রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

মফস্বলে সরকারি চিকিৎসাসেবার উন্নয়ন দরকার

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৬:৩০

আমাদের স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক এখন কেবল বৃহত শহর-নগর তথা বিভাগ কিংবা জেলায় সীমাবদ্ধ নাই। উহা সম্প্রসারিত হইয়াছে উপজেলা হইতে পল্লি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পর্যন্ত। প্রতিটি স্থানে রহিয়াছে চিকিৎসকের পদও। কিন্তু সেই সকল স্থানে নিয়োগকৃত চিকিৎসকদের মধ্যে রাজধানী কিংবা সুবিধামতো শহরাঞ্চলে বদলির অবিরাম চেষ্টা চালাইবার প্রবণতা দৃষ্টিগোচর হইয়া থাকে। অনেকে কর্মস্থলে অবস্থান করেন না। কর্মস্থলে অনুপস্থিতির জন্য বিচ্ছিন্নভাবে তাহাদের শাস্তিও দেওয়া হয়। তথাপি অবস্থা অপরিবর্তিতই রহিয়া গিয়াছে। মফস্বলে চিকিৎসকদের আকাল ঘুচিবে—ইহা যেন চিরস্থায়ী দুরাশায় পরিণত হইয়াছে!

মফস্বলের প্রতি চিকিৎসকদের অনীহার চিত্র কতটা ব্যাপক, দেশের একটি জেলার স্বাস্থ্যসেবার দিকে দৃষ্টি দিলেই তাহা পরিষ্কার হইবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আদর্শ মান অনুযায়ী, প্রতি হাজার জনসংখ্যার জন্য এক জন চিকিৎসক থাকা দরকার। অথচ বাগেরহাট জেলায় জনসংখ্যা ও চিকিৎসকের আদর্শ অনুপাত ১১৬০৫ :১। এই জেলার প্রায় সকল ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে  অধিকাংশ পদই শূন্য। জেলার সদর হাসপাতালের চিত্রও অতি করুণ একইভাবে। এইখানে দৈনিক গড়ে রোগী আসে ১ হাজার ১০০ জন, কিন্তু চিকিৎসক উপস্থিত থাকেন বড়জোর আট জন। অর্থাৎ, একজন রোগী চিকিৎসকের নিকট হইতে দুই মিনিটেরও কম সময় পায়। এই জেলায় চিকিৎসকের পদ ৩১০, কিন্তু কর্মরত রহিয়াছেন ১৪২ জন। তাহার উপর আবার অনেকে আছেন প্রেষণে। নার্স ও টেকনিশিয়ানদের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা অনুরূপ।

অস্বীকার করিবার উপায় নাই, দেশের প্রতিটি মফস্বল অঞ্চলে চিকিৎসাসেবার প্রশ্নে এইরূপ চিত্রই বিরাজ করিতেছে। প্রত্যন্ত পল্লির জনগণ চিকিৎসকদের সেবা পাইয়া থাকেন অতি নগণ্য হারে। ইহা আসলেই হতাশাব্যঞ্জক। বস্তুত, মফস্বলে নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাইয়া প্রেষণ, সংযুক্তি ইত্যাদির নামে চলিয়া যান রাজধানীসহ বৃহত শহর-নগরের নামীদামী হাসপাতালে। এই প্রবণতা বন্ধে বহু কথা বলা হয় বটে, এমনকি এই ব্যাপারে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হইতেছে না। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গিয়াছে, রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলিতে নির্ধারিত পদের দ্বিগুণ বা তাহারও অধিক চিকিৎসক ‘কর্মরত’ থাকেন। ইহার কারণ, মফস্বলের তুলনায় এইখানে ‘পেমেন্ট’ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অধিক পান তাহারা। আছে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের অবারিত সুযোগ। প্রশ্ন হইল, এইখানেও কি আমরা সত্যিকার অর্থে চিকিৎসকদের নিকট হইতে সেবা গ্রহণের সুযোগ পাইতেছি? সেবাবঞ্চিত মফস্বলবাসী কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবার আশায় ভিড় জমান এই সকল চিকিৎসালয়ে। ইহার ফলে সেবার গুণমান লইয়া প্রশ্ন থাকিয়াই যায় স্বাভাবিকভাবে। সন্দেহ নাই, চিকিৎসকদের মফস্বলে থাকিবার চরম অনীহাই ইহার জন্য দায়ী। এইভাবে চলিতে পারে না কোনোমতেই। বাস্তবতা হইল, জেলা এবং উপজেলার হাসপাতালগুলির সেবার মান ক্রম নিম্নমুখী। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা ‘চেম্বার ব্যবসার স্বার্থে’ উপেক্ষা করিয়া চলিয়াছেন নিজেদের মৌলিক দায়দায়িত্ব। সেইখানে নামমাত্র চিকিৎসার ব্যয়ও অতি উচ্চ, যাহা বহন করিবার সাধ্য থাকে না প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজনের। অর্থাৎ, সমাজের ভাগ্যবঞ্চিত হতদরিদ্র শ্রেণি কার্যকর চিকিৎসাসেবার বাহিরে থাকিয়া যাইতেছে সর্বক্ষেত্রেই। আর ইহারও উৎপত্তির কারণ মফস্বলে চিকিৎসকদের থাকিতে না চাওয়া।

যত সমালোচনাই করা হউক, চিকিৎসকেরা সমাজের অতি প্রয়োজনীয় একটি অংশ। কঠোর পরিশ্রম করিয়াই তাহারা চিকিৎসক হইয়া উঠেন। তবে অধিক সুযোগ-সুবিধার আশায় মফস্বলে তাহাদের থাকিতে না চাওয়ার প্রবণতা গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। এই ক্ষেত্রে প্রয়োজনবোধে মফস্বলে চিকিৎসকদের জীবনধারণ ও কর্মপরিবেশ আরও উন্নত করাসহ টিকসই ব্যবস্থা প্রণয়নের বিষয়ে অধিক উদ্যোগী হইতে হইবে। উল্লেখ করা আবশ্যক, জেলা-উপজেলায় অন্য পেশার সরকারি কর্মকর্তারা থাকিতে পারিলে চিকিৎসকগণ পারিবেন না কেন? তাহাদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়িতেছে। এমতাবস্থায় হেলথ প্রমোশন কার্যক্রম জোরদারের স্বার্থে মফস্বল চিকিৎসাসেবার প্রতি নজর দেওয়া জরুরি হইয়া উঠিয়াছে। প্রান্তিক মানুষ যেন কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা হইতে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যে মফস্বলে চিকিৎসকদের ধরিয়া রাখিবার ব্যাপারে নূতন করিয়া চিন্তাভাবনা করিতে হইবে। ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে যাহাতে চিকিৎসকদের বসিবার জায়গাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি থাকে, তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে। মোদ্দা কথা, গ্রামাঞ্চলে প্রান্তিক মানুষের সরকারি চিকিৎসা লাভের ক্ষেত্রে হাহাকার অবশ্যই দূর করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন