রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

টেস্ট ক্রিকেটে অবিস্মরণীয় জয়

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৫:৩০

সদ্যসমাপ্ত ওয়ানডে ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আশানুরূপ ভালো পারফরম করিতে পারে নাই বটে; কিন্তু ক্রিকেটে দেশের অর্জনকে খাটো করিয়া দেখিবার কোনো সুযোগ নাই। কোনো সন্দেহ নাই, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে অনকে দূর আগাইয়া গিয়াছে টিম টাইগার্স। বিশ্বের প্রথম সারির প্রতিটি দলকে ধরাশায়ী করিয়া জয়ের মুকুট ঘরে তুলিবার রেকর্ড রহিয়াছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের। বিশ্বকাপে খারাপ ফল করিবার হতাশা যখন পুড়াইয়া মারিতেছিল, ঠিক সেই সময়ে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করিলেন টাইগাররা। সাদা পোশাকের ক্রিকেটে কিউইদের বিপক্ষে প্রথম জয়ের স্বাদ পাইল বাংলাদেশ—তাহাও আবার ১৫০ রানের বড় ব্যবধানে। অবাক করিবার ব্যাপার, বিশ্বখ্যাত অলরাউন্ডার ও টেস্ট অধিনায়ক সাকিব আল হাসান, সহ-অধিনায়ক লিটন দাস, অভিজ্ঞ ওপেনার তামিম ইকবাল, তারকা পেসার তাসকিন আহমেদদের মতো দলের প্রথম সারির ক্রিকেটারদের ছাড়াই এমন ঐতিহাসিক জয় ছিনাইয়া আনিয়াছে টাইগার বাহিনী। সেই ম্যাচের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর সেঞ্চুরি ও অধিনায়কত্ব সর্বমহলে প্রশংসিত হইয়াছে। ঐতিহাসিক এই বিজয় সমগ্র বাঙালিকে প্রাণোচ্ছ্বাসে ভাসাইয়াছে স্বভাবতই। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে নূতন এই মাইলফলক অর্জনের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে আমরা প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাই।

স্মর্তব্য, সাদা পোশাকের ক্রিকেটে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক আগাইয়া রহিয়াছে নিউজিল্যান্ড। তবে সিলেট টেস্টে বাংলাদেশের নিকট পাত্তাই পান নাই কিউইরা। তাইজুলের ঘূর্ণিজাদুতে নাস্তানাবুদ নিউজিল্যান্ড দল ঘুরিয়াই দাঁড়াইতে পারে নাই। স্বাভাবিকভাবেই হারের পর টাইগার বোলারদের প্রশংসা না করিয়া পারেন নাই খোদ কিউই অধিনায়ক টিম সাউদিও। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে সাউদি বলিয়াছেন, ‘আমরা নিজেদের হারের কারণ অবশ্যই আলোচনা করিব। তবে আপনাকে পূর্বে দেখিতে হইবে বাংলাদেশের বোলাররা কীভাবে আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করিয়াছে লম্বা সময় ধরিয়া। আমরাও তাহাই করিয়াছি কিছু কিছু সময়। তবে তাহা লম্বা সময় ধরিয়া করিতে পারি নাই।’

নিউজিল্যান্ড অধিনায়কের কথা তাত্পর্যপূর্ণ, বিশেষ করিয়া বাংলাদেশ দলের জন্য। তবে লক্ষণীয়, টাইগাররা বড় বড় দলের বিপক্ষে জিতেন বটে; কিন্তু জয়ের ধারাবহিকতা ধরিয়া রাখিতে পারেন না। কেন এমনটি হয়? বস্তুত, বিপক্ষ দলের উপর ‘চাপ সৃষ্টি’ এবং ‘লম্বা সময় ধরিয়া নিজেদের ধরিয়া রাখা’—এই দুইটি বিষয় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিপক্ষ দলকে কোণঠাসা করিয়া জয় লাভের প্রশ্নে ইহাই আসল কৌশল; কিন্তু দুঃখজনকভাবে এইখানে আমাদের বড় ধরনের ঘাটতি রহিয়াছে। অধিকাংশ ম্যাচে বিপর্যয়ে পড়িয়া খেই হারাইয়া ফালান আমাদের ক্রিকেটাররা। বিপক্ষ দলের উপর চাপ সৃষ্টি তো দূরের কথা, নিজেরাই অনুভব করেন ‘কঠিন চাপ’। সবচাইতে বড় কথা, জয়ের ধারা বজায় রাখিবার প্রশ্নে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অবস্থান বেশ খানিকটা পিছনে। ভাবিতে হইবে, কীভাবে এইখান হইতে উত্তরণ ঘটানো যায়। এই জয়ের পরও বিগত সময়ের ন্যায় দল হারাইয়া যাইবে না, তথা জিতিবার ‘কনফিডেন্স’ ধরিয়া রাখিবে বলিয়া আমাদের প্রত্যাশা রহিল।

ক্রিকেটে বাংলাদেশের অর্জন কী, এই হিসাব না করিয়া বরং দেখিতে হইবে কী অর্জন করেন নাই আমাদের খেলোয়াড়রা। আইসিসির সকল ধরনের দলীয় র্যাংকিংয়ে আমরা উপরের দিকেই থাকিতেছি বিগত কয়েক বত্সর ধরিয়া। তবে যেইহেতু ভালোর কোনো শেষ নাই, তাই আগাইয়া যাইতে হইবে দৃঢ়চিত্তে। বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডারই শুধু নহে, নূতন নূতন উদীয়মান খেলোয়াড় সকল ধরনের ফরম্যাটে ভালো করিতেছেন—বেশ ভালোই করিতেছেন বলিতে হইবে। এই সকল তরুণ ক্রিকেটার ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের নেতৃত্ব দিবেন বিধায় তাহাদেরকে অধিক পরিচর্যায় গড়িয়া তুলিতে হইবে। কোনো সম্ভাবনা যেন অকালে ঝরিয়া না পড়ে, সেই ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সদা যত্নবান হইতে হইবে।

বিশ্বকাপে দলের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক, তথাপি হতাশা ঝাড়িয়া জয়ের দেখা পাইয়াছেন টাইগাররা। ‘আশা’ খুঁজিতে হইবে এইখানেই। সকল ধরনের সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকিয়া এই জয়ের ধারা অব্যাহত রাখিতে হইবে। সত্যিকার অর্থেই দেশ-বিদেশের কোটি কোটি বাঙালি ক্রিকেটপ্রেমী বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের উত্সাহ-উদ্দীপনার কেন্দ্রস্থল। আবার কোনো একটি ম্যাচে খারাপ করিলে কঠিনভাবে সমালোচনা করিতেও ছাড়েন না তাহারা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের আবেগ-অনূভূতি তো এইখানেই! ইহাই বাংলাদেশের ক্রিকেটের আগাইয়া যাওয়ার মূল শক্তি। এই শক্তিতে বলীয়ান হইয়া ভবিষ্যতে টিম টাইগার্সের নিপুণ পারফরম্যান্সে নূতন নূতন সাফল্য অর্জিত হইবে—ইহাই আমাদের কামনা।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন