শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

কুটিরশিল্পের উন্নয়নে আমাদের করণীয়

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৫:৩০

কুটিরশিল্প আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত করার গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির মধ্যে একটি। বেকারদের অবসর সময়ের সামান্য আয় পারিবারিক সচ্ছলতা অর্জনের জন্য কুটিরশিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই কুটিরশিল্প উন্নয়নের জন্য ব্যক্তিগত কিংবা দলগত এবং সরকারি উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। দেশকে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দ্বিমত নেই। তবে উত্পাদনের অংশীদার থেকে কোনো শিল্পকে বিরত কিংবা অবলুপ্তির মাধ্যমে তা করা উচিত নয়। একসময়ের ঐতিহ্যলালিত এ দেশের কুটিরশিল্পকে রক্ষার জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে :

১. কাঁচামালের জোগান ও উত্পাদনকে আধুনিক ও রুচিশীল করার জন্য কিছু কিছু যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়। কারিগরদের চাহিদানুসারে এসব যন্ত্রাংশ সহজলভ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। তা ছাড়া কাঁচামালের জোগানও নিশ্চিত করা দরকার। গ্রামের ধনী মহাজনদের দ্বারা যেন এসব মালামাল মজুত হতে না পারে, তার প্রতি প্রশাসনিক সুদৃষ্টি থাকা আবশ্যক ।

২. বিদ্যুত্ উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য বিদ্যুতের বিকল্প নেই। বিদ্যুত্শক্তির অর্থনৈতিক ব্যবহারের সঙ্গে উন্নয়নঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত থাকার বহু কারণগুলোর মধ্যে শক্তিসম্পদ হলো একটি। এ দেশের ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পসমূহ প্রধানত পল্লি অথবা শহরতলিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। তাছাড়া কোনো দ্রব্য একান্তভাবে ঘরে বসেই তৈরি করা হয়। উভয় ক্ষেত্রে বিদ্যুতের ব্যবহার নানাভাবে প্রয়োজন হয়। তাই পল্লি বিদ্যুতায়ণের কর্মসূচি দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন একান্ত অপরিহার্য।

৩. মূলধন সরবরাহ ও উন্নয়নের জন্য মূলধন অপরিহার্য। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে পুঁজি বিনিয়োগকারীদের পর্যাপ্ত ঋণপ্রদান করা উচিত। তাতে বিনিয়োগকারীরা নিজ নিজ পণ্যের গুণমান বৃদ্ধি ও উত্পাদনের লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে।

৪. পণ্যের কাঠামোগত পরিবর্তন ও বিজ্ঞানের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মুনাফার রুচিতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এটি একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। কুটিরশিল্পকে ক্রেতার রুচি অনুসারে পরিবর্তন ও গতিশীল করা বাঞ্ছনীয়। এতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এ শিল্প পণ্যের চাহিদা অপরিবর্তিত রাখার সুযোগ থাকবে ।

৫. সংরক্ষণ নীতি ও বাংলাদেশের মতো উন্নয়শীল দেশে উত্পাদন বৃদ্ধি তথা শিল্প উন্নয়নের জন্য সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ অপরিহার্য। অভ্যন্তরীণ ভারী শিল্প ছাড়াও আমদানিকৃত বিদেশি পণ্য এ সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্পের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই দেশীয় শিল্প উন্নয়নের জন্য সরকারকে বিদেশি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত কর ধার্য, সীমিত আমদানি ও স্থানীয় বাজারে বিদেশি পণ্য বিক্রি নিরুত্সাহিত করতে হবে। এতে স্থানীয় শিল্পসমূহ বিদেশি পণ্যের জোর প্রতিযোগিতার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারবে।

৬. কুটিরশিল্পের উন্নয়নের জন্য গ্রামের কারিগরদের প্রশিক্ষণ প্রদান অপরিহার্য। বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণকেন্দ্র গঠন করে আগ্রহী কারিগরদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি করা দরকার। এতে দেশের বেকার যুবসমাজ স্বল্প পুঁজিতে নিজেদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে পারবে।

৭. কুটিরশিল্পের উন্নয়নের জন্য সমবায় সমিতি গঠনের প্রয়োজন রয়েছে। উত্পাদকরা যেন মালিক-মহাজনদের দ্বারা শোষিত না হয়, সেজন্যই সমিতি গঠন করা উচিত। তা ছাড়া পণ্যের ন্যায্যমূল্য লাভ, সমবায় বাজার সৃষ্টি, কাঁচামাল সংগ্রহ ইত্যাদির জন্য কারিগরদের যৌথ সমবায় থাকা বাঞ্ছনীয়।

৮. উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখার জন্য দেশের শহর ও গ্রামের মধ্যে ভালো যোগাযোগ থাকা উচিত। এতে পণ্য স্থানান্তরের কাজটি খুব দ্রুততার সঙ্গে করা যায়। ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকবে এবং ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সমতা বিরাজ করবে। মুদ্রাস্ফীতি রোধসহ দেশের কুটির ও ক্ষুদ্রায়তন শিল্পের উত্পাদনকারীরা নিজ নিজ পণ্যের উপযুক্ত মূল্য লাভ করে অধিক মুনাফার আশায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবে।

৯. দেশের কুটিরশিল্প পণ্যকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য ব্যাপক প্রচারের প্রয়োজন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বাণিজ্য মেলায় এসব পণ্যের নমুনা প্রদর্শনের মাধ্যমে ক্রেতাদের আগ্রহ সৃষ্টি করাতে হবে। তাছাড়া সরকারি প্রচারমাধ্যমসমূহের দ্বারা প্রচারণা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

১০. কুটিরশিল্পের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজার সৃষ্টি করা উচিত। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত মালামাল নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করার প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশের অনেক পণ্যের গুণমান ইতিমধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রির আশায় সাধারণ কারিগররা আগ্রহী হয়ে উত্পাদন বৃদ্ধি করবে।

১১. বৃহদায়তন শিল্পের প্রতিযোগিতা হ্রাস করতে হবে। কোনো একটি জিনিসের চাহিদা কুটিরশিল্পের মাধ্যমে পূরণ সম্ভব হলে সেই জিনিস উত্পাদনের জন্য বৃহদায়তন শিল্পকে অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ কোনো কারণে বৃহদায়তন শিল্প প্রতিষ্ঠা করা হলে সেক্ষেত্রে উত্পাদিত দ্রব্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির জন্য উত্সাহিত করা উচিত । এর ফলে ক্ষুদ্র্র ও কুটিরশিল্পসমূহ প্রতিযোগিতার হাত থেকে পরস্পরকে রক্ষা করবে ।

উপরিউক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে আমরা আশা করি, বাংলাদেশে কুটিরশিল্পের বিকাশ ত্বরান্তিত হবে। কুটিরশিল্প যেহেতু ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক, তাই দেশে বেকার সমস্যারও সমাধান হবে বহুলাংশে। এ ব্যাপারে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

লেখক: ব্যবস্থাপক, জনসংযোগ উপবিভাগ, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন