শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ভোটের জ্বর ও ভূমিকম্পের ডর

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ০২:২৪

ডিসেম্বরের শুরু থেকে শীতের ঠান্ডার মধ্যে ভোটের জ্বর সারা দেশে কিছুটা উত্তাপ ছড়িয়েছে। ভোটজ্বরের উত্তাপে কেউ বিচলিত, কেউ আন্দোলিত। এরই মধ্যে ডিসেম্বর ২ তারিখ সকাল ৯.৩৫ মিনিটে সারা দেশব্যাপী বেরসিক ভূমিকম্প ৫.৬ মাত্রার প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে সবার মনে অজানা আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

জানা যায়, চলতি বছরে ১২টি এবং গত ১৫ বছরে ১৪১টি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে আমাদের দেশে। এটা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। এমনকি এ বছরের অন্য ভূমিকম্পগুলোর মাত্রা ডিসেম্বর ২ তারিখের মতো এত শক্তিশালী ছিল না। রাজধানীর একজন বহুতলের বাসিন্দা লিখেছেন, আমাদের ভবনটি পেন্ডুলামের মতো কয়েক বার দুলে উঠলে আতঙ্কে ঘরের বাইরে বের হয়ে পড়ি। রাজশাহীর একজন বলেছেন, যেন প্রতিদিনের মতো ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সকালের প্লেনটা আমাদের বাড়িতে এসে আছড়ে পড়ল। নোয়াখালীতে একটি বাড়ির চার দিকের দেওয়ালে এবং কুমিল্লায় একটি পোশাককারখানায় আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে ৯০ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ছাত্রহলে ফাটল দেখা দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে এক ছাত্রের পা ভেঙে গেছে।

গত সেপ্টেম্বর ২, ২০২৩ তারিখের ভূমিকম্পের কিছুদিন আগে সিলেট এলাকায় দিনে আট বার পর্যন্ত ভূকম্পন অনুভূত হওয়ায় মানুষের মনে মহা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। সিলেট থেকে ঢাকা বেশি দূরে নয়। তাই ঢাকাবাসীর মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের দেশে ভূমিকম্পের ভয়ে যেমন আতঙ্ক লক্ষ্যণীয়, বর্তমানে উন্নত বিশ্বে তেমন আতঙ্ক দেখা যায় না। প্রযুক্তির চরম উত্কর্ষের যুগে বিজ্ঞ মানুষ বড় বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে ঠেকানোর নানা কৌশল অবলম্বন করে চলেছে। দ্বীপদেশ জাপানে অনেকগুলো সুপ্ত ও জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে। ফলে প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কমবেশি ভূকম্পন হয়ে থাকে। বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে তাত্ক্ষণিকভাবে কী করতে হবে তাদেরকে ছোটবেলা স্কুলেই শেখানো হয়। ভূমিকম্পপ্রবণতা বেশি হওয়ায় জাপানিরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে বহু গবেষণা করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ায় জানমালের তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই এই ভয়ংকর দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে।

সিসমিক ভালনেরাবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট অব বিল্ডিং অব ঢাকা আয়োজিত এক সেমিনারে বলা হয়েছে, ‘সাত-আট মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৩০ লাখ মানুষ মারা যাবে।’ সাত মাত্রা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে এমন ভবন ঢাকায় খুব কম। এছাড়া ঢাকায় ভূমিকম্পের প্রাণহানির মূলে থাকবে আগুন। ভূমিকম্পে গ্যাসলাইন বিস্ফোরিত হবে। গ্যাস ও বিদ্যুতের বড় আগুন জ্বললে মানুষ পুড়ে মারা যাবে। নগরে হঠাত্ বন্যা হবে। বিদ্যুতের তার পানিতে পড়ে মানুষ বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হবে। অন্ধকারে ডুবে যাবে শহর। রাস্তা ডুবে ব্লক হয়ে যাবে। খাওয়ার পানির সংকট হবে। অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারবে না। ইন্ডিয়া, ইউরেশিয়া, বার্মা—এই তিনটি গতিশীল প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশ। তাই একটি জোরালো ভূকম্পনের শক্তি জমা হয়ে আছে এখানে।

ভূমিকম্পের পূর্বাভাস জানার কৌশল এখনো আবিষ্কৃত না হওয়ায় অন্যান্য দুর্যোগের মতো এর বিরুদ্ধে আগাম কর্মসূচি নেওয়ার উপায় নেই। প্রয়োজন শুধু সতর্কতা। শক্তিশালী ভূমিকম্প সহনশীল ভিত্তির যথাযথ টেস্ট পাশ না করলে ঢাকাসহ দেশের আর কোথাও কোনো উঁচু ভবন বানানোর অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। ভুয়া, অবৈধ অনুমতি ঠেকানোর জন্য সর্বাগ্রে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বাচ্চাদের জানানোর জন্য জাপানের মতো স্কুল থেকে সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া দরকার। তাছাড়া প্রতিটি স্কুল, অফিস, মহল্লা সব জায়গায় প্রতি মাসে বা তিন মাসে একবার ভূমিকম্প সচেতনতার মহড়া দেওয়া উচিত। প্রতি এলাকায় কিশোর-যুবকদের নিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সরঞ্জামসহ ভূমিকম্প উদ্ধারকারী টিম তৈরি করা প্রয়োজন। প্রতিটি ক্লাবেও বাধ্যতামূলকভাবে ভূমিকম্প উদ্ধারকারী টিম তৈরি ও বিপদের সময় এক হুইসেলে সাহায্যের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কারণ, তাত্ক্ষণিকভাবে তো আর ইন্টারনেটের সংযোগ খুঁজে পাওয়ার উপায় থাকবে না। সেজন্য জরুরি ভিত্তিতে যে কোনো আহ্বানে দ্রুত সাড়া দেওয়ার মানসিকতা তৈরিমূলক কর্মসূচি এখনই নিতে হবে ও সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

কিন্তু এত সতর্কতামূলক বিষয় জানা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনি ডামাডোলের মধ্যে যদি সাত মাত্রার ম্যাগনিচ্যুড বা তার চেয়ে বেশি কিছু ঘটে গিয়ে বিপত্তি বাধায়, তাহলে সেটা সামাল দেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি কোথায়? একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, সহমর্মিতা হারিয়ে অজানা জ্বরের ‘ডর’ নিয়ে কোনো জাতি কি সামনে এগিয়ে যেতে পারে? তাই নির্বাচনি উত্তাপ তথা ভোটের জ্বর সর্বজনীন বা ‘সর্বভোটার’ ভিত্তিতে হওয়াই কি কাম্য নয়? তাহলে এই গণতান্ত্রিক শিক্ষা প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প বা যে কোনো মহা দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে সবাইকে রেসকিউ করার মতো প্রস্ততি নিতে প্রেরণা জোগাবে।

লেখক :রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন