি, ককটেল লইয়া ক্ষমতাসীন দলেরই অন্য পক্ষের ওপর হামলা করিতেছে।

ইহারা কাহারা? কী তাহাদের পরিচয়? একটু কি কেস স্টাডি করিয়া দেখা যায় না—কোথায় তাহাদের শেকড়, কী তাহাদের আদর্শ? কোন মতাদর্শ লইয়া তাহারা অতীতে পরিচালিত হইয়াছে এবং তাহাদের পূর্বপুরুষেরা কী ছিলেন? তাহারাই কি সুচ হইয়া ক্ষমতাসীন দলে অনুপ্রবেশ করিয়া এখন ক্ষমতাসীন দলেরই নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-সংঘর্ষে জড়াইয়া পড়িতেছে? তাহাদের ব্যাপারেই তো প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী মৃত্যুর পূর্বে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষনেতাদের সতর্ক করিয়া গিয়াছিলেন। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সাধারণত নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ থাকে। সেই আদর্শকে যাহারা হূদয়ে-মননে ধারণ ও লালনপালন করেন, তাহারা সেই রাজনৈতিক দলের অনুসারী কিংবা সরাসরি সদস্য হইয়া থাকেন। সারা বিশ্বেই আদর্শগত রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষেত্রে এই চিত্র দেখা যায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগত কোনো রাজনৈতিক দলে যদি বিপরীত আদর্শের, অর্থাত্ রাজাকার-আলবদর-আলশামসের মতাদর্শের ছেলেপুলেদের দেখা যায়, এবং তাহারা যদি একের পর এক অমার্জনীয় দুষ্কর্ম করিতে থাকে, তখন বুঝিতে হইবে, এই ধরনের বহিরাগতদের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা রহিয়াছে। সুতরাং এই অনুপ্রবেশকারীরা কখনোই ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক হিসাবে অনুপ্রবেশ করে নাই। তাহাদের মিশন-ভিশন আলাদা এবং সেই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ীই তাহারা চলিতেছে, যাহা এখন আরো স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে। 

নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হইবে—ইহা প্রত্যাশা করা হয় বটে, বাস্তবতা হইল—নির্বাচন কখনোই শান্তিপূর্ণ হয় নাই। কিন্তু সেই অশান্তির একটি সহনীয় মাত্রা রহিয়াছে। এখন যাহা হইতেছে, তাহা কি মাত্রা ছাড়াইয়া যাইতেছে না? বাংলায় যাহাকে বলে ‘আঙুল ফুলিয়া কলাগাছ’ হওয়া, তাহার সবচাইতে ভালো উদাহরণ হইল মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা। বহু জায়গায় অনুপ্রবেশকারীরা ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় মাদকের কারবার করিয়াছে। এই সংক্রান্ত খবর বিভিন্ন সময় প্রকাশিত হইয়াছে যে, ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের অফিসে বঙ্গবন্ধুর ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি টানাইয়া তাহারা একধরনের ঢাল তৈরি করে। অতঃপর সেইখানে কিছু একটা ঘটিলে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু বা প্রধানমন্ত্রীর ছবি ভাঙা হইয়াছে! দুঃখজনকভাবে কোথাও কোথাও প্রশাসনও এমন একটি পর্যায়ে চলিয়া গিয়াছে, অর্থ আদানপ্রদানের মাধ্যমে তাহারাও বলিয়াছে যে, ‘হ্যাঁ, প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর ছবি ভাঙা হইয়াছে।’ আসলে মাদক ব্যবসায়ীদের বিপুল কাঁচা টাকার লোভ সামলাইবার মতো ইস্পাতদৃঢ় আদর্শ অনেকের মধ্যেই নাই। এমনকি ইতিপূর্বে পুলিশেরই অনুসন্ধানে দেখা গিয়াছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের একটি অংশও এই ব্যবসার টাকার লোভ সামলাইতে পারে নাই।

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগত দলটির নীতিনির্ধারকদের ইহা অনুধাবন করিতে হইবে। তাহাদের বুঝিতে হইবে—তাহাদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগত দলটি নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য যতটা সমালোচিত হইতেছে, তাহার চাইতে অনেক বেশি সমালোচিত হইতেছে দলটির অনুপ্রবেশকারীদের অন্যায়-অত্যাচার এবং বিবিধ দুষ্কর্মমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য। এই জন্য চারিদিকের সংঘর্ষের আলামত আমলে নেওয়া হউক। বিজ্ঞান অনুযায়ী, কোনো ঘটনার সত্যতা খুঁজিতে কেস স্টাডি করিতে হয়। সুতরাং কেস স্টাডি করিয়া সরেজমিন গিয়া দেখা হউক—আসল রহস্য কী? তাহার পর যাহারা দোষ করিয়াছে, তাহাদের অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হউক। সারা দেশের মানুষ সকল এলাকার সকল কাহিনি জানেন না, সকল সত্য বুঝিতেও পারেন না। কিন্তু যাহারা স্থানীয় লোক, তাহারা অন্তত বুঝিতে পারিবেন—কোনটা সত্য আর কোনটা বানোয়াট। আমরা বারংবার এই ব্যাপারে সতর্ক করিয়াছি—কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হইল—কানে পানি না গেলে সত্য অনুধাবন হয় না।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন