রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

মহামানবেরা সকলকে লইয়াই পথ চলিতে চাহেন

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:০০

‘কালো আর ধলো বাহিরে কেবল, ভিতরে সবারই সমান রাঙা। জগত্ জুড়িয়া এক জাতি আছে, সে জাতির নাম মানুষ জাতি।’ সেই মানবজাতির একজন অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন—তিনি নেলসন ম্যান্ডেলা। আজি হইতে দশ বত্সর পূর্বে প্রয়াত হন। এই হিংসাদীর্ণ বিশ্ব দেখিয়া যখন হতাশার চোরাস্রোত বাসা বাঁধে আমাদের অবচেতনে, তখন ম্যান্ডেলার জীবনকর্ম ও দর্শন সেই হতাশাদীর্ণ মনের আকাশে নূতন ভোরের স্বপ্ন দেখায়। সেই স্বপ্ন যে শুধু রূপকথা নহে, বাস্তবের জমিনেই তাহার চাষাবাদ সম্ভব, নবান্ন আনা সম্ভব নিরন্ন জনপদে—তাহার দুর্নিবার সাহস ও শক্তির জোগান দিয়াছিলেন আফ্রিকার এই মহামানব। বর্ণবাদের বিষকণ্টকযুক্ত কারাপ্রাচীর ভাঙিয়া তিনিই যে সর্বমানবমুক্তির জয়গান গাহিয়াছিলেন পর্বতপ্রতিম প্রতিকূলতার স্রোত ঠেলিয়া। বিজ্ঞান বলে, মানুষ ছড়াইয়া পড়িয়াছিল এই আফ্রিকা হইতেই, অর্থাত্ মানবজাতির সূর্যোদয় হইয়াছিল আফ্রিকার আকাশে, অথচ এইখানেই সেই মানুষ অধঃপতিত ও বদ্ধ হইয়াছিল সাদা-কালোর বৈষম্যের শিকলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পত্রপুটে আফ্রিকা নিয়া বলেন, ‘এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে/ নখ যাদের তীক্ষ তোমার (আফ্রিকার) নেকড়ের চেয়ে,/ এল মানুষ-ধরার দল/ গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে।’ সেই গর্বান্ধ লোহার হাতকড়া পরানো মানুষ-ধরার দলকেই ‘অমানুষ’ হইতে ‘মানুষ’ পদবাচ্যে উন্নীত করিয়াছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ‘মাদিবা’—নেলসন ম্যান্ডেলা।

ইহা সত্য যে, ২৭ বত্সর কেন, আরো শত বত্সর অতিবাহিত হইলেও হয়তো আলো প্রবেশ করিত না ম্যান্ডেলার কারাকুঠুরিতে, যদি নব্বইয়ের দশকে পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতি তাহার সহায় না হইত। কিন্তু তিনি অনন্তকাল ধরিয়া ‘অহিংসার’ সলতে-প্রদীপ সাজাইয়া অপেক্ষায় না থাকিলে ফলাফল থাকিত শূন্যই। ১৯৮৯ হইতে ১৯৯৪ সালের মে মাস পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু সরকারের প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক। ১৯৯০ সালে প্রেসিডেন্ট হিসাবে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়া নেলসন ম্যান্ডেলাকে মুক্তি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন তিনি। মুক্তির পর দক্ষিণ আফ্রিকার সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন নেলসন ম্যান্ডেলা, যেইখানে সকল বর্ণ এবং জাতির সমাবেশ ঘটান তিনি। ইহারই পথ ধরিয়া ১৯৯৪ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নেলসন ম্যান্ডেলা। কী বিস্ময়কর! তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইয়া তাহার রানিং মেট, তথা ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে বাছিয়া নেন শ্বেতাঙ্গ এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ককে। এইখানেই ম্যান্ডেলার বিশালত্ব, অপার মহিমা। তিনি তাহার শামিয়ানার নিচে সকলকে শরিক করিয়াছিলেন। কারণ, তিনি মহামানব। মহামানব ব্যতীত এমন পরম পরিমিতি ও পরিণত বোধ তো খুব বেশি মানুষের থাকে না। মহামানবেরা ছোট-বড় সকলকে লইয়াই পথ চলিতে চাহেন। 

ম্যান্ডেলা তাহার ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে আমাদের জানাইয়াছেন সেই পরম সহিষ্ণুতার সংগ্রামমুখর দিনগুলির কথা। রোবেন দ্বীপের নির্বাসিত জীবনে মানুষদের মুক্তির জন্য তিনি শক্তি লইয়াছিলেন প্রকৃতি হইতে। সশ্রম কারাদণ্ডের অংশ হিসাবে একটি চুনাপাথরের খনিতে শ্রমিক হিসাবে কাজ করিবার সময়ও ম্যান্ডেলা কারা-অন্তরিন বর্ণবৈষম্যের শিকার হইয়াছিলেন রাষ্ট্রের নিয়মেই। সামান্য খাদ্য এবং সবচাইতে কম সুবিধাপ্রাপ্ত রাজবন্দি হিসাবে তিনি জানিতেন না কত বত্সর পার হইলে উষার আলো প্রবেশ করিবে তাহার কারাকুঠুরিতে। উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অহিংসতার রূপকার মহাত্মা গান্ধী গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করিয়াছেন ম্যান্ডেলার মহামানবিক হূদয়ে। ক্রমশ তিনি হইয়া ওঠেন বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক, গণতন্ত্র-স্বাধীনতা-সৃজনশীলতা ও  ধৈর্যের প্রতীক।

নেলসন ম্যান্ডেলাকে একবার জিগ্যেস করা হইয়াছিল, তাহাকে কীভাবে মনে রাখিলে তিনি খুশি হইবেন? ইহার উত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন, ‘আমি চাই আমার সম্পর্কে (এপিটাফে) এইরকম কথাই বলা হউক, এইখানে এমন এক মানুষ শায়িত রহিয়াছে, যিনি পৃথিবীতে তাহার কর্তব্য সম্পাদন করিয়াছেন। আমি চাই, এইটুকুই বলা হউক আমার সম্পর্কে।’

আমাদেরও দায়িত্ব হইল, স্ব স্ব জায়গা হইতে নিজেদের কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করিয়া যাওয়া।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন