রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

শিশুদের নিরাপত্তা কোথায়?

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:৩০

আজ যাহারা শিশু, ভবিষ্যতে তাহারাই হইবে দেশ গড়ার কারিগর। প্রত্যেক শিশুর মধ্যে রহিয়াছে বিরাট সম্ভাবনা। আজকের শিশুরাই আগামী দিনে দেশের কর্ণধার। তাহারা দেশ ও জাতিকে আগাইয়া লইয়া যাইবে, উন্নত করিবে শির বিশ্বদরবারে। এই সকল শিশুর বিচরণপক্ষত্র হইতেছে মাতৃক্রোড়, উন্মুক্ত প্রান্তর, শিক্ষাঙ্গন। কিন্তু চরম দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়াও বহু শিশু তাহাদের শৈশব হারাইতেছে। সহিংসতার শিকার হইতেছে। অকালে ঝরিয়া যাইতেছে পৃথিবীর বুক হইতে। বিশ্বনবি মুহাম্মদ (স.) বলিয়াছেন, ‘শিশুরা বেহেশতের প্রজাপতি। প্রজাপতি যেমন তাহাদের সুন্দর শরীর ও মন দিয়া ফুলবনের সৌন্দর্য বর্ধিত করে, তেমনি শিশুরাও তাহাদের সুন্দর মন ও অমলিন হাসি দিয়া পৃথিবীর সৌন্দর্য বর্ধন করে।’ অথচ দেশব্যাপী এই সকল নিষ্পাপ শিশুর প্রতি নানা ধরনের সহিংসতা বাড়িয়া চলিয়াছে, যাহা অত্যন্ত দুঃখজনক।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর হইতে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ৮ হাজার ৮৩২ জন শিশু সহিংসতার শিকার হইয়াছে। যাহার বিপরীতে মামলা হইয়াছে ৪ হাজার ৬৭৫টি; কিন্তু সাজা পাইয়াছে মাত্র ২৪ জন অপরাধী। গত পাঁচ বছরে ২ হাজার ৫৯০ জন শিশুকে হত্যা করা হইয়াছে। ইহা ছাড়াও ধর্ষণের শিকার হইয়াছে ৩ হাজার ৫৯৬ জন এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হইয়াছে ৫৮০ জন। এই উপাত্ত শুধু গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সংখ্যার ভিত্তিতে প্রকাশ করা হইয়াছে। তাহার মানে, প্রকৃত সংখ্যা ইহার চাইতেও অনেক অধিক। মানুষের বিবেকবোধ কতটা লোপ পাইলে, সামাজিক অবক্ষয় কতটা মারাত্মক রূপ ধারণ করিলে তাহারা শিশু হত্যার মতো এমন গর্হিত কাজ করিতে পারে তাহা ধারণার বাহিরে। ভাবিতেও অবাক লাগে, মানুষ এখন কতটা নিষ্ঠুর হইয়া উঠিয়াছে!

শিশুদের প্রতি সহিংসতা বর্তমানে সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হইয়াছে, যাহা খুবই উদ্বেগজনক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহ, প্রতিহিংসা, লোভ-লালসা চরিতার্থ, জায়গাজমি বা সম্পত্তি লইয়া শত্রুতা বা বিরোধ, মুক্তিপণ ও স্বার্থ আদায়, সামাজিক অস্থিরতা এবং অবক্ষয়, মূল্যবোধের অভাব, পিতা-মাতার সম্পর্কের জটিলতা, ব্যক্তিগত আক্রোশ, মানসিক বিষাদ, হতাশা ইত্যাদি কারণে শিশুদের উত্পীড়ন, বলাত্কার ও হত্যা করা হইতেছে। শিশুদের প্রতি এমন সহিংসতা খুবই মর্মান্তিক, যাহা তাহাদের পরিবারকে যেমন বেদনাহত ও ক্ষুব্ধ করে, তেমনি সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষকে স্তম্ভিত করিয়া তোলে। পত্রিকার পাতায় শিশুদের প্রতি সহিংসতার যেই সমস্ত লোমহর্ষক কাহিনি ছাপা হইতেছে, তাহা দেখিলে বাক্রুদ্ধ হইয়া যাইতে হয়। সন্তানহারা পিতা-মাতার কান্না আর আর্তনাদ দেখিয়া চোখের পানি আটকাইয়া রাখা যায় না।

আমাদের দেশে শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে বেশ কিছু আইন রহিয়াছে। শিশুদের সুরক্ষার জন্য এই সমস্ত আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও ব্যবহার নিশ্চিত করিতে হইবে। অনেক সময় অপরাধীরা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকায় আইনি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক গতি পায় না। আইনের ম্যারপ্যাঁচ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার কারণে অপরাধীরা পার পাইয়া যায়। ইহা ছাড়াও অনেক সময় আইনের সঠিক প্রয়োগ ও ব্যবহার না করা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে আসামির শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। দ্রুত বিচারের মাধ্যমে যদি অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়, তাহা হইলে তাহাদের অপরাধ করিবার স্পৃহা কমিয়া যাইবে। দেশকে শিশুর নিরাপদ বসবাসের উপযোগী করিয়া তুলিবার জন্য সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও উদ্যোগ লইতে হইবে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর নির্ভর না করিয়া সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে লইয়া ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়িয়া তুলিবার মাধ্যমে দেশকে শিশুবান্ধব হিসাবে গড়িয়া তুলিতে হইবে। অপরাধীদের ভয়াবহ দানবীয়তা শেষ হইয়া তাহাদের হূদয়ে মনুষত্বের জাগরণ এবং শুভবুদ্ধির উদয় হউক—ইহাই দেশের প্রতিটি শান্তিপ্রিয় নাগরিকের কাম্য।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন