পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিপক্ষে আক্কাস-লাভলুর তৎপরতা, দলীয় কর্মীদের ক্ষোভ

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ২১:১৭

রাজশাহীর সবকটি সংসদীয় আসনে নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। বিশেষ করে রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের মনোনীত প্রার্থী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের প্রতিপক্ষ হয়ে আবারও ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছেন চারঘাট উপজেলার রায়হানুল হক এবং বাঘার দুই নেতা অ্যাডভোকেট লায়েব উদ্দিন লাভলু ও মেয়র আক্কাস আলী।

এই তিন নেতার মধ্যে এবার মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন রায়হানুল হক রায়হান। তিনি এর আগের নির্বাচনেও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে ছিলেন। তবে দলীয় নির্দেশনা ও কেন্দ্রীয় কোনো কর্মসূচি পালন না করাসহ এলাকার লোকজনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় দূরত্ব রাখার কারণে সাধারণ মানুষ এবং আওয়ামী লীগের কর্মীরা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে ক্লিন ইমেজের পরীক্ষিত প্রার্থী শাহরিয়ার আলমের দিকে ঝুঁকছেন। এর মধ্যে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে যে আক্কাছ আলী রায়হানুল হকের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিএনপির কবির হোসেনকে বিজয়ী করে ছিলেন। সেই আক্কাসই এবার প্রকাশ্যে রায়হানুল হক রায়হানের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন। 

এদিকে বাঘা উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট লায়েব উদ্দিন লাভলু এখন পর্যন্ত নৌকার পক্ষে ভোট না চাইলেও তার কর্মী-সমর্থকরা রায়হানুল হক রায়হানের দিকেই ঝুকছে বলে অভিযোগ করেছেন তৃণমূলসহ দুই উপজেলার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এ কারণে স্থানীয়ভাবে সাধারণ মানুষ তার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন। 

লোকজন বলছেন, এসব ব্যক্তি আওয়ামী লীগের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দুষমন। এ সকল নেতাদের কারণে রাজশাহীর বাঘায় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীন কোন্দল লেগেই ছিলো। শাহরিয়ার আলম এসব কোন্দল অনেকটা নিরসন করলেও লায়েব উদ্দিন লাভলুদের কারণে কোন্দল পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না।

বাঘার প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, এ উপজেলায় দীর্ঘকাল ধরেই পৃথক ব্যানারে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন অ্যাডভোকেট লায়েব উদ্দিন লাভলু ও আক্কাছ আলী। তাদেরকে এক কাতারে মিলিত করেছিলেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। এরপর এদের মধ্যে মেয়র হয়েছেন আক্কাছ আলী আর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন লায়েব উদ্দিন লাভলু। পরবর্তীতে এই দুই নেতা এক হয়ে পদপদবী বাগিয়ে এখন আবার নৌকার বিপক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। 

রাজশাহীর চারঘাট ও বাঘার আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শাহরিয়ারের দূর্গে দলীয় মনোনয়ন কিনে ছিলেন তিন নেতা। এরা হলেন বাঘা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট  লায়েব উদ্দিন লাভলু, বাঘা পৌর মেয়র আক্কাস আলী ও চারঘাট উপজেলা থেকে সাবেক সংসদ সদস্য রায়হানুল হক রায়হান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ও দুই উপজেলা আওয়ামী লীগের সমর্থনে চতুর্থবারের মতো দলীয় মনোনয়ন নৌকা পেয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। ফলে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত চারঘাট উপজেলার বাসিন্দা রায়হানুল হক রায়হান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন ফরম উত্তোলন ও জমা দিয়েছেন। আর তার পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় নেমেছেন আক্কাছ আলী ও বাঘা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান লায়েব উদ্দিন লাভলুর কর্মী-সমর্থকরা। 

জানা গেছে, শাহরিয়ার আলম মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্য ৩০ নভেম্বর লায়েব উদ্দিনকে ডাকার পরেও তিনি যাননি। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৃণমূল আওয়ামীলী লীগের নেতাকর্মী। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, এই দুই নেতা (আক্কাস-লাভলুর) রাজনৈতিক খেলা শুরু হয় ২০১৪ সালে। সেইবার রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক লায়েব উদ্দিন লাভলু, বাঘা পৌর মেয়র আক্কাছ আলী, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস সরকার এবং জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আমানুল হাসান দুদু জাতীয় নির্বাচনে জনপ্রিয় নেতা আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী শাহরিয়ার আলমের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য রায়হানুল হক রায়হানের পক্ষে ছিলেন। পরে আব্দুল কুদ্দুস সরকার নিজের অপরাধ বুঝতে পারার পর শাহরিয়ার আলমের কাছে ক্ষমা চেয়ে তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। 

তবে ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয় ওই নির্বাচনের পর উপজেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে। সেখানে শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে দূরত্ব সৃষ্টি হয় আক্কাস আলীর। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাধারণ সম্পাদক পদে আক্কাস আলীকে পরাজিত করা হয়। এরপর ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাঘা পৌর সভার ভোটে আবারও পরাজিত হন আক্কাস আলী। এতে করে জনপ্রিয়তা হারান তিনি। 

সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চান এই দুই নেতা আক্কাস ও লাভলু। এরপর তারা মনোনয়ন না পেয়ে শাহরিয়ার আলমের বিপক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। সেইবার বিদ্রোহী প্রার্থী হন রায়হানুল হক রায়হান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উন্নয়নের ধারবাহিকতা ও তৃণমূল আওয়ামী লীগের ভালোবাসায় আবারও শাহরিয়ার আলমই বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগ মনোনীত বাঘা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট লায়েব উদ্দিন লাভলুর সঙ্গে সোমবার একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার ফোন রিসিভ করেননি। 

দলীয় প্রার্থী শাহরিয়ার আলম উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় জানান, নিজেদের স্বার্থে আঘাত হানলে চারঘাট-বাঘার তিন নেতা সব সময় নৌকার বিপক্ষে অবস্থান নেন। এদিক থেকে এবারও নির্বাচনের নীতিমালা ভঙ্গ করে দুই নেতা যথাত্রমে রায়হানুল হক ও আক্কাছ আলী একসঙ্গে প্রচারণায় নেমেছেন। 

বাঘা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভেকেট লায়েব উদ্দিন লাভলুকে মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্য ডেকে ছিলাম। তিনি আমাকে বলেছেন, আপনি জমা দেন। এখনো সময় আছে। তবে এ সমস্যা শুধু রাজশাহী-৬ আসনই নয়, এমনভাবে দলীয় কোন্দাল ক্রমেই জিইয়ে উঠছে এখন রাজশাহীর সবকটি আসনে।

ইত্তেফাক/পিও