রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

শিক্ষাব্যবস্থার পরীক্ষানিরীক্ষার গিনিপিগ শিশুরা

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৪:৪৫

কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নপদ্ধতির স্থলে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু হওয়ায় কোচিং ও মুখস্থ নির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটতে যাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করেছিল। একুশ শতকের বৈশ্বিক মান বজায় রাখার স্বার্থেই এমনটি করার দায় তৈরি হয়েছিল। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোতে মিশ্র অর্থনীতির দেশগুলো, যেমন বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও অন্যান্য বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান যেভাবে একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়ে ও নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রেখে শিশুদের বৈশ্বিক বাজারের উপযোগী ভবিষ্যতের নাগরিক করে তুলতে প্রয়াসী হয়, তার মূল্য অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে বৈশ্বিক দাতা সংস্থা ও দেশীয় সরকারের নানা উদ্যোগের ফলে নানা সময়ে নানা শিক্ষানীতি প্রণয়ন হয়েছে। কিন্তু শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করা যায়নি কখনোই। শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে ব্যর্থ সেসব উদ্যোগে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষায় নানা উল্লেখযোগ্য গুণগত ও পরিমাণগত অর্জন সম্ভব হলেও সাফল্যগুলো ধারাবাহিক নয়। নিম্ন-মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাও অবহেলিত হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। নানা নিরীক্ষার চাপে পিষ্ট কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষার চাপ ও বইয়ের বোঝা তো আছেই।

কোচিংয়ের নামে, গাইডবইয়ের নামে, নানা ফিয়ের নামে বাচ্চাদের শৈশব আনন্দহীন হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকদের অনিশ্চয়তা, শিক্ষকদের সঙ্গে পাঠ্যের সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। ৬৩ হাজারেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন সরকারি। স্কুল ফিডিং, উপবৃত্তির আওতা বৃদ্ধি ইত্যাদি ঝরে পড়ার হার রোধে ভূমিকা রাখছে। তবু ৩০ শতাংশের বেশি স্কুল শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া অগ্রহণযোগ্য। যুগোপযোগী কোনো শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারার উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চেপেছে; প্রচণ্ড মানসিক চাপ, তথাকথিত ভালো রেজাল্ট নিশ্চিত না করতে পারার হতাশা, অভিভাবকের তীব্র অর্থনৈতিক ক্ষতি ও অপচয়। নানা ধারা-উপধারায় বিভক্ত—সাধারণ, ইবতেদায়ী, কিন্ডারগার্টেন, দাখিল, পাঠ্যক্রমের ভিন্নতা, বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম, সরকারি, বেসরকারি, কওমি, মসজিদ, মন্দির ও প্যাগোডা ভিত্তিক শিশুশিক্ষা ইত্যাদির সমন্বয়হীনতা নাগরিকদের মধ্যে শিশুকাল থেকেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরীক্ষা থাকা-না থাকা, এক শিক্ষাবর্ষে একাধিক পরীক্ষা, পিইসি-জেএসসি, কতটুকু হবে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর, শিশুর বয়স নির্ধারণ, বিজ্ঞান-মানবিক-ব্যবসায় প্রভৃতি বিভাজন যা একজন সুস্থ শিশুকে তীব্র চাপের মধ্যে রাখে। এইসব শিক্ষা-সম্পর্কিত নিরীক্ষার বলির পাঁঠা হয়েছে সর্বস্তরের শিশু-কিশোর। বিজ্ঞানভিত্তিক, গণতান্ত্রিক এবং বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগের চাহিদার আলোকে প্রণীত শিশুশিক্ষার কার্যক্রমকে বেগবান করা সময়ের প্রয়োজনীয়তা।

শিক্ষার সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া। সকল স্তরের শিক্ষাবিদ, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। গাইড, নোট, কোচিং ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ও তা কার্যকর করার মাঠপর্যায়িক ব্যবস্থা নিতে হবে। শিশু-মনস্তত্ত্বের সঙ্গে যায় না এমন কোনো প্রকল্প চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। স্কুলগুলোতে শারীরিক শিক্ষা, কারুকলা সবচেয়ে অবহেলিত বিষয় হিসেবে বিবেচ্য। অথচ নৈতিকতা-মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গে সৌন্দর্যের চর্চা আবশ্যক। প্রতিবছর নানা পাবলিক পরীক্ষায় অসাধারণ ফলের সংবাদ পাওয়া যায়। কিন্তু সমাজজীবনে সেরকম উল্লেখযোগ্য অর্জন দেখা যায় না। পাঠ্যপুস্তক নিয়ে বিতর্ক, ব্যবসামুখী শিক্ষার পরিবেশ ইত্যাদি সংকট এক দিনে সমাধান হওয়ার নয়।

প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিরাট এক অংশ যোগ-বিয়োগের মতো গণিত পারে না। ভাষাশিক্ষার অবস্থা সন্তোষজনক নয়। বাংলা পড়তে শেখার আগেই শিশুরা ঝরে যাচ্ছে বা প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক (পঞ্চম শ্রেণি; এখন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে) শিক্ষার দোরগোড়া পেরিয়ে পরবর্তী ক্লাসে চলে যাচ্ছে। ভাষাশিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়ার দরকার রয়েছে। ভাষার বোঝাপড়া ব্যতীত কোনো শিশুই জীবন ও জগত্ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন করতে পারে না। কয়েকটি আদিবাসী ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। নিশ্চিত করতে হবে আনন্দের সঙ্গে শিশুরা ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে কি না। বাল্যশিক্ষার কিছু কিছু বই যেগুলোতে বাংলা, ইংরেজি, আরবি বর্ণমালা ও দিন, মাস, অঙ্কশিক্ষার পাশাপাশি ছড়া ও গল্প থাকে; প্রাথমিকভাবে দেশের বিরাট এক অংশের শিশুরা সেখান থেকেই পড়ালেখা শেখে। অথচ বাজারের চলতি সেসব বইয়ের বিষয়ে কোনো তদারকি নেই। আবার প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর মতো প্রশিক্ষিত প্রয়োজনীয় শিক্ষকেরও রয়েছে নিদারুণ অভাব। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়েই শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে।

বাচ্চাদের সৃজনশীলতাকে উসকে না দিয়ে, মননকে দমিয়ে জাতি তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে না। পরীক্ষা-নোট-কোচিংয়ের পড়াশোনার চাপ থেকে শিশুদের রক্ষা করতে হবে। শিক্ষার সংস্কারের নামে ঘন ঘন নীতিমালা ও পাঠ্য প্রণয়ন করে অনিশ্চয়তামূলক শিক্ষাব্যবস্থার নিরীক্ষার গিনিপিগ যেন শিশুদের না করা 

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন