বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ভূরাজনীতিতে ইয়েমেন ও হুতি বিদ্রোহীদের ভূমিকা

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৫:০০

গত ৭ অক্টোবরের পর থেকে বৈশ্বিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ইসরাইল-হামাস যুদ্ধ। চলমান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নানামুখী আলোচনা দানা বাঁধছে। এমনও শোনা যাচ্ছে, অন্যান্য অঞ্চলের বিদ্রোহী গোষ্ঠী-সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে চলমান সংঘাতে। বিশেষত দক্ষিণ লেবাননের ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর নাম সবার আগে বলতে হয়। ইসরাইল ও হামাসের মধ্যকার সংঘাতে এই গোষ্ঠীর হাত রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের কথা বলেন অনেকে। ক্রমশ সর্বাত্মক আকার ধারণ করতে চলা এই যুদ্ধে কোনো পক্ষ তলে তলে কলকাঠি নাড়ুক বা না নাড়ুক, সবচেয়ে বড় কথা হলো, সংঘাত বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না একেবারেই। বরং বিভিন্ন পক্ষের রেষারেষিতে সংকট ক্রমাগত গভীরতর হয়ে উঠছে।

অনেকে লক্ষ করেছেন, গত ১৯ নভেম্বর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয় হুতি গোষ্ঠী। লোহিত সাগরে ব্রিটিশ মালিকানাধীন ও জাপান থেকে পরিচালিত ‘গ্যালাক্সি লিডার’ নামক জাহাজ আটক করে হুতিরা। জিম্মি করা হয় ২৫ জন ক্রুকে। জানা যায়, সশস্ত্র হুতিরা হেলিকপ্টারের সাহায্যে জাহাজটিকে কবজা করে তার ছাদে বেঁধে দেয় ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনের পতাকা।

ঐ ঘটনার পর চারদিকে প্রচার পেয়েছিল, হুতির হাতে আটক হয়েছে ‘ইসরাইলের জাহাজ’। অবশ্য ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন ভিন্ন কথা। তার বক্তব্য, ‘এই জাহাজ ইসরাইলের নয় এবং যাদের জিম্মি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে কোনো ইসরাইলি নেই।’ সত্যি বলতে, ঘটনার পর নেতানিয়াহুর জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা একপ্রকার কঠিনই হয়ে পড়ে। কারণ, চলমান ইসরাইল-হামাস দ্বন্দ্বের মধ্যে যে কোনোভাবেই হোক হুতির নাম ঢুকে গেছে। বলা বাহুল্য, এর সূত্র ধরে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের আলোচনায় নতুন করে উঠে আসে হুতি প্রসঙ্গ।

এবার আসি আরেক ঘটনায়। সম্প্রতি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে ইসরাইলের তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করে হুতিরা। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযোগকারী বাব এল মান্দাব প্রণালিতে ঘটে ঐ ঘটনা। গত মাসে হেলিকপ্টারের সাহায্যে জাপানের একটি কার্গো জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে এই অঞ্চলে। এসব ঘটনা কীসের ইঙ্গিত দেয়? বস্তুত, আগামী দিনগুলোতে বাব আল মান্দাব প্রণালি জুড়ে সামুদ্রিক আক্রমণ স্পষ্টত বাড়তে পারে—এমন দাবি ফেলে দেওয়ার মতো নয়।

হুতির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সম্প্রতি দ্ব্যর্থহীন চিত্তে ঘোষণা করেছেন,  ‘ইয়েমেনের উপকূলে চলাচল করা ইসরাইলের জাহাজগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে, যদি না গাজায় হামলা চালানো বন্ধ করে তেল আবিব। হুতি মুখপাত্রের কথার পরিপ্রেক্ষিতে গাজার চলমান যুদ্ধে হুতিদের সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন রহস্য খোঁজা হবে নিশ্চয়ই।

জানিয়ে রাখার বিষয়, কারা এই হুতি? পশ্চিমাদের চোখে হুতিরা মূলত ‘বিদ্রোহী’। কেননা, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে রাজধানী সানাসহ দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নিয়েছে তারা। বাকি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ইয়েমেন সরকার ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সমর্থন পাওয়া অন্যান্য সশস্ত্র সংগঠন।

২০১১ সালে আরব বসন্তের দমকা হাওয়ায় তথা গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনে পতন ঘটে ২২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর। এরপর ক্ষমতার চেয়ারে বসেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদি। পরের বছর নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রেসিডেন্ট হয়ে বিরোধীদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করেন হাদি। এতে চটে যায় হাদিবিরোধী তথা সালেহপন্থিরা। আবারও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে তারা। শুরু হয় দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ।

রাজনৈতিক সংকটের এহেন ডামাডোলে ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল ভবনে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে আলোচনায় আসে আল-কায়েদা। এরূপ পটভূমিতে সন্ত্রাসীদের দমন করতে মার্কিন সেনাদের একটি ‘ছোট দল’ আসে ইয়েমেনে। পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। অস্থিরতা শুরু হয় ইয়েমেনের রাজনীতিতে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে শিয়া নেতা সৈয়দ আব্দুল মালিক বিন বদর আল দিন আল হুতির নেতৃৃত্বে শুরু হয় সরকার, সন্ত্রাস ও মার্কিনবিরোধী ‘হুতি আন্দোলন’।

ইরান-সমর্থিত হুতিরা ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে হুতিদের তুলে ধরা হয় ইরানের সমর্থনপুষ্ট ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে। ইরানের ভাষায়, তারা ইয়েমেনের ‘প্রতিরোধযোদ্ধা’।

যাহোক, মধ্যপ্রাচ্যে হুতিরা এখন বেশ সক্রিয়। এই অঞ্চলে তাদের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইসরাইলি সামুদ্রিক জাহাজ আটকের পর তারা নতুন মোড়কে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। এসব ঘটনা এই বার্তা দিচ্ছে যে, লোহিত সাগর তথা এডেন উপসাগর হয়ে যেসব জাহাজ ইসরাইল বা ইউরোপ-আমেরিকা থেকে এশিয়ায় যাওয়া-আসা করবে, এখন থেকে তাদের বাড়তি নিরাপত্তার কথা মাথায় নিয়েই পথ চলতে হবে।

ইয়েমেন বরাবরই আঞ্চলিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে। বাব আল মানদাব প্রণালিকে বলা হয় গেট অব টিয়ারস বা অশ্রুজলের ফটক। এখান থেকে সুইজ খাল হয়ে সামুদ্রিক জাহাজগুলো চলাচল করতে হয় এশিয়া ও ইউরোপে। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় এই পথের গুরুত্ব অনেক বেশি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় তেল ও গ্যাস পরিবহনে এই রুটের ভূমিকা তাত্পর্যপূর্ণ।

এবার একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক। ইয়েমেনের সংখ্যালঘু শিয়া মতাবলম্বীদের সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি নেতৃত্বের বিরোধ বেশ পুরোনো। সুন্নি নেতৃত্বের প্রতি সৌদি আরবের সমর্থন থাকায় নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হুতিরা হয়ে ওঠে সৌদিবিরোধী (এবং যেহেতু হুতির প্রতিষ্ঠাতা একজন শিয়া নেতা)। হুতিরা বর্তমানে লড়াই করছে মহাশক্তিধর যুক্তরাষ্ট্র ও এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলের বিরুদ্ধে। অতি সম্প্রতি ইয়েমেনের হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে এডেন উপসাগরে টহলরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে।

লক্ষ করলে দেখা যাবে, ইয়েমেনের ‘ঘরোয়া শক্তি’ থেকে ক্রমশ ‘আঞ্চলিক মাথাব্যথা’ হয়ে উঠছে হুতি গোষ্ঠী। ইসরাইল-হামাস যুদ্ধেও হুতিদের ‘ সরাসরি জড়িয়ে পড়া’ নিয়ে আশঙ্কা করা হচ্ছে বারবার। এমনও বলছেন অনেকে, হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুতিদের পাশাপাশি সিরিয়া ও ইরাকে ইরান সমর্থিত বেশ কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি জানান দিচ্ছে, ইরান ‘অগ্নিবলয়’ সৃষ্টি করেছে বা করার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ‘অগ্নিবলয়’ ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী ইসরাইলকে ঘিরে। মাসখানেক আগে একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘বিস্তৃত যুদ্ধের মুখে মধ্যপ্রাচ্য, সব সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে ইরান।’ অর্থাত্, হুতিকে যে ইরান কাজে লাগাবে বা লাগাচ্ছে না, কে বলতে পারে?

কেউ কেউ ইসরাইলের ওপর হুতির হামলাকে ইরানের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চাইবেন। তবে এক্ষেত্রে অন্য বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে। কারণ, ইসরাইল-হুতি বিবাদের সঙ্গে হুতির ‘রাজনৈতিক কৌশল’ গভীরভাবে জড়িত। ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন ইয়েমেনে হুতির অবস্থানকে শক্তিশালী করবে নিঃসন্দেহে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্র তৈরি হবে হুতির জন্য। যদিও এই অঞ্চলের অনেক দেশ ইসরাইলের সঙ্গে মিত্রতা বজায় রেখে চলেছে। তবে বিপুল পরিমাণ আরব জনসংখ্যা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে, যা হুতিদের জন্যও সুবিধা বয়ে আনবে। এতে করে হুতিরা ‘ইতিবাচক জনমত’ তৈরি করার সুযোগ পাবে, তাদের জন্য যা আজকের দিনে অতি গুরুত্বপূর্ণও বটে।

লেখকদ্বয়: যথাক্রমে কার্টিন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পিএইচডি গবেষক এবং একই ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র লেকচারার

দ্য কনভারসেশন থেকে অনুবাদ :সুমৃত খান সুজন

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন