বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ট্রেন যোগাযোগ: দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার  

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৪:১৫

১ ডিসেম্বর থেকে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে বাণিজ্যিকভাবে ট্রেন যাত্রা শুরু হলো। এই সংবাদটি আজ শুধু চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারের মানুষের জন্য আনন্দদায়ক নয়, পুরো দেশের মানুষের জন্য শুভ সংবাদ। এই ট্রেন চলাচলের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো।

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের সঙ্গে দেশের অন্যান্য জেলার ট্রেন যোগাযোগ স্থাপন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার ইচ্ছাশক্তির সফল বাস্তবায়ন এবং সেই সঙ্গে একটি অভাবনীয়, ঐতিহাসিক স্বপ্নের প্রতিফলন! নতুন কাজ করতে যত না সহজ, তার চেয়ে অধিকতর কঠিন পুরোনো কাজকে পুনর্নির্মাণপূর্বক উপযোগী করে তোলা। চট্টগ্রাম টু কক্সবাজার রেললাইন করতে গিয়ে খুব বেশি ভুগিয়েছে দায়িত্বপ্রাপ্তদের। কখনো কখনো কাজটি থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম টু চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী পর্যন্ত আগে থেকেই ৪৮ কিলোমিটারের রেললাইন ছিল। এই লাইনটি ব্রিটিশদের করা। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ১৫০ কিলোমিটার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই লাইনকে সম্প্রসারণ করে সৃদূর কক্সবাজারে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাটি এই সরকারই প্রথম গ্রহণ করে। এটি ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আজ স্বাধীনতার ৫৩ বছরে এসে কক্সবাজারের সঙ্গে সমগ্র বাংলাদেশে ট্রেন যোগাযোগে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হতে দেখে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে অনেকের মতো আমিও সত্যিই গর্ব অনুভব করছি। ব্রিটিশ আমলের পুরোনো লাইন দিয়ে কক্সবাজারের যোগাযোগ স্থাপন করতে গিয়ে কতবার যে জরিপকার্য পরিচালনা করতে হয়েছে, তার হিসাব নেই। পথে পথে যখন জরিপকাজ এবং শেষে জায়গা অধিগ্রহণ করা হচ্ছিল, তখনো পর্যন্ত কারো বিশ্বাসে ছিল  না এই অবিশ্বাস্য ঘটনার আসল রূপটি অতি সহসা ধরা দেবে। এবং একই সঙ্গে চট্টগ্রাম টু দোহাজারী পর্যন্ত পুরোনো নড়বড়ে রাস্তা দিয়ে বৃহত্ পরিসরের ট্রেন চালানো সম্ভব হবে কি না, এটি নিয়েও মানুষের মনে সন্দেহের কমতি ছিল না। কারণ আগে থেকে এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন কয়েক জোড়া লক্কড়ঝক্কড় ট্রেন চলাচল করত। দুর্ভাগ্যের বিষয়, যে ট্রেনগুলো এই লেনে চলাচল করত, তা দিয়ে যাতায়াত করা উপযোগী ছিল না। আমার বাড়ি পটিয়ায় হওয়ার কারণে একসময় ধলঘাট  স্টেশন হয়ে যাতায়াত করতাম। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাড়ি থেকে ট্রেনে করে শহরে যাতায়াত করেছি। এরপর বিগত ৩৩ বছর পর্যন্ত এই রোড দিয়ে আসা-যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তার একমাত্র সমস্যা অনুপযোগী ট্রেন ব্যবস্থাপনা। যেখানে কোনোরকম বসার সুব্যবস্থা  ছিল না, ভাঙাচোরা সিট, ট্রেনের ভিতরে ভূতুড়ে অন্ধকার লাইটিংয়ের ব্যবস্থা ছিল না, দরজা-জানালা নষ্ট, জরাজীর্ণ, অপরিষ্কার, যাত্রী কম্পার্টমেন্টে মালামাল তুলে দেওয়া, যত্রতত্র মলমূত্র পরে থাকা, মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য, যাত্রীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি, আবার চট্টগ্রাম রেল স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়া ও গন্তব্যে পৌঁছার মধ্যে কোনোরকম সময়জ্ঞান না থাকা এ ধরনের প্রচুর সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে এই রোডে যাতায়াতকারী ট্রেন যাত্রীদের। মূলত এসব কারণে সাধারণ যাত্রীরা ট্রেন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রবল আকাঙ্ক্ষার কারণে গত ১১ নভেম্বর কক্সবাজারে দেশের আইকনিক ট্রেন স্টেশন ও রেলযাত্রার শুভ উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে রামু স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছান। এ সময় রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে হাত নেড়ে স্বাগত ও অভিবাদন জানায়। সেদিন পুরো কক্সবাজার জেলা জুড়ে উত্সবের আমেজ সৃষ্টি হয়।  ট্রেন যাত্রার সংবাদ এখন এতদঞ্চলের সবচেয়ে বড় সংবাদ । লাখ লাখ মানুষ ফিরে পাবে রেলের বাহন। এটি ভাবতে নিজের মধ্যে কী যে আনন্দ লাগছে ভাষার প্রকাশ করার মতো নয়।

২০১৮ সালে রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কাজটি ২০২২ সালের ৩০ জুন শেষ করার কথা থাকলেও মাঝখানে কয়েক বছর করোনার কারণে আবারও ধীরগতিতে চলতে শুরু করায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্পের কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন করা হয়। ৫ নভেম্বর পরীক্ষামূলক প্রথম পরিদর্শন ট্রেন কক্সবাজার গমন করেন। ট্রেন যাওয়ার পথে মানুষের কী যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস তা বর্ণনাতীত। কেউ কেউ নেচে-গেয়ে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে মোবাইল ফোনে সেলফি তুলে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ করেছে। এ যেন বাঁধভাঙা আনন্দের জোয়ার! দর্শনার্থীদের ভিড়ের কারণে সেদিন পরিদর্শক টিম অনেক জায়গায় ঠিকমতো পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে হিমশিম খেয়েছে আবার অনেক জায়গায় করতেও পারেনি। আমি বলব, এ প্রকল্প মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার সার্থক প্রতিফলন।

সম্প্রতি কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল নির্মিত হয়েছে। এই দুই রোডই  দক্ষিণ চট্টগ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং একই সঙ্গে ব্যবসায়-বাণিজ্য ও শিল্পোন্নয়নে বিপুল অবদান রাখবে। দক্ষিণ চট্টগ্রাম তথা সুদৃঢ় কক্সবাজার-টেকনাফ পর্যন্ত সরকার ও ব্যক্তিমালিকানায় প্রচুর বড় বড় প্রকল্প ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যেখানে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে বৃহত্ বৃহত্ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু হয়েছে। কক্সবাজারে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত তো আছেই এছাড়া চকরিয়া চিংড়ি প্রজেক্ট ও লবণশিল্পের জন্য বিখ্যাত। মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গড়ে তোলা হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদুেকন্দ্র। আছে চুনতী অভায়রণ্য, ডুলাহাজারা খ্রিস্টিয়ান হাসপাতাল, চন্দনাইশে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, বাঁশখালীতে ইকোপার্ক, বিদ্যুেকন্দ্র, যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ফলে টেকনাফ, কক্সবাজার, চকরিয়া, মহেশখালী থেকে খুব সহজে পণ্যসামগ্রী চট্টগ্রাম শহর হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়বে। এছাড়া আনোয়ারা উপজেলায় কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার (কাফকো), চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার (সিইউফল), পারকী বিচ, কর্ণফুলী উপজেলায় কেইপিজেড ও ইয়ংওয়ানের মতো বিশ্ববিখ্যাত শিল্পপ্রতিষ্ঠান শতাধিক ফ্যাক্টরি খুলেছে যেখানে লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।  পটিয়া ও বোয়ালখালীতেও বহুসংখ্যক পোশাকশিল্পসহ অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও টেকনাফ, কক্সবাজার পর্যন্ত বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। তাই কর্মরত শ্রমিক, কর্মচারী-কর্মকর্তা, দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিক্ষার্থী এবং চট্টগ্রাম শহর তথা বৃহত্তর চট্টগ্রামে ব্যবসায়ী ও অফিস-আদালতে কর্মরতদের সীমাহীন কষ্টের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হতো। এই ট্রেন যোগাযোগের ফলে ব্যবসায়-বাণিজ্য ও নতুন নতুন শিল্পায়নে গতি ফিরে পাবে। 

লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন