রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

শান্তি কি অধরাই থাকিবে?

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৬:৩০

কবি বলিয়াছেন যে, এই পৃথিবী মানবের তরে, দানবের তরে নহে; কিন্তু কবি যতই মানবতা ও বিবেকের কথা বলুন, তাহাতে যুদ্ধবাজদের কিছুই যায় আসে না। কথায় বলে, চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনি। যাহারা যুদ্ধবাজ ও আধিপত্যবাদী, তাহাদের নিকট ধর্ম ও নীতি-নৈতিকতার কথা মূল্যহীন। বিশ্বব্যবস্থার এক ক্রান্তিলগ্নে ও বিশৃঙ্খল মুহূর্তে সমগ্র পৃথিবীটা যেন কেমন নিষ্ঠুর ও নির্মম হইয়া গিয়াছে! ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধেও আমরা ফিলিস্তিনের গাজায় মানবতার কবর রচিত হইতে দেখিতেছি। ফিলিস্তিন গত এক বত্সর ধরিয়াই ছিল অশান্ত, অধিকতর অস্থিতিশীল। আর এখন বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত ও বিরান ভূমি। সমগ্র পৃথিবীর মানুষ তাহাদের অর্ধশতাব্দী ধরিয়া চলা সংকটের কোনো সুরাহা করিতে পারিল না! এই ব্যর্থতা যেমন জাতিসংঘের, তেমনি এই গ্রহে বসবাসকারী প্রত্যেক মানুষেরও বটে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাবাসী আর্তনাদ করিয়া চলিয়াছেন; কিন্তু তাহাদের এই আহাজারি বিশ্বনেতাদের কর্ণকুহরে পৌঁছিতেছে বলিয়া মনে হয় না। এমনকি এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করিয়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় বড় বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হইয়াছে। অথচ শান্তিকামী মানুষের যুদ্ধবন্ধের আহ্বানকে কোনো তোয়াক্কাই করা হইতেছে না। উপরন্তু অর্থ ও অস্ত্র দিয়া সহযোগিতা করিবার ঘটনাও ঘটিতেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ বন্ধে অনুষ্ঠিত হইয়াছে বৃহত্তর গণসমাবেশ। তাহারা গাজাবাসীর প্রতি নৃশংসতাকে গণহত্যার সহিত তুলনা করিয়াছেন। তাহারা বলিয়াছেন যে, ৭০ বত্সর পর্যন্ত ফিলিস্তিনিরা তাহাদের স্বাধীনতা অর্জন করিতে পারেন নাই। তাহাদের কথা শুনিবার এখনই সময়। গাজায় যুদ্ধবিরতির দাবিতে লন্ডন, বার্লিন, প্যারিস, ইতালিসহ ইউরোপ জুড়িয়াই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হইয়াছে। বিক্ষোভ হইয়াছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মুসলিম বিশ্বেও। এমনকি খোদ ইসরাইলেও যুদ্ধবন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হইয়াছে। এখনো বিশ্বের আনাচকানাচ শান্তিকামী মানুষের প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রহিয়াছে।

গাজায় নৃশংস এই হত্যাযজ্ঞের শেষ কোথায়? সর্বশেষ খবর অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর গাজায় ইসরাইলি বর্বরতা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে। চালানো হইয়াছে বাংকার বাস্টার বোমাহামলা। ইহাতে এক দিনেই নিহত হইয়াছে ৭০০ ফিলিস্তিনি। ইহার অধিকাংশই নারী ও শিশু। দক্ষিণ গাজায় ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছাড়িয়া চলিয়া যাইবার কথা বলিয়া এখন সেইখানেই শক্তিশালী বোমাবর্ষণ চলিতেছে। অসহায় ফিলিস্তিনিদের এখন মিশরের দিকে ঠেলিয়া দেওয়ার চেষ্টা চলিতেছে। ইহাতে সেইখানে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হইয়াছে। সেইখানকার হাসপাতালগুলির অবস্থা এখন আরো নাজুক। ইতিমধ্যে গাজার ১৫ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হইয়াছেন। বেসামরিক মানুষ, আবাসিক এলাকা, উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি শরণার্থী শিবির ও হাসপাতালে হামলা চালানো অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। ইহা মানবাধিকারের চরম সীমা লঙ্ঘন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলি হামলায় ১৫ হাজার দুই শতেরও অধিক ফিলিস্তিনি নিহত হইয়াছেন। আহত হইয়াছেন ৪০ সহস্রাধিক। উত্তর গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করিবার পর এখন দক্ষিণ গাজায় হামলা চালানো হইতেছে নির্বিচারে। কোথাও কোথাও সম্পূর্ণ এলাকা ধুলার সহিত মিশাইয়া দেওয়া হইয়াছে। স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করিয়া দেখা যায়, গাজা জুড়িয়া অন্তত ৯৮ হাজার ভবন বিধ্বস্ত হইয়াছে।

গাজাতে যাহা ঘটিতেছে তাহা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এই রকম নির্মম ও নৃশংস মৃত্যুর ঘটনা একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়াও দেখিতে হইবে, তাহা আমরা ভাবিতে পারি নাই। নৃশংস হামলার দৃশ্য আন্তর্জাতিক চ্যানেলে দেখিয়া আমরা শোকে নিস্তব্ধ ও পাথর হইয়া যাইতেছি। বর্তমান বিশ্বে কোনো পক্ষই যুদ্ধে জয়লাভ করিতে পারে না। আফগানিস্তান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন প্রভৃতি দেশ তাহার প্রমাণ। সেই সকল দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়া ইহাই প্রমাণিত হয় যে, যুদ্ধে বারংবার মানবতারই পরাজয় হয়। শিশু ও নারীসহ লক্ষ লক্ষ বনি আদমের মৃত্যুর বিভীষিকা, অগণিত পঙ্গু মানুষের ভুবনবিদারী আর্তনাদ ছাড়া যুদ্ধে তেমন কিছুই অর্জিত হয় না। অতএব, গাজা ও ইউক্রেনে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ হউক, সর্বত্র মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হউক—ইহাই আমরা প্রত্যাশা করি।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন